kalerkantho


ফিরিয়ে দাও হারানো বছরগুলো

চিন্ময় মুৎসুদ্দী

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ফিরিয়ে দাও হারানো বছরগুলো

জাহালমের মুক্তি আনন্দের খবর। তাঁকে ফজলু মিয়ার মতো জীবনের ২২ বছর হারাতে হয়নি। জাহালমের ঘটনা পড়ে বোঝা যায়, দুদক কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণেই জাহালমকে জীবনের তিনটি বছর হারাতে হলো। সেই সঙ্গে ঘটল অশেষ যন্ত্রণাদায়ক ভোগান্তি।

আমরা দেখি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষই এমন আচরণের শিকার হয়। বিত্তবানরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ তাদের অবলোপন করা হয় আর দুই হাজার টাকার ঋণ শোধ না করতে পারার জন্য কোমরে দড়ি বেঁধে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় দরিদ্র মানুষকে। একজনের অপরাধে আরেকজনকে ভরে দেওয়া হয় কারাগারে। ভোগবাদী সমাজের এ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেছেন, আমাদের দেশের জেলখানাগুলোতে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বিনা বিচারে আটক রয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো বিচার হয়নি। তাদের বড় একটা অংশ কোনো অপরাধ না করেই জেলখানায় আটক রয়েছে। ভয়াবহ তথ্য। কে এগিয়ে আসবেন মানবাধিকারবঞ্চিত এসব হতভাগ্য মানুষের পক্ষে?

জাহালম তাঁর জীবনের তিনটি বছর হারিয়েছেন, তাঁর পরিবার মামলা চালাতে গিয়ে ঋণের ভারে আজ জর্জরিত। স্বজনরা কাটিয়েছে দুঃসহ কষ্টের দিন। কন্যা বঞ্চিত হয়েছে পিতার স্নেহ থেকে। আর এসব হয়েছে দুর্নীতি দমন অফিসের দায়িত্বহীন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে। ঋণ নিয়েছেন আবু সালেক, আর সেই অভিযোগে মামলা হলো জাহালমের বিরুদ্ধে। সেই মামলায় আটক হয়ে বিনা দোষে জেল খাটলেন তিন বছর। জাহালম বারবার বলেছেন, তিনি আবু সালেক নন। কিন্তু দুদকের সংশ্লিষ্ট ৯ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা সেই কথায় কান দেননি, এমনকি বিচারিক আদালতেও জাহালমের কথা গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন আবু সালেক। থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। জানা গেছে, সম্প্রতি ভারতে পালিয়ে গেছেন এই প্রতারক। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এ দেশ।

আবু সালেকের জালিয়াতির ধরন থেকে বোঝা যায় তিনি ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক। দুদকের তদন্ত রিপোর্ট বলছে, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন ঠিকানায় অনেক অ্যাকাউন্ট খুলে সোনালী ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফার করেছেন আবু সালেক। এ কাজে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন স্টাফ। সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখার কর্মচারী মাইনুল হক সোনালী ব্যাংকের লোকাল অফিস (মতিঝিল) থেকে ভাউচার, চেক, কম্পিউটার প্রিন্ট আনা-নেওয়া করতেন। আনা-নেওয়ার পথে আবু সালেক স্বাক্ষরিত চেকগুলো সরিয়ে আলাদা রাখতেন। ওই চেকগুলোর জন্য আলাদা ভুয়া ভাউচার তৈরি করে তা ক্যান্টনমেন্ট শাখায় দাখিল করতেন। লোকাল অফিসের কর্মকর্তা শাখা অফিসের কর্মকর্তার স্বাক্ষর যাচাই-বাছাই না করে পুরো অর্থ ক্লিয়ারিং হাউসে পাঠাতেন। এভাবে ক্লিয়ারিং হাউসের সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে ভুয়া ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্র সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। মাইনুল ছাড়াও সোনালী ব্যাংকের আরো কর্মকর্তা এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেকের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা হয়। এর মধ্যে ২৬টিতে জাহালমকে আসামি আবু সালেক চিহ্নিত করে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। এসব মামলায় ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাহালম গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকেই তিনি জেল খাটেন, আদালতে হাজিরা দিতে থাকেন।

এটা ভাবতে অবাক লাগে যে ২৬টি মামলা তদন্ত করেছেন দুদকের ৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা। কেউ বুঝতে পারলেন না, যাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে তিনি আসল ব্যক্তি নন। কতটা গাফিলতি হলে এমনটা হতে পারে? এসব কর্মকর্তার আবার পদোন্নতি হয়েছে অফিসে। আর সেই পদোন্নতির সাফাই গেয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, পদোন্নতির সঙ্গে নাকি দায়িত্বে অবহেলার সম্পর্ক নেই। অদ্ভুত ব্যাখ্যা। জানতে ইচ্ছা করে দায়িত্বহীনতা পদোন্নতিপ্রাপ্তির একটি মাপকাঠি কি না।

ফজলু মিয়ার ঘটনাও হৃদয়বিদারক। কোনো গুরুতর অভিযোগ নয়। ১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই সিলেটের আদালতপাড়ায় ঘোরাঘুরি করার সময় সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁকে আটক করেন তৎকালীন ট্রাফিক সার্জেন্ট জাকির হোসেন। এরপর  সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের ধরাধরপুর গ্রামের এই ফজলু মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে চালান দিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ফজলুর বিরুদ্ধে পাগল আইনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন। জামিন পান ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর মা-বাবা দুজনই মারা যান। বিয়ে করেননি। এই ২২ বছরে কেউ তাঁকে দেখতে আসেনি কারাগারে। হাজিরা দিয়েছেন ১৯৭ দিন। জামিন পেয়েছেন ১৯৮তম হাজিরার দিন।

২০০২ সালে একবার তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। কারা কর্তৃপক্ষ মুক্তি দিলেও মানসিক ভারসাম্যহীন ফজলু মিয়াকে নিতে কেউ আসেনি বিধায় তাঁকে আবারও কারাগারে নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে সিলেট কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া বলেছিলেন, আদালতের নির্দেশ যা-ই থাক না কেন, আমরা তো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে গেটের বাইরে বের করে দিতে পারি না। সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাদের সেই দায়িত্বটা পালন করতে পারেনি।

ফজলুর বিভীষিকাময় জীবনের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ২০০৫ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। তার পরও আইনের মারপ্যাঁচে কেটে যায় আরো ১০ বছর।

ফজলু মিয়ার সঙ্গে যে পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বহীন আচরণ করেছিলেন, খোঁজ নিলে তাঁর সন্ধান মিলবে। হয়তো একটু সময় লাগবে। কিন্তু জাহালমের সঙ্গে অন্যায় আচরণকারী ব্যক্তিরা কাছেই আছেন। জাহালামের অভিযোগের সূত্র ধরে দুদকের সেই দায়িত্বহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক কালবিলম্ব না করে। আর ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকার স্ব-উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোনো ক্ষতিপূরণই তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। জীবন যাপনের জন্য আয়ের যে সুযোগ তিনি হারিয়েছেন, সেটা হয়তো কিছুটা পুষিয়ে যাবে।

বিনা অপরাধে কারাগারে বন্দিজীবন কাটানোর উদাহরণ শুধু এই দুজন নন। এমনি আরো অনেক ফজলু, জাহালম আছেন, যাঁরা বিনা অপরাধে, বিনা বিচারে কারাগারে আটক রয়েছেন। মিডিয়ার অনুসন্ধানে সেসব তথ্য হয়তো আমরা ক্রমান্বয়ে জানব। এরই মধ্যে বাদল ফরাজির বিষয়টি আবার এসেছে গণমাধ্যমে। নিরপরাধ ফরাজি ১১ বছর কারাগারে আছেন কোনো অপরাধ না করে। ভারতের কারাগারে ছিলেন ১০ বছর। বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছেন প্রায় এক বছর। জাহালমের মতোই তাঁকে জেল দেওয়া হয় বাদল সিং নামের এক অপরাধী হিসেবে। ‘ভুল’জনিত এ অপরাধ শুরু করেছেন ভারতের বিএসএফের কয়েকজন সদস্য। সেখানকার আদালতও ভুল ব্যক্তিকে সাজা দিয়েছেন। বাংলাদেশে তাঁকে ফেরত পাঠানোর পরও তাঁর মুক্তি মিলছে না। বাদল যে নির্দোষ সে বিষয়টি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে, ঘটনা পরম্পরায় এটা স্পষ্ট যে বাদল ফরাজি অপরাধী নন। তার পরও তাঁকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে চলছে গড়িমসি। এ যে ক্ষমাহীন অন্যায়। বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক গণমাধ্যমে বলেছেন, এভাবে গড়িমসি করে মাসের পর মাস নির্দোষ ব্যক্তিকে আটকে রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি মনে করেন, ফরাজিকে তিন দিনের মধ্যে মুক্তি দেওয়া উচিত।

আমাদের আইনের দর্শনে বলা আছে, শত অপরাধী পার পেয়ে যাক, কিন্তু একজন ব্যক্তিও যেন বিনা অপরাধে শাস্তিভোগ না করেন। দুর্ভাগ্য, এসব ভালো কথা শুধু কাগজে-কলমেই থেকে যায়। বাস্তবে ঘটে এর উল্টো। চোখের সামনেই আমরা তিনটি ঘটনা দেখছি। জাহালম, ফজলু, বাদল এ বাস্তবতার স্পষ্ট উদাহরণ।

ছেলেবেলায় দেখা একটি চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ছে। সবার উপরে নামে কলকাতায় নির্মিত ওই ছবিতে ছবি বিশ্বাসের কণ্ঠে একটি সংলাপ ছিল ‘ফিরিয়ে দাও আমার ১২টি বছর’। সেখানেও একই ঘটনা ঘটে। ছবিতে বিনা অপরাধে ১২ বছর কারাগারে থাকতে হয় ওই ছবির অভিনেতা ছবি বিশ্বাসকে। সংলাপটি সেই সময় খুবই আলোচিত ছিল। বিভিন্ন সময় বয়স্কদের মুখে প্রায়ই শুনতাম এ সংলাপটি নিয়ে আলোচনা। আজ বাস্তবে সেই সংলাপ শুনছি জাহালম, ফজলু আর বাদলের মুখে। 

লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক



মন্তব্য