kalerkantho


মমতার রাজনৈতিক নাটক

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মমতার রাজনৈতিক নাটক

কলকাতার রাস্তায় বঙ্গেশ্বরী যে তিন অঙ্কের রাজনৈতিক নাটক করেছেন তা টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দায় ভারত তথা গোটা বিশ্ব দেখেছে। কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইয়ের সঙ্গে যে বাগ্যুদ্ধ ও ধস্তাধস্তি হলো তাতে দেশের গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সারদা, নারদা ও রোজভ্যালি চিটফান্ড কাণ্ডের সঙ্গে কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার কতটা জড়িত তা জানার জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআইয়ের ৯ জন অফিসার পুলিশ কমিশনারের বাড়ির সামনে হাজির হয়েছিলেন। তাঁরা যে হাজির হবেন এ কথা ঘটনার তিন দিন আগে অঙ্গরাজ্যের মুখ্যসচিব মলয় দে, ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এবং রাজীব কুমারকে চিঠি লিখে ও টেলিফোনে জানানো হয়। কারণ হিসেবে সিবিআইয়ের ব্যাখ্যা হলো, গত তিন বছরে রাজীব কুমারকে সিবিআই অফিসে গিয়ে দেখা করার অনুরোধ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে রাজীব কুমার গত তিন বছরে সিবিআইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি।

রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অভিযোগ করেছে ভারতের অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা—‘র’, অর্থাৎ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং)। তাদের বক্তব্য হলো, মমতা ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এবং ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ থেকে জামায়াত আর জেএমবির হাজার হাজার লোক এ বাংলায় আশ্রয় নিয়েছে। বিপুল টাকার বিনিময়ে রাজীব কুমার তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তারা কলকাতার আশপাশের দুই চব্বিশ পরগনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ আর নদীয়া জেলায় বহাল তবিয়তে বসবাস করছে। কেন্দ্রের এই সংস্থা বহুবার সাবেক সল্টলেকের পুলিশ কমিশনার বর্তমানে কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার বলে দিয়েছেন জামায়াতিদের কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘র’-এর হাতে হস্তান্তর করার দিদির কোনো হুকুম নেই। ‘র’-এর ওই সাবেক অফিসারের নাম হলো বিপুল বিজয় সিং। বিপুল বিজয় সিং এই নিবন্ধের লেখককে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বহুবার জানিয়েছেন। তিনি যখন চাপ দিতে থাকেন তখন নরেন্দ্র মোদিকে বলে মমতা তাঁকে গুজরাটে বদলি করে দেন।

সিবিআই নাম বলতে অনিচ্ছুক একজন পদস্থ অফিসার বলেন, তাঁদের খবরের উৎস হলো সাবেক তৃণমূল নেতা মুকুল রায় এবং সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া একজন মহিলা পুলিশ অফিসার ভারতী ঘোষ। ভারতী একসময় জঙ্গল মহলের এসপি ছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন মমতাই হলেন জঙ্গল মহলের ‘মা’। মুকুল রায় ও ভারতী দুজনেই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশ রাখতেন। এই দুজনের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের কাছে বহু দুর্নীতির অভিযোগ আছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই দুজনের বিরুদ্ধে যাবতীয় অভিযোগ সিবিআই তুলে নেয়। মুকুল রায় ২০১১ সালে বিধানসভার নির্বাচনের সময় যখন নির্বাচনী খরচ বাবদ নগদে ৫০ কোটি টাকা তুলে নেন তখনই সিপিএমের সাবেক মন্ত্রী গৌতম দেব সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা বলেছিলেন। তখনও দিদি রাস্তায় নামেননি। দিদির মন্ত্রিসভার সদস্য মদন মিত্র, সংসদ সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জয় বসু, তাপস পাল—তাঁদের সিবিআই গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছিল। বর্তমানে তাঁরা জামিনে আছেন। তাঁদের গ্রেপ্তার নিয়ে কোনো আন্দোলন দিদি করেননি এবং রাস্তায় মঞ্চ বেঁধে রাজনৈতিক নাটকও করেননি। কিন্তু এই ঘটনায় তিনি যা করেছেন, তা ভারতের সংবিধান লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। একটি বেসরকারি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সহপাঠী প্রেসিডেন্সি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায় সরাসরি মমতাকে সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে অভিযুক্ত করেছেন। সংবিধানের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, মমতা যা করেছেন তাতে ভারতের গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে। এখন যা কিছু করা হচ্ছে, তা আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে। তাই দেশের শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন রাজীব কুমারকে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে সিবিআইয়ের অফিসাররা এ মাসের ২০ তারিখে জেরা করবেন। রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে সিবিআই যেসব অভিযোগ এনেছে, তা দেশদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে বলে ওয়াকিফহাল মহল মনে করে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের কাছে খবর আছে, চিটফান্ডসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগে মমতার নিজের পরিবারের কয়েকজনকে সিবিআই জেরা করার জন্য ডাকতে পারে। তাতেই দিদি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় নাটক করলেন। আর গোপনে গোপনে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে তিনি আগের মতো বিজেপির হাত ধরতে পিছপা হবেন না সেই বার্তা দিল্লি ও আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে নাকি দূতিয়ালির কাজ করছেন তাঁর একদা ঘনিষ্ঠ মুকুল রায়ই।

এদিকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব-নাট্যের জমজমাটি প্রথম অঙ্কের মঞ্চ যদি হয় কলকাতা, তবে এর দ্বিতীয় অঙ্ক ছিল দিল্লিতে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজিমাত করেছিলেন কলকাতা ও রাজ্য পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে। আর দিল্লিতে সম্ভবত বাজিমাত করেছেন সিবিআই কর্তারা, যাঁদের রীতিমতো মারধর ও ধাক্কাধাক্কি করে থানায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল কলকাতা পুলিশ। কারণ গোটা ঘটনায় প্রাথমিকভাবে চরম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতে মামলা দায়ের করা হলে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ঘটনার কথা শুনে দৃশ্যত যৎপরোনাস্তি রুষ্ট হন।

সিবিআইয়ের কাজে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের বাধা দেওয়া যে তাঁরা সহজভাবে নিচ্ছেন না, স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন কলকাতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সিবিআইয়ের শীর্ষ আধিকারিকরা। দিল্লি থেকে একই বার্তা দেন তদন্তকারী সংস্থাটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নাগেশ্বর রাও। দিল্লিতে দায়িত্ব নিয়েছেন সিবিআইয়ের সদ্য নিযুক্ত ডিরেক্টর ঋষিকুমার শুক্ল। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পরেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় সিবিআই। সেখানে সিবিআই জানিয়েছে, তাদের নির্দেশেই সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্ত করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তদন্তে সহযোগিতা করার বদলে তাদের অফিসারদেরই আটক করে।

বিনা অনুমতিতে যেকোনো রাজ্যে প্রবেশ করে তদন্ত করার যে অধিকার সিবিআইয়ের হাতে থাকে, পশ্চিমবঙ্গে তা আগেই প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সিবিআইয়ের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা শীর্ষ আদালতে জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই রাজ্যে তদন্ত করলে সেই নিষেধাজ্ঞার মূল্য থাকে না। তা ছাড়া মমতা প্রশাসনের সেই নিষেধাজ্ঞার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তদন্ত।

অন্তর্বর্তী সিবিআই প্রধান নাগেশ্বর রাও জানিয়েছিলেন, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি সারদা দুর্নীতি কাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করে দিয়ে তদন্তে বাধা দিয়েছেন। রাজ্য সরকার বাদবাকি সব তথ্য-প্রমাণ নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। রাজ্য সরকার সাহায্য তো করছেই না, উল্টো বহু প্রমাণ নষ্টও করে ফেলা হয়েছে।

সিবিআইয়ের আরো অভিযোগ, আটক করার পর তাদের অফিসারদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো আচরণ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে সিবিআই। উল্টোদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দাবি, সিবিআইয়ের কাছে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। সিবিআইয়ের বক্তব্য, এর আগে একাধিকবার সমন পাঠানো হয়েছিল কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে। কিন্তু তিনি একবারও আসেননি। সে ব্যাপারেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ছিল।

এদিকে সিবিআইয়ের আরো একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক কারণে সারদা মামলায় তাঁকে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে এর আগে সিবিআই’র সাবেক প্রধান অলোক কুমারকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন রাজীব কুমার। সেখানে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছিল সিবিআইয়ের স্পেশাল ডিরেক্টর রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে। আস্থানার সঙ্গে অলোক বর্মার সংঘাত থাকায় আস্থানা শিবির অভিযোগ তোলে, রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে মামলা লঘু করে দিয়েছে বর্মা শিবির।

রাজীব কুমারের মতো গা ঢাকা দিয়ে থাকা একজন পুলিশ অফিসারকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়সহ গোটা সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেস এত মরিয়া কেন? বস্তুত কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং তাঁর চোখের মণির মতো প্রিয় রাজীব কুমারকে বাঁচাতে মমতা এতটাই তৎপর ছিলেন যে সব প্রটোকল ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই তিনি চলে যান রাজীব কুমারের বাড়িতে। যতই আপৎকালীন পরিস্থিতি হোক না কেন, মুখ্যমন্ত্রী রাজীব কুমারকে তাঁর নিজের দপ্তরে বা বাড়িতে ডেকে নিতে পারতেন। কিন্তু তার চারপাশ দিয়েও না গিয়ে তিনি স্বয়ং সটান চলে যান তাঁর বাড়িতে। শুধু তাই নয়, রাজীব কুমারকে আড়াল করে রাখতে তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’ বাঁচাতেই তিনি ধরনায় বসছেন। সেখান থেকে সোজা চলে আসেন ধরনা মঞ্চে। অত্যন্ত প্রিয় এবং ঘনিষ্ঠ এই বিশ্বের সেরা অফিসারকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী এতটাই মরিয়া ছিলেন যে মেট্রো চ্যানেলে কোনো রকম বিক্ষোভ-ধরনা নিষিদ্ধ করে যে আইন তিনি নিজেই করেছিলেন, সেই আইন নিজেই ভেঙে সেখানেই ধরনায় বসে পড়েছেন তিনি। এর আগে সন্ধ্যা থেকে একের পর এক নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করে পুলিশ একবার সিবিআই অফিসারদের আটক করেছে, পরে আটক হওয়া সিবিআই অফিসাররা তাঁদের আটক করতে আসা রাজ্য পুলিশকে আটক করেছেন।

রাজনৈতিক মহলের অভিমত, সারদা মামলায় সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ার পর তৃণমূলের তাবড় নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যখন একের পর এক তথ্য-প্রমাণ উঠে আসছিল এবং তাঁরা প্রায় গ্রেপ্তার হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সময় তৃণমূলের কাছে প্রায় দেবদূতের মতোই হাজির হয়েছিলেন রাজীব কুমার। নিজেই দায়িত্ব নিয়ে একের পর এক তথ্য লোপাট করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের লকার খুলে একটি বহু চর্চিত লাল ডায়েরিসহ হার্ডডিস্ক ও পেনড্রাইভ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সিবিআই বারবার সেই সব তথ্য-প্রমাণ চাওয়া সত্ত্বেও সেগুলো তাদের হাতে দেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশ্যে আসে সারদা চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তদন্ত শুরু হওয়ার পর জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গ, প্রতিবেশী রাজ্যগুলো এবং ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতেরও কয়েকটি রাজ্যে ১৭ লাখেরও বেশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের আমানত তছরুপ করে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছেন সংস্থার প্রধান সুদীপ্ত সেন।

রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন—রাজীব কুমারের কাছে পৌঁছতে পারলে কি মাথায় টান পড়বে? এর পরের ধাপেই ডাকা হতে পারে মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে, সিবিআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী যাঁরা এরই মধ্যে বেশ কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়েছেন।

লেখক : কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



মন্তব্য