kalerkantho

ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ানো যাবে না

আজিজুস সামাদ ডন

২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ানো যাবে না

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে যে ব্যক্তি হামলা চালিয়েছে সেই  ব্রেন্টনের ছবির সঙ্গে আমাকে একজন লিখে পাঠাল ছবিটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। মনে প্রশ্ন জাগল, শুধু শুধুই ঘৃণাকে আরো উসকে দেওয়া ছাড়া এই ছবি ছড়িয়ে দিয়ে কী লাভ হবে। আমরা বোধ হয় একটি বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছি। এই আক্রমণ ধর্মের প্রতি আক্রমণ কি? সারা বিশ্বকে এমনিতেই ধর্ম-বর্ণ দিয়ে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করে শুধু ঘৃণার বীজই রোপিত করা হচ্ছে তা নয়, সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের মাঝে বৈষম্য সৃষ্টি করে একটি শ্রেণি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে গায়ের জোরে। এই মানুষগুলোর চেহারা মানবজাতির ইতিহাসের পাতায় প্রথম উন্মোচিত হয় নীল রক্তের প্রবক্তা হিটলারের মাধ্যমে।

শান্তির ধর্ম হিসেবে ইসলাম সব সময়ই শান্তির বাণী প্রচার করে এসেছে। কিন্তু পশ্চিমা মুরব্বিরা একটি ঘটনা ঘটিয়ে ইসলামকে স্বাধীনতাকামী করে তুলতে বাধ্য করেছিল, মাত্র লাখখানেক ইহুদি দিয়ে মুসলমানদের ঘরের ভেতরে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত করে। ঘটনাটি কিন্তু অন্য কারো কর্তৃক সৃষ্ট নয়, বরং ওই পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা।

এতেও বিশেষ সমস্যা ছিল না। কারণ ওটা তখন পর্যন্ত স্থানীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত ছিল। সমস্যা তৈরি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোণঠাসা করতে গিয়ে পশ্চিমা মুরব্বিরা নিজ হাতে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি করার পর। তাদের তৈরি এই ফ্রাংকেনস্টাইনও হয়তো বিশ্বব্যাপী সমস্যা তৈরি করত না। মূল সমস্যা তৈরি হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়ে শীতল যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে। পশ্চিমা মুরব্বিদের প্রয়োজন দেখা দিল নতুন শত্রুর। তারা ইসলামী টেররিস্ট নামের শত্রু নিধনে আফগানিস্তান, ইরাক এবং আরব বসন্তের নামে আরো বহু মুসলিম দেশে হামলা চালিয়ে সত্যি সত্যি কিছু ফ্যানাটিক ইসলামী সন্ত্রাসী তৈরি করে ফেলল। আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় যাই, দেখতে পাব, হিটলার, ব্রেন্টন, বুশ থেকে শুরু করে এই ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরির কারিগরদের সবার চেহারাই প্রায় একই রকম।

নিউজিল্যান্ডের এই হিংসায় জ্বলে মারা গেছে বাংলাদেশের চার নাগরিক। মারা যেতে পারত আমার দেশের ক্রিকেটের বর্তমান প্রজন্ম। ঘৃণায় ঘৃণাই বাড়াবে। আমার দেশেই ইসলামের জিগির তুলে তৈরি হবে অরাজকতা। মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই জিগির বোধ হয় আমার দেশেই বেশি উচ্চারিত হয়; যে কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আমাদের মতো গরিব ও জনবহুল দেশকেই আশ্রয় দিতে হয়। টাকার পাহাড়ের ওপর শুয়ে সুখ স্বপ্নে বিভোর অমিতব্যয়ী ইসলামী দেশগুলোর হর্তাকর্তারা কিছু টাকা পাঠিয়ে এবং সেই পাঠানো টাকার বেশির ভাগই আবার নিজেদের জন্য ব্যয় করে তাদের দায়িত্ব শেষ করে।

আমরা সব সময় পশ্চিমা বিশ্ব শব্দটি প্রয়োগ করি কথা বলার সুবিধার্থে। পেট্রোডলার আর সোনার রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেদের স্ফীত অর্থনীতিকে ভোক্তানির্ভর করে গড়ে তুলে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেভাবে একক আধিপত্য চালাচ্ছে, তাতে বর্তমানে পশ্চিমা বলয় ছোট হয়ে আসছে। কিছু হলেই অর্থনৈতিক অবরোধ আর শুল্ক দিয়ে যেভাবে তারা অন্য দেশগুলোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে, সেই অবরোধ আর শুল্ক অস্ত্র অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে আসছে। অতি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরের ভেতর তৈরি হয়, একইভাবে ইউরোপ, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেভাবে জোট বাঁধছে, তাতে এমন দিন চলে আসবে যখন  অন্য দেশগুলো অবরোধের আওতায় আনতে আনতে নিজেরাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে।

একটি গল্প বলা যায়। এক মাতাল রাস্তায় খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছিল। এক পাশে চেপে রাস্তার অন্য সব গাড়িকে সাইড দিচ্ছিল। এই অতি সাবধানী ড্রাইভার সবাইকে সাইড দিতে দিতে একসময় একটি ব্রিজকেও সাইড দিয়ে দিল। ফলাফল বোঝার কিছু নেই। বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে আমাদের পশ্চিমা মুরব্বিরা যেভাবে অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ করে নিজেদের একঘরে করে ফেলছে, তাতে ভয় হয়, কোন সময় না তারা অর্থনৈতিক ব্রিজকেই সাইড দিয়ে দেয়। সেই অবস্থায় নতুন যে শক্তিবলয় গড়ে উঠবে সেই বলয় এই বিশ্বকে কোন পথে নিয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নীতি আমাদের জানা আছে; কিন্তু নতুন বলয়ের নীতি আমরা জানি না।

সারা বিশ্বে একটি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চালিয়ে যেতে আমাদের পশ্চিমা মুরব্বিদের জন্য তাদের বলয়ের কাছে সর্বগ্রহণযোগ্য একটি শত্রুবলয় প্রয়োজন। আজ তারা আমাদের বিশ্বকে এমন একদিকে ঠেলে দিচ্ছে, যে জায়গায় বসে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না পশ্চিমা মুরব্বিদের জন্য নতুন শীতল যুদ্ধ তৈরি করায় সহযোগিতা করা ছাড়া। আমি বিশ্বাস করি, সেই সময় সমাগত প্রায়; ২০২২ সালের পর পশ্চিমা মুরব্বিরা আর এই ইসলামী সন্ত্রাসী নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় পাবে না। এখনই সময় পাচ্ছে না; যে কারণে এক দশকের ওপর জিইয়ে রাখা ইসলামী স্টেটকে এত দিনে তারা চূড়ান্ত আঘাত করেছে। এর আগে পর্যন্ত তারা নিজেদের ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আইএসকে সরিয়ে দিলে কার ভাগে কতটুকু পড়বে, সেটি নিয়ে অঙ্ক আর দর-কষাকষি চলছিল পর্দার আড়ালে। মাঝখানে লাখ লাখ মানুষ মারা গেল, বাস্তুহারা হলো আরো লাখ লাখ মানুষ।

এসব খেলায় লাভ কার হচ্ছে জানি না; কিন্তু ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বিশ্বমানবতার। এমন এক সময় আসবে যখন ভুল স্বীকার করে মাথা ঠোকার দেয়াল পর্যন্ত খুঁজে পাবেন না বর্তমান বিশ্বনেতারা। সেই পরিস্থিতি সত্যি যদি তৈরি হয়, তখন তাঁদের সেই ভুলের জন্য কে কার কাছে ক্ষমা চাইবেন আর কে-ই বা কাকে ক্ষমা করবেন।

‘ছবর’ শব্দটিকে ইসলামেই সবচেয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শব্দটিকে মাথায় গেঁথে নিয়ে যা হবে ভালোই হবে ধরে ছবর করাটাই আমার কাছে মনে হয় আমাদের কাজ। ব্রেন্টনদের থামানোর মূল কৌশল ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া নয়।

লেখক : রাজনীতিবিদ

মন্তব্য