kalerkantho

একাত্তরের অমর কথা

সেলিনা হোসেন

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একাত্তরের অমর কথা

আমরা কি সেই জাতি, যারা চেয়েছিলাম ধর্মান্ধতার উত্থান হবে না এই দেশে? সংখ্যালঘুর দায় ঘাড়ে নিয়ে নিপীড়িত হবে না কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়

 

বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সাহস, বিবেচনা, ক্ষিপ্রতা এবং সামগ্রিক বোধের এক ঐশ্বর্যমণ্ডিত সময় ছিল একাত্তর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের স্বপ্নদ্রষ্টা। মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সমুন্নত পতাকার নিচে টেনে এনেছিলেন।

সে সময় যুদ্ধ নামের নদীর ওপরে রক্তের সেতু তৈরি করেছিল বাংলার আপামর মানুষ।

‘জয় বাংলা’ ধ্বনি বুকের কন্দরে রেখে মানুষ অনুভব করেছিল যে দুটি শব্দ অমিত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল চিরসবুজ শ্যামল বাংলার মানুষের সামনে।

কেটে গিয়েছিল মানুষের ভয়। মানুষ সাহসী হয়েছিল।

বদলে গিয়েছিল মানুষের চৈতন্য। মানুষ বুঝেছিল যুদ্ধ কী।

মানুষের স্বপ্ন তীক্ষ হয়ে উঠেছিল। বুঝেছিল স্বাধীনতা কেন জাতির জীবনে অনিবার্য।

আমরা স্বাধীনতার মতো অমরজ্যোতি লাভ করেছি জীবন ও রক্তের বিনিময়ে। আমরা যুদ্ধজয়ী জাতি। মহাকালের মহাযজ্ঞে একাত্তর আমাদের জীবনে অমরজ্যোতি।

একাত্তর শুধু একটি সময় নয়, কিংবা বর্ষপঞ্জির কালো ও লাল সংখ্যা মাত্র নয়। একাত্তর সময়ের ঊর্ধ্বে, দিনক্ষণ-বছরের ঊর্ধ্বে বহমান স্রোত। ভাসিয়ে নেয় জীবনের গতি—এক থেকে বহুর মধ্যে।

একাত্তর একটি জাতির হৃৎপিণ্ড। প্রতিদিনের নিঃশ্বাস। প্রতিমুহূর্তের নিঃশ্বাস শক্তির সাদা পাথরে অলৌকিক জ্যোত্স্নার প্রতিফলন ঘটায়। মানুষ আপন শক্তি অবলোকন করে। একাত্তর বাঙালির স্বপ্নকে ধরে রাখে জীবনের টেরাকোটায়।

একাত্তর বাঙালির চেতনায় অবিনাশী পঙিক্তমালা। শিশুদের হাতেখড়ি হয়। ওরা লোহার শলাকা দিয়ে বর্ণমালা ফুটিয়ে তোলে বটের পাতায়। সেই পাতা গ্রন্থিত হয় ইতিহাসের পলিমাটিতে। সংগীতের তরঙ্গে টুংটাং বাজে মানুষের জীবনের গান। একাত্তর জীবনের গানের জন্য আশ্চর্য দোতারা।

একাত্তর তারাভরা আকাশের নিচে আলপনা আঁকা উঠানে গণমানুষের উৎসব। জারি-সারি, কবিগান, গম্ভীরা মুখরিত জীবনের ভিন্ন চেতনা। স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়ে মানুষ তার স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করে। একাত্তর সেই স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার জীবনযুদ্ধ।

একাত্তর পলিমাটিভরা ক্ষেত, ফসলের ঐশ্বর্য। ধান কাটার মৌসুম। বাংলার গ্রামীণ জনপদে ঢেঁকির শব্দ। কুলার মাথা থেকে উড়ে যাওয়া শস্যকণার দিগন্তবিথারি ব্যাপ্তি। প্রতিদিনের নবান্ন।

বাংলার নবান্ন অন্ন দেয় পূর্বপ্রজন্মের স্মরণে, সাদা ভাত ছিটিয়ে দেয় প্রাণিকুলের উদ্দেশে, নতুন ভাত ঘ্রাণ ছড়ায় মানুষের বুকভরা নিঃশ্বাসে। বাংলার নবান্ন স্মরণ করে ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন গণ-আন্দোলন এবং স্বাধীনতাযুুদ্ধের শহীদদের। শহীদের আত্মা আমাদের স্বাধীনতার অমরজ্যোতিতে আলোর বিচ্ছুরণ।

আমরা শহীদের রক্তের ঋণে নিজেদের অস্থিমজ্জা ডুবিয়ে রেখেছি।

এই ঋণ শোধ হওয়ার নয়।

প্রতিনিয়ত এমন প্রশ্ন জাগে যে আমরাই কি সেই জাতি, যারা চেয়েছিলাম স্বাধীনতা আমাদের প্রতিটি ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্ন দেবে? ভাতের জন্য হাড়ভাঙা শ্রম দেওয়ার পরও শূন্য থালা দিয়ে ডুগডুগি বাজাবে শিশুরা।

আমরা কি সেই জাতি, যারা স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আমাদের নদীগুলোর গর্ভে রুপালি মাছের চকচকে ঝাঁকে ঋদ্ধ হবে জনজীবন? আবহমান কালের মাছে-ভাতে বাঙালির শরীর পরিপুষ্ট থাকবে মাছের প্রাচুর্যে; মাছ-ভাতের হাহাকার ধ্বনিত হবে না এ দেশের প্রতিটি প্রান্তরে।

আমরা কি সেই জাতি, যারা চেয়েছিলাম আমাদের প্রতিটি শিশু স্কুলে যাবে? দেশের একটি মানুষও নিরক্ষর থাকবে না। শিক্ষার গর্বে গর্বিত জাতির অহংকারে আমরা ভাষার লড়াইয়ের সাফল্য আমাদের জীবনে সমুন্নত রাখব।

আমরা কি সেই জাতি, যার আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলার লোকসাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারকে জনজীবনের সাংস্কৃতিক প্রবাহে স্থিত রাখব? আমাদের অবিনাশী সম্পদের নতুন নির্মাণে উজ্জ্বল হবে দেশের সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ—দেশে ও বিদেশে।

আমরা কি সেই জাতি, যারা চেয়েছিলাম ধর্মান্ধতার উত্থান হবে না এই দেশে? সংখ্যালঘুর দায় ঘাড়ে নিয়ে নিপীড়িত হবে না কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়। ধর্মনিরপেক্ষতা হবে আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র। ধর্ম হবে প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত পবিত্র বিশ্বাস; রাষ্ট্র হবে সবার। সবার জন্য একই মনোভাবাপন্ন, সহানুভূতিশীল ও জনকল্যাণকর।

আমরা কি সেই জাতি, যারা স্বপ্ন দেখেছিলাম বাংলাদেশ রাজাকারমুক্ত থাকবে? স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আমাদের জীবনকে গ্রাস করবে না। জনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা গণমানুষকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখবে না। নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবে না। মৌলবাদী ধারণায় জঙ্গি তৈরি করবে না। একসঙ্গে ৬৩ জেলায় বোমাবাজি হবে না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে না।

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।

একাত্তর আমাদের অবিনাশী চেতনা, যে চেতনা আমাদের প্রতিদিনের সন্ধ্যা। আমাদের আকাঙ্ক্ষা একাত্তরকে অতীত বলে যারা উড়িয়ে দিতে চায়, তাদের প্রতিরোধ করা আমাদের কর্তব্য। আমাদের দায়িত্ব একাত্তরের চেতনাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে একীভূত রেখে ঐতিহ্যের আপন আলোয় স্নাত রাখা।

লেখক : কথাশিল্পী

মন্তব্য