kalerkantho

পরিশীলিত রাজনীতির বাতিঘর

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিশীলিত রাজনীতির বাতিঘর

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ একটি বড়সড় অনুষ্ঠান। ২০০০ সালে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিলাম। দিন ধার্য হওয়ার পরও তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়। দ্বিধাগ্রস্ত চিন্তায় সভাপতিকে নিয়ে একদিন হাজির হলাম মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায়। গিয়েই পেয়ে গেলাম সাক্ষাৎ। চাপা অভিমান, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে বললাম, আমরা একটু একান্তভাবে কথা বলতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ওরা কী বলতে চায় আমি একটু শুনি। তোরা একটু পাশের রুমে যা। আমাদের অভিপ্রায় জানার পর তিনি ফোনে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন গুণী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। আমরা শুনলাম, উপাচার্যকে তিনি বলেছিলেন, ‘আস্সালামু আলাইকুম, কেমন আছেন? অক্টোবরের ২০ তারিখে আমার ভৈরবের একটি অনুষ্ঠানে ছেলেরা আপনাকে অতিথি হিসেবে নিতে চায়। আমি নিজেও অনুষ্ঠানে থাকব। আপনি যদি একটু সময় করে আমার ভৈরবে আসতেন, তাহলে আমি অনেক কৃতজ্ঞ হব। আমার ছেলেরাও অনেক খুশি হবে।’ আমরা যখন উঠব ঠিক সেই সময় তিনি বললেন, ‘শোন সেক্রেটারি, আমি ভৈরবের—ভৈরব আমার; আমি সব সময়ই তোদের প্রগ্রামে যাই। কিন্তু যাঁদের দাওয়াত করেছিস তাঁরা কিন্তু ভৈরবের মেহমান। খেয়াল রাখিস, তাঁদের যেন কোনো অসম্মান না হয়।’ বলছি ভৈরবের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান জিল্লুর রহমানের কথা। তিনি তখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

জিল্লুর রহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ। সংস্কৃতি ও সামাজিক মানুষের সঙ্গে মিশেছেন শৈশব থেকেই। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ‘মুকুল মেলা’ এবং কলেজজীবনে ‘প্রগতিশীল যুব সংগঠন’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজনীতি তাঁর প্রধানতম ক্ষেত্র হলেও আত্মপ্রকাশের একমাত্র মাধ্যম নয়। সব রকম দুর্দিনেই থেকেছেন মানুষের পাশে—দেশের পাশে। উন্নত-প্রগতিশীল সমাজ বাস্তবায়নে জীবনসংগ্রামী জিল্লুর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। সিলেট ভারত না পাকিস্তানে থাকবে, সেই প্রশ্নে গণভোট হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। সিলেটবাসীর আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করতে জিল্লুর রহমান যখন সিলেটে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি। সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। একটি প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘আমি অন্যদের সঙ্গে নিয়ে মুজিব ভাইয়ের পাশে যাই। তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করি। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা ও কথা হওয়ার পর থেকে সক্রিয় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। তখন থেকেই মূলত রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করি।’

ভাষা আন্দোলনের গোড়াতে ছিলেন জিল্লুর রহমান। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন তিনি। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের কারণে সেই সময়ে তাঁর সনদপত্রও বাতিল হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে ফজলুল হক হলের ভিপি, ১৯৫৪ সালে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান ও যুক্তফ্রন্টের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৫৬ সালে কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। সভাপতি ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জিল্লুর রহমান ১৯৭০-এর নির্বাচনে সর্বপ্রথম পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন; স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র এবং জয়বাংলা পত্রিকার সঙ্গেও ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি পাঁচবার বর্তমান কিশোরগঞ্জ-৬ (কুলিয়ারচর-ভৈরব) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৫৮ সালে জিল্লুর রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আইভি রহমানের সঙ্গে। তাঁদের দুই কন্যা তানিয়া বখত ও ময়না রহমান এবং একমাত্র পুত্র নাজমুল হাসান পাপন। জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৭২ সালে, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি। ১৯৭৫ সালের কালরাতের পর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন চার বছর। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালে আবার যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন তখন শেখ হাসিনা ছিলেন সভাপতি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান গুরুতর আহত হয়ে ২৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। জিল্লুর রহমানের জীবনে নেমে আসে চরম হতাশা।

প্রকৃত উদার এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব জিল্লুর রহমানের ছিল বিরুদ্ধবাদীদের কাছে টানার সম্মোহনী শক্তি। দেশের দুর্দিনে ব্যক্তিগত দুঃখ-বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে জিল্লুর রহমান আবির্ভূত হয়েছেন যুগান্তকারী নেতৃত্বের ভূমিকায়। ২০০৭ সালে দেশে জরুরি আইন জারি এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক নেতারা গ্রেপ্তার হলে জিল্লুর রহমান এগিয়ে এসেছিলেন দেশ ও মুক্তিকামী মানুষের টানে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গোটা রাজনীতি পুনরুদ্ধারের বাতিঘর।

রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত অবস্থায় ২০১৩ সালের ২০ মার্চ জিল্লুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি পালন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ইতিহাসে এটিও একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা।

জিল্লুর রহমানের অনাড়ম্বর জীবন, বিনয় ও উদারতা বর্তমান রাজনীতিতে অনুকরণীয় হতে পারে। এই মহান নেতার প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : জেন্ডার, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন গবেষক

dr.mmh.ju@gmail.com

মন্তব্য