kalerkantho

উত্তরাঞ্চলে প্রয়োজন কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প

ড. মো. সহিদুজ্জামান

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উত্তরাঞ্চলে প্রয়োজন কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প

কৃষিপ্রধান দেশ আমাদের এই সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ। আমাদের কৃষিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি কৃষকের ভাগ্যের, যাদের ঘামঝরা পরিশ্রম ও বিসর্জনের কারণে আমরা আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলছি, বলছি কৃষিতে বিপ্লবের কথা। আমরা কৃষির উন্নয়নের কথা বলি কিন্তু কৃষকের উন্নয়নের কথা কতটুকু ভাবি? দেশের অসম অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শ্রেণিবৈষম্য এখানে প্রবলভাবে দৃশ্যমান।

মৌসুমে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট এবং উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ না থাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেশির ভাগ সময় তাদের উৎপাদন খরচটুকুও পায় না। কখনো কখনো তাদের রাস্তায় আলু, টমেটো, মুলা ইত্যাদি ঢেলে দিয়ে অসহায়ত্ব বা দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করতে দেখা যায়। অথচ এসব সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে একদিকে যেমন সম্পদকে অর্থে রূপান্তর করা সম্ভব, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের বেকারত্ব কমানো সম্ভব। এমনকি বিদেশে রপ্তানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

ফসল কাটার পর বা মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ করার পরবর্তী ব্যবস্থাপনাটাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এখানেই বেশি ক্ষতিসাধিত হয়, যাকে ‘পোস্ট হারভেস্ট লস’ বলা হয়। উৎপাদিত ফসলে বা শস্যে মূল্য সংযোজন করতে পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।

ইউরোপ ও আমেরিকার ইন্ডিয়ান মার্কেট, চায়নিজ মার্কেট বা এশিয়ান মার্কেটগুলোতে গেলে বোঝা যায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প কোথায় চলে গেছে বা কত দূর এগিয়ে গেছে। এসব প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বেশির ভাগই আসে এশিয়া থেকে। টমেটো, আম, আনারস, কাঁঠাল, লিচু, কুমড়া, কলা, আলু, গাজর, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি ও দুগ্ধজাত পণ্যের কতই না বাহার। এ ছাড়া বিভিন্ন সুপারমার্কেটে বাহারি রকমের খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর কাঁচামাল আমাদের কৃষির প্রধান অংশ। কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও অতি সম্ভাবনাময় এই খাতে আমরা বৈদেশিক অর্থ উপার্জনে পিছিয়ে আছি, যা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বোঝার মতোই।

দেশের খাদ্য চাহিদার ৫০ শতাংশ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল উত্তরাঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হলেও এ অঞ্চলে এখনো বড় আকারে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। দেশের মোট শিল্পের মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। মৌসুমি ফসল, বিশেষ করে শীতকালীন সবজি চাষ প্রচুর পরিমাণে হয়ে থাকে দেশের এই অঞ্চলে। তাই উত্তরবঙ্গ হতে পারত একটি কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প অঞ্চল। উত্তরাঞ্চলে সহজেই আলুর চিপস ও ফ্রায়েড প্রক্রিয়াজাত শিল্প হতে পারে। আম, আনারস, কাঁঠাল থেকে ফলের রস, জ্যাম-জেলি, টিনজাত ফল, আবার কলা থেকে ব্যানানা চিপস হতে পারে। এ ছাড়া গাজর, ফুলকপি, বেগুন, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি—এগুলো প্রক্রিয়াকরণের কারখানা হতে পারে। সবজি দ্রুত পচনশীল হওয়ায় তা প্যাকেটজাত করে বিপণন করলেও কৃষকরা লাভবান হবে। রপ্তানিভিত্তিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে এই উত্তরবঙ্গে।

অ্যাগ্রো প্রসেসিং খাতের বিরাজমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা এবং বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কারিগরি দক্ষতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পণ্যের গুণগত মান ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন পলিসি গ্রহণ করে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। পুঁজিবাদ ব্যবসায়ীদের এ অঞ্চলে আগ্রহের জন্য বিশেষ আকর্ষণ রাখা যেতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এ খাতে আকর্ষণ করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে, প্রয়োজনে এই খাতে আগ্রহী কোনো দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে শিল্প-কারখানা। তরুণ উদ্যোক্তাদের এ খাতে অনুপ্রাণিত করা যেতে পারে।

বিপুল পরিমাণ এসব ফসলের জন্য হিমাগার নিতান্ত কম বা অপ্রতুল। আবার হিমাগারে সংরক্ষণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, কৃষকরা বেশির ভাগ সময় তা পুষিয়ে নিতে পারে না। কৃষকরা যাতে কয়েক মাস সংরক্ষণ করতে পারে, সে জন্য ছনের ঘর, মাটির হিমাগারসহ কৃষকবান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত যন্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন কলাকৌশলের প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ খাতে উদ্যোক্তা বৃদ্ধি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও নানাবিধ প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যের দিকে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। গ্যাস ছাড়াই উত্তরাঞ্চলে বেশ কিছু অকৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিকল্প জ্বালানির জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। মোট কথা এ খাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে।

মৌসুমে উৎপাদিত ফসল যাতে নষ্ট না হয় এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য দ্রুত হলেও আঞ্চলিক সাবস্টেশন করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তা কেন্দ্রীয় কারখানায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে এবং হয়ে থাকে গবেষণা। এই শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। তারা আগ্রহী কম্পানিগুলোকে লাভজনক উপায়, টেকসই প্রযুক্তি ও ঝুঁকিমুক্ত পন্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে এ খাতে এগিয়ে আসার উদ্যোগ নেবে। এর মাধ্যমে এসব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি তৈরি হবে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট ও বিজ্ঞানী। অনেক তরুণ মেধাবী গড়তে পারবে তাদের ক্যারিয়ার এবং অনন্য অবদান রাখতে পারবে এ খাতে। এভাবেই উন্নত বিশ্ব চলে।

সম্ভাবনাময় কোনো খাতকে গড়তে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকতেই পারে, তবে তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও উন্নত কর্মপরিকল্পনা। আমাদের প্রতিটি সেক্টরে অনেক বিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা দেশে-বিদেশে কাজ করছেন। কিন্তু দেশের কিছু সুবিধাভোগীর কারণে তাঁদের কাছ থেকে উপযুক্ত সেবা নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উচিত খুঁজে বের করে তাঁদের মেধা, বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতা দেশের টেকসই উন্নয়নে কাজে লাগানো, যেমনটি করছে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত এমনকি পাকিস্তান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করছি একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আমলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত উপযুক্ত টিম গঠন করতে, যেখানে থাকবে ফুড প্রকৌশলী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, কৃষি অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। এতে কৃষিজাত পণ্যের অপচয় যেমন রোধ হবে, তেমনি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং বেকারত্ব কমিয়ে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো,

টাফট্স ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা ও  অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

szaman@bau.edu.bd

মন্তব্য