kalerkantho

আজকের জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ

মো. সামছুল আলম

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আজকের জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ

জাতীয় মাছ ইলিশ আমাদের দেশের  ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অনাদিকাল থেকেই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষজাতীয় খাদ্য সরবরাহে এ মাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

বাঙালির দেশপ্রেম যতখানি, ইলিশপ্রেম তার চেয়ে কম নয়। তাইতো সম্প্রতি দেশের কয়েকটি জেলার নাম ব্র্র্যান্ডিং হয়েছে ইলিশের নামের সংশ্লিষ্টতায়। এ বাংলায় বাঙালির বর্ষবরণ থেকে শুরু করে ঘরোয়া অনুষ্ঠান যেমন ইলিশ ছাড়া হয় না, তেমনি ওপার বাংলায় জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ লাগে। তা ছাড়া সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ বাঙালিও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ খেতে ভোলে না। কিন্তু এত স্বাদের মাছটি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য। আর দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্যতাকে জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার  দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে। এসব কর্মসূচির আওতায় এবারও ১৬ থেকে ২২ মার্চ ২০১৯ মেয়াদে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উদ্যাপিত হবে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘কোনো জাল ফেলব না—জাটকা ইলিশ ধরব না।’ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে জাটকা রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়াই এ সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য।

ইলিশের ডিম পরস্ফুিটনের মাধ্যমে ইলিশের বাচ্চা ‘জাটকা’ তৈরি হয়। ইলিশের পোনাকে (১০ ইঞ্চি/২৫ সেন্টিমিটারের নিচে) জাটকা বলা হয়। আজকের জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ। জাটকা নির্বিচারে ধরা হলে ইলিশের উৎপাদন কমে যায়। জাটকা নদ-নদীতে বিচরণ করে। তখন জেলেরা নির্বিচারে জাটকা আহরণ করতে চায়। নির্বিচারে জাটকা ধরা হলে ইলিশ উৎপাদন ও আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা জাটকা মাছ ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর।

ইলিশের জীবনচক্র বেশ বৈচিত্র্যময়। এরা সাগরের নোনা পানিতে বসবাস করে; প্রজনন মৌসুমে ডিম দেওয়ার জন্য উজান বেয়ে মিঠা পানিতে চলে আসে। একটি ইলিশ তিন লাখ থেকে ২১ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। মিঠা পানিতে ডিম দেওয়ার পর ২২ থেকে ২৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা হয় এবং পাঁচ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার আকার পর্যন্ত পাঁচ থেকে সাত মাস এরা নদীতে থাকে। পরবর্তীকালে আবার সাগরের দিকে চলে যায়। ইলিশ এক-দুই বছর বয়সে (২২ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার আকারের পুরুষ, ২৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার আকারের স্ত্রী) প্রজননক্ষম হয়। তখন এরা আবার মিঠা পানির দিকে গমন করে। তখনই সাগর মোহনায় স্ত্রী ইলিশ মাছ অপেক্ষাকৃত বেশি ধরা পড়ে। ইলিশ মাছ সারা বছরই কমবেশি ডিম দেয়; তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরই হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। অক্টোবর অর্থাৎ আশ্বিন মাসের প্রথম পূর্ণিমার ভরা চাঁদে ওরা প্রধানত ডিম ছাড়ে। এ জন্য আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগের চার দিন, পূর্ণিমার দিন এবং পরের ১৭ দিন (৪+১+১৭) ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তাই  এ লক্ষ্যে  ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম অর্থাৎ গত বছরও ৭ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন প্রজননক্ষেত্রের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার।

২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের এমন উদ্যোগে বিগত আট বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ, যা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি সাফল্য। ইলিশ উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশও বর্তমানে বাংলাদেশকে ইলিশ উৎপাদনের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০১৬ সালে ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইলিশের স্বত্ব এখন বাংলাদেশের।

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতে দেশে ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের জন্য চিহ্নিত এলাকাগুলো হচ্ছে—বরিশাল জেলার সদর ও হিজলা উপজেলার কালাবদর নদের ১৩.১৪ বর্গকিলোমিটার, মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার গজারিয়া ও মেঘনা নদীর যথাক্রমে ৩০ ও ২৭৪.৮৬ বর্গকিলোমিটার। প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রম এলাকার নদীগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৮২ কিলোমিটার এবং আয়তন ৩১৮ বর্গকিলোমিটার। প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে এ এলাকায়ও মার্চ-এপ্রিল মাসে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে।

ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব কর্মসূচির আওতায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাটকাসমৃদ্ধ ১৭ জেলার ৮৫টি উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৭৪টি জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে চার মাসের জন্য মোট ৩৯ হাজার ৭৮৮ মেট্রিক টন চাল প্রদান করা হয়েছে। জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময় ছাড়াও বিগত দুই অর্থবছরে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন ২২ দিনের জন্য পরিবারপ্রতি ২০ কেজি হারে মোট তিন লাখ ৮৪ হাজার ৪৬২টি পরিবারকে মোট ১৪ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

বিগত বছরে ইলিশ উৎপাদনের সফলতা জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পারছে, জাটকা ও মা ইলিশ সঠিকভাবে সুরক্ষা করতে পারলে বর্ধিত হারে ইলিশ উৎপাদনের সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে। এ জন্য জেলেরাও অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক দিক।

তা ছাড়া সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে তথ্য উঠে এসেছে, মৎস্য খাতে এক কোটি ৯০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ খাতে গত ১০ বছরে গড়ে বার্ষিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ছয় লাখ মানুষের। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫৭ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২৫.৩০ শতাংশ।

লেখক : গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ভবন, ঢাকা

alam4162@ gmail.com

মন্তব্য