kalerkantho

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের চালচিত্র

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের চালচিত্র

পৃথিবীটা যে গোল তা কি আবারও প্রমাণ করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! একদিকে যখন অষ্টপ্রহর বিজেপির বিরুদ্ধে শাপ-শাপান্ত করে চলেছেন, ঠিক তখনই নাকি তলে তলে ফের এনডিএ শিবিরে ভেড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারোর মুখে উড়ে আসা কথা নয়, চাঞ্চল্যকর বিস্ফোরক এই খবর ‘ফাঁস’ করেছেন খোদ মুকুল রায়, একদা মমতার বাম-দক্ষিণ উভয় হস্ত, যিনি এখন এ রাজ্যে বিজেপির মূল নির্বাচনী দায়িত্বে। শুধু এই জবর খবরটি দেওয়া নয়, মুকুল এদিন আরো নানা বিষয়ে মমতার বিরুদ্ধে একের পর এক চাঁচাছোলা অভিযোগ তোলেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিচরণ এতই বিচিত্রগামী যে মুকুল রায়ের মতো অবিশ্বাস্য বক্তব্য শেষ পর্যন্ত সত্যি হবে না, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। উল্লেখ্য, কংগ্রেসে থাকাকালে ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব ও ক্রীড়া দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৭ সাল থেকেই রাজ্য তথা কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে তাঁর। ১৯৯৮ সালে সরকারিভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন তিনি। ঠিক এর পরের বছরই যোগ দেন এনডিএ শিবিরে। অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মমতা। এক বছরের মধ্যেই পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে মমতা ও সাবেক তৃণমূল নেতা প্রয়াত অজিত পাঁজা ইস্তফা দেন মন্ত্রিসভা থেকে। আবার কোনো কারণ না দেখিয়েই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পদত্যাগ প্রত্যাহার করে নেন তাঁরা।

২০০১ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এনডিএ মন্ত্রিসভা ছেড়ে আসেন। ওই বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে জোট বাঁধেন আবার তাঁর পুরনো দল কংগ্রেসের সঙ্গে। তিন বছরের মধ্যে ফের মোহভঙ্গ। ২০০৪ সালে আবার ফেরেন এনডিএ শিবিরে। এবার পান কয়লা ও খনি মন্ত্রকের দায়িত্ব। সে বছর পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনিই ছিলেন একমাত্র তৃণমূল সংসদ সদস্য। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবারও ইউপিএর সঙ্গে জোট বাঁধেন। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সেবার তিনি পেয়েছেন ১৬টি আসন। ফের দ্বিতীয়বারের জন্য রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বছর দেড়েক আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন মুকুল রায়। তাঁর হাত ধরেই গেরুয়া শিবিরে নাম লেখান সংসদ সদস্য সৌমিত্র খাঁ, প্রাক্তন ছাত্রনেতা শঙ্কদেব পণ্ডা ও ভারতী ঘোষরা। জল্পনা, কলকাতার সাবেক মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিতে পারেন গেরুয়া শিবিরে। এমনকি যাদবপুর ও ডায়মন্ড হারবারে তাঁদের প্রার্থী করা হতে পারে বলেও খবর। শোভন-বৈশাখীর যোগদানের ইঙ্গিত বৃহস্পতিবারই দিয়েছিলেন রাহুল সিনহা।

এদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় কথা ওঠে শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জল্পনা নিয়ে। বৃহস্পতিবার বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা জানিয়েছিলেন, শোভন ও বৈশাখীর জন্য দরজা খোলা। যেদিন মনে করবেন, সেদিন বিজেপিতে আসবেন। সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। শোভন ও বৈশাখী কবে আসবেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নে মুকুলের জবাব, ‘দুটি নাম কেন তোলা হচ্ছে? অনেকেই বিজেপিতে যোগ দিতে চাইছেন। অনেক লোক বসে আছে। কেউ বলছেন ২০১৯টা দেখে নিই, কেউ বলছেন আরেকটু অপেক্ষা করি। বাংলায় পুলিশরাজ চলছে। দল ছাড়লেই মামলা করা হচ্ছে। সৌমিত্র বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর ৯টি মামলা করা হয়েছে। জেলা সভাপতির কথা খাটছে না। পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকদের দলত্যাগ আটকাতে চাইছেন মমতা। এত বড় লাইন পড়বে যে অফিসে ঢুকতে পারবেন না।’

এর পরই মুকুলের বিস্ফোরক দাবি, অনেকেই আসতে চাইছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খোদ চাইছেন, কিভাবে এনডিএতে যোগ দেওয়া যায়।

পুলওয়ামার পর জোয়ানদের রক্ত নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পাল্টা এদিন মুকুল রায় বলেন, ‘উনি আগে ঠিক করুন ভারতের পক্ষে না পাকিস্তানের পক্ষে। সারা ভারতের মানুষ দেখেছে ভারতের বর্তমান সরকারের চোয়াল কতটা শক্ত। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমার বুকে আগুন জ্বলছে, এর বদলা নেব। জঙ্গি ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে সেনা। সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বাহিনীকে। তাই ভারতের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। মুম্বাই হামলার পর সেনা গিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে, কিন্তু তখন সেটা সম্ভব নয় বলেছিলেন তিনি।’ সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করে নিয়েছে, রাফায়েল নথি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে খোয়া গিয়েছে। সে প্রসঙ্গে মমতা খোঁচা দিয়েছিলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সামলাতে পারে না, দেশ কিভাবে সামলাবে? এদিন মুকুলের পাল্টা দাবি, কলকাতা হাইকোর্টে ডিএ, বেতনসংক্রান্ত ফাইল হারিয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন রাজ্যের আইনজীবী। বারাসাতের গোবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় খুন হয়েছিলেন। ৩০২ ধারায় মামলা হয়েছিল। সেই মামলার ফাইল কোথায় গেল? মমতা বলুন মামলার ফাইলটি কোথায় গিয়েছে? অন্য লোকের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের ঘর সামলান।

হিমশৈলের চূড়ামাত্র হলেন সব্যসাচী দত্ত। তৃণমূলে এ রকম আরো অনেকের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ রেখে চলেছেন তৃণমূলত্যাগী রাজ্য বিজেপির নেতা মুকুল রায়। প্রস্তুতিটা বেশ বড়সড়ই। সব্যসাচীর সঙ্গে গতকাল দেখা করার বিষয়টি ঘটনাচক্রে ফাঁস হয়ে যায় বটে, কিন্তু তৃণমূলে তাঁর চেয়েও আরো অনেক বড় ও মাঝারি সারির অনেক নেতা-নেত্রী আছেন, যাঁদের কারো কারো সঙ্গে কথা প্রায় পাকা করে ফেলেছেন অথবা এখনো কথা চালিয়ে যাচ্ছেন মুকুল রায়। এঁরা সবাই অপেক্ষা করছেন লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা অবধি। বলা বাহুল্য, মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলা যেসব নেতা টিকিট পাবেন না, তাঁরা বিজেপিতে ভিড়তে আর কালবিলম্ব করবেন না। ফলে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলে বেশ বড় রকমের ধস নামার প্রস্তুতি চলছে। মুকুল-শিবিরের আরো অঙ্ক, লোকসভা নির্বাচনের পর কেন্দ্রে ফের বিজেপিরই সরকার হবে। আর তখন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য রীতিমতো লাইন পড়ে যাবে।

এদিকে বিধাননগরের মেয়র সব্যসাচী দত্তের বাড়িতে মুকুল রায় যাওয়ার পরই রাজ্য রাজনীতিতে জোর জল্পনা শুরু হয়ে গেছে, মুকুলের হাত ধরে এবার বোধ হয় সব্যসাচীও গেরুয়া শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। বিজেপির অন্দরেও কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়, তাহলে কি বারাসাত কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হচ্ছেন সব্যসাচীই? তবে সাংবাদিকদের কাছে অবশ্য মুকুল অন্য গল্প ফাঁদেন। তিনি বলেন, ‘সব্যসাচীর স্ত্রী ভীষণ ভালো আলুর দম বানান। আমি লুচি-আলুর দম খেয়ে এলাম।’ তবে লোকসভা ভোটের আগে মুকুল সব্যসাচীর বাড়িতে শুধু লুচি-আলুর দম খেতে গিয়েছিলেন, তা অবশ্য কেউই বিশ্বাস করছেন না। আর সব্যসাচী বলেছেন, কেউ যদি বাড়িতে আসতে চান, আসতে পারেন। সবাইকে স্বাগত। তার আগে মুকুল জানান, সব্যসাচীর বিজেপিতে যোগদান নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। সব জায়গায় রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। দুই নেতা মুখে যতই ‘আলুর দম’ আর ‘দাদা ভাই’র তত্ত্ব দিন, বিজেপির লোকসভা ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মুকুল রায়ের সঙ্গে সব্যসাচী দত্তের সাক্ষাৎ ভিন্ন জল্পনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের মত।

সল্টলেকে সব্যসাচীর বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ ছিলেন মুকুল রায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতার এক নামি ফ্যাশন ডিজাইনারও। মুকুল তৃণমূলে থাকাকালেই সব্যসাচী তাঁর শিবিরের লোক বলে পরিচিত ছিলেন। এবারের বৈঠক এবং এর পরে দুজনেই প্রায় এক সুরে যেভাবে বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে জল্পনা কমার বদলে বরং আরো জোরালো হয়েছে। যদিও তৃণমূলের একটি সূত্রে বলা হয়েছে, জল্পনা বা ব্যাখ্যা হতেই পারে। তবে কে কার বাড়িতে গেল, তাতে তৃণমূলের কিছু আসে-যায় না।

তবে তৃণমূলের একটি বড় অংশ অবশ্য বিষয়টিকে লুচি-আলুর দমের মতো সহজভাবে নিচ্ছে না। দলের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন বৈঠকের কী অর্থ এবং প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা সবাই বোঝে। দল যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব দিয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণও প্রত্যাশা করে। সবাই সেই দিকটাই খেয়াল রেখে চলবেন আশা করা যায়। তবে ওই রাত থেকেই ইঙ্গিত মিলেছে, মুকুল-সব্যসাচীর এমন বৈঠকের কারণে জল অনেকটাই গড়াবে।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক

মন্তব্য