kalerkantho

পুলিশ নিয়ে স্বস্তি-অস্বস্তি

আলম রায়হান

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুলিশ নিয়ে স্বস্তি-অস্বস্তি

রাজনীতি প্রত্যাশিত গতিপথে থাকা, জঙ্গিবাদের আগ্রাসন মোকাবেলায় বিশেষ সাফল্য এবং চলমান উন্নয়ন ধারার সাবলীল এখন দিবালোকের মতো দৃশ্যমান। এ হচ্ছে জাতীয় প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এর সঙ্গে আরেকটি প্রত্যাশা প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। সেটি হচ্ছে সুশাসন। আর সুশাসনের বিষয়টি নির্ভর করে সরকারের একাধিক সংস্থার ওপর। এর মধ্যে জনগণের প্রায় দোরগোড়ায় সরকারের যে সংস্থাটি দৃশ্যমান, সেটি হচ্ছে পুলিশ।

অনেকেই মনে করে জঙ্গি দমন এবং পঁচাত্তরের কুচক্রীদের নানা কঠিন কারসাজি মোকাবেলায় গত ১০ বছরে পুলিশ বাহিনী যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু এ অর্জন প্রত্যাশিত মাত্রায় উজ্জ্বল হয়ে জনমনে স্থান করে নিতে পারছে বলে মনে হয় না। আর এ জন্য যারা দায়ী, নিশ্চয়ই তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করে অভিজ্ঞ মহল। সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য এটি বিবেচিত হচ্ছে সময়ের দাবি হিসেবে।

পুলিশের সাফল্য ও দক্ষতা নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। এটি রাষ্ট্রীয় স্বস্তির বিষয়। পাশাপাশি পুলিশ নিয়ে জন-অস্বস্তিও কিন্তু কম নয়। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। অনেকে মনে করে, এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের অভাব এবং ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া। আর এ ক্ষেত্রে নানা বিষয়ের সঙ্গে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের একটি সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করে অনেকে।

বিভিন্ন কারণে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ১৭ জন জুনিয়র কর্মকর্তাকে পুলিশে এসপি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। ফলে এ বাহিনীতে নীরবে এক বিভাজনের ধারা সূচিত হয়। এরপর জেলায় এসপির মর্যাদা জেলা প্রশাসকের সমান্তরাল করা হলো। এ ধারায় যার হাতে অস্ত্র তার হাতেই নিয়ন্ত্রণ—বিষয়টি এমনই দাঁড়িয়ে গেল। এর ধারাবাহিকতায় জেলা পর্যায়ে পুলিশের ওপর সিভিল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করে। এদিকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে পুলিশ ক্রমে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর তকমা লাভ করে।

একপর্যায়ে এই তকমা থেকে পুলিশ অনেকটাই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পুলিশের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা খবরদারি অনেক হ্রাস পায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, পুলিশ জনপ্রত্যাশার সমান্তরালে চলছে। বরং এখনো মাঠপর্যায়ে অনেক পুলিশ সদস্য রাজনৈতিক নেতাদের দোহাই দিয়ে নিজের ‘কর্ম’ করে যাচ্ছেন। হয়তো এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি বলেছেন, ‘পুলিশকে হতে হবে জনবান্ধব পুলিশ, যেটা জাতির পিতা নির্দেশ দিয়ে গেছেন।’ প্রধানমন্ত্রীর মাত্র একটি বাক্যে সব কথা বলা হয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশ দিয়েছেন সেই একই নির্দেশ দিতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রায় অর্ধশত বছর পরও।

প্রসঙ্গক্রমে কয়েকটি খবর উল্লেখ করা যায়। এক. বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায় থানাহাজতে আটকে রেখে কাজি ডেকে জোরপূর্বক স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়েছে এক নববধূকে। শুধু তা-ই নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা ছাড়ার এবং এ ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ না করার শর্তও দেওয়া হয়েছে নববধূকে। ‘পুলিশ সেবা সপ্তাহ’ চলার মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটেছে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানায়। দুই. বরিশাল মহানগর পুলিশের একটি থানার ওসি বরিশালে ঘুরেফিরে আছেন প্রায় দুই দশক ধরে। তিনি যে থানায়ই থেকেছেন, সেই থানায়ই একটি অপরাধী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ। গুণধর এই ওসি ক্ষমতাধর এক নেতার পোষ্য হিসেবে পরিচিত। তিন. বরিশালের বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়নের মুড়ারবাড়ী বাজারের কীটনাশক বিক্রেতা সীমা পাণ্ডে পড়েছিলেন থানার এক এএসআইয়ের খপ্পরে। তাঁর দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ দুই বোতল কীটনাশক থাকার অভিযোগে ৩০ হাজার টাকা নজরানা দেওয়ার পরও আরো ২০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন গুণধর ওই এএসআই। বিষয়টি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. শাহে আলম পর্যন্ত গড়ালে ঘুষের টাকা ফেরত পাওয়াসহ পুলিশি জুলুম থেকে রেহাই পান অতি দরিদ্র সীমা পাণ্ডে।

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। এই ধারার রাশ টেনে ধরা খুবই জরুরি। এটি না করা গেলে পুলিশ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের উন্নতির প্রভাব মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। বরং পুলিশের পুরনো ইমেজই জনমনে বহাল থাকবে। আর অব্যাহত থাকবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধারা! সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যার নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। রাজনীতিও এর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকছে না।

অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই, প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগে নানা সীমাবদ্ধতা সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। এর একটি নগ্ন প্রকাশ হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। প্রধানমন্ত্রীর আদেশ-নির্দেশে চিকিৎসা বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের টনক নড়েছে বলে মনে হয় না। বরং তারা উল্টো চাপ সৃষ্টি করছে বলে ধারণা অনেকের। শেষ পর্যন্ত কোনো কারণে ‘চিকিৎসা কারবারিরা’ বিজয়ী হলে অন্য চক্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। এমনটাই পর্যবেক্ষক মহলের আশঙ্কা। তবে আশার কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করার অবস্থায় এবার আর নেই; যেমনটা ছিলেন ১৯৯৬ সালের প্রথম সরকারের আমলে। পঁচাত্তরের অপশক্তিকে বারবার পরাজিত করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতির চূড়ান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিজয়ের পর চলতি সরকারের শুরুতেই অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেকটা জিহাদের অবস্থায় আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ চলমান যুদ্ধের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে অধিকতর জনমুখী করা প্রয়োজন। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রধান হচ্ছে পুলিশ। এ বাহিনীর দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার এখনই সময়। এত দিন যা হওয়ার হয়েছে, এখন নতুন করে ভাবতে হবে। এটি সময়ের দাবি। অবশ্য এটি খুবই কঠিন কাজ, কারো বিবেচনায় প্রায় অসম্ভব। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, অসম্ভবকে সম্ভব করা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পক্ষেই শুধু সম্ভব; আর এটি তাঁকেই করতে হবে। কারণ এখন সুশাসনের আর কোনো বিকল্প নেই, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে, যার প্রধান ভিত্তি পুলিশ। সুশাসন জনগণের কাছে দৃশ্যমান করতে প্রধান অবলম্বন হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। এ পুলিশ বাহিনীর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া খুবই জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য