kalerkantho


আনুষ্ঠানিক পাঠদানের বিজ্ঞানসম্মত বয়স কত

মাছুম বিল্লাহ

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আনুষ্ঠানিক পাঠদানের বিজ্ঞানসম্মত বয়স কত

কিন্ডারগার্টেনগুলো এবং বর্তমানকালে চালু হওয়া প্রি-প্রাইমারি স্কুলগুলো শিশু শিক্ষার্থীদের মেধার প্রসার ঘটাচ্ছে, নাকি মেধার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে? চার বছর বয়স হলে শিশুদের স্কুলে যেতে হচ্ছে, যে কালচার আগে ছিল না। এই বয়সে শিশুরা কি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার চাপ নিতে পারে? এখন চার বছর নয়, তিন থেকে সাড়ে তিন বছর হলেই অভিভাবকরা পাঠিয়ে দেন নিকটস্থ কিন্ডারগার্টেনে। এটিকে বর্তমানে আবার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসিডি’ অর্থাৎ আর্লি চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট। একটি শিশুর পক্ষে শিক্ষার চাপ সহ্য করতে পারার কথা কমপক্ষে ছয় বছর বয়সে। কিন্তু তিন কিংবা সাড়ে তিন, এমনকি চার বছর বয়সে স্কুল নামের সামাজিক প্রতিষ্ঠানে যখন শিশু শিক্ষার্থীদের যেতে হয় তখন তার মস্তিষ্কের যে স্থায়ী ক্ষতিসাধিত হয়, তার ক্ষতিপূরণ সারা জীবনেও করা সম্ভব হয় না।

দার্শনিক রুশো চমৎকারভাবেই বলেছেন যে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য শিশুকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। সে প্রকৃতি থেকে শিখবে, স্বাধীনভাবে শিখবে। যেমন আমাদের বাসার ছোট ছোট শিশুকে আমরা কী করতে দেখি? তারা যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ একটির পর একটি বিষয় নিয়ে, জিনিস নিয়ে, বাসার আসবাবপত্র নিয়ে সর্বদাই ব্যস্ত থাকে। একটির পর একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, মুখের সামনে এনে দেখায়, জানতে চায় সেটি কী, কী কাজ করা হয় সেটি দিয়ে। সে একটি বস্তু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, আছাড় দেয়। সেখান থেকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এগুলো প্রকৃতির শিক্ষা। এটিই তার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়, শেখার বড় জায়গা। সে স্বাধীনভাবে শেখে। গ্রামের বাড়িতে হলে বাড়ির উঠানে-আঙিনায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, হাঁস-মুরগি-পশুপাখি দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে, ভাববিনিময় করে। শহরের বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে জায়গা নেই, তবু সারা দিন এ রুম থেকে সে রুমে ঘুরে বেড়ায়, টিভি দেখে, বাসার আসবাবপত্র দেখে, ধরে, প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, ভাঙে, আছাড় দেয়, আদর করে, লুকিয়ে রাখে, নিজের জায়গায় নিয়ে যায়। এসবই তার প্রাকৃতিক শিক্ষার অংশ। আমরা যে ইসিডি কেন্দ্র বলি বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় বলি, সেসব স্থানে কি এগুলোর কোনো কিছু করার সুযোগ শিশুরা পায়?

শিশু যত দিনে নিজে আগ্রহ করে কিছু শিখতে না চাইবে তত দিন তার ওপর কোনো কিছু শেখার জন্য চাপ প্রয়োগ করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। সে যখন শারীরিকভাবে কিছু শেখার যোগ্যতা অর্জন করবে তখন সে নিজে শিখতে চাইবে, আর তখনই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করা উচিত।

শিক্ষার চাপ বহন করার ক্ষমতা অর্জনের জন্য একটি ন্যূনতম বয়স প্রয়োজন। সেই বয়সের আগে চাপ প্রয়োগ করলে শিশুর যতটুকু মেধাবী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ততটুকু মেধাবী সে হতে পারে না। এমনকি তার অর্ধেকও নয়। অর্থাৎ শিশু হয়ে যায় মেধাহীন। জন্মের পর অন্যান্য অঙ্গের মতো আস্তে আস্তে শিশুর মগজের উন্নতি হতে থাকে। আস্তে আস্তে সে মা-বাবাকে চেনে, তারপর তার আশপাশে যারা থাকে, তাদের চেনে। তাদের মুখের কথা শুনতে শুনতে সে একটু একটু কথা বলতে শুরু করে। এভাবে দেখতে দেখতে এবং শুনতে শুনতে নিজে বলতে শেখে। এর জন্য শিক্ষকের প্রয়োজন হয় না, চারপাশের পরিবেশই তার শিক্ষক।

বই-পুস্তক ও হাতে-কলমে শেখা শিশুর জন্য বাড়তি চাপ। এই চাপ শিশু কত বছর বয়সে সহ্য করতে পারে, তা বিচার্য বিষয়। শিক্ষাবিজ্ঞানীরা মোটামুটি একমত যে শিশুর বয়স কমপক্ষে ছয় বছর পূর্ণ হলে তার মগজের যে উন্নতি হয় তাতে বর্ণ পরিচয়, শব্দ শিক্ষা এবং সহজ বাক্য পড়ার মতো ক্ষমতা অর্জন করে। ধীরে ধীরে গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ এবং পাটিগণিতের অতি সহজ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে। কিন্তু ছয় বছরের পরিবর্তে তিন বা চার বছর বয়সে এই চাপ প্রয়োগ করা হলে শিশুর মগজের ক্ষতি হয়ে যায়। এই ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে পাঁচ-ছয় বছর পর, যখন সে ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণিতে ওঠে। কারণ এ সময় কোর্স বৃদ্ধি পায়, কোর্স কঠিন হয়।

শ্রেণিকক্ষে পড়াতে গিয়ে দেখা যায় কিছু ছেলে-মেয়ে শিক্ষকের পাঠদান বোঝার চেষ্টা করে; কিন্তু বুঝতে পারে না। পরখ করলে দেখা যায় শ্রেণির তুলনায় তাদের বয়স কম। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এসব ছেলে-মেয়ে তিন বা চার বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা প্রচুর ঘটছে। ব্রেইন বা মস্তিষ্কের ক্ষমতা নির্ভর করে মস্তিষ্কের পরিমাণের ওপর নয়, এর মিলন বন্ধনীর ওপর। যার মগজের মিলন বন্ধনী যত বেশি তার ব্রেইন তত উন্নত। সে বেশি মনে রাখতে পারে এবং সঠিক চিন্তা করতে পারে। যার ব্রেইনের বন্ধনী ঢিলা তার ব্রেইন দুর্বল। শুধু মানুষ নয়, প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। শিশুর মস্তিষ্কে অল্প বয়সে শিক্ষার চাপ প্রয়োগ করা হলে এই মিলন বন্ধনী মজবুত হতে পারে না।

আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। তাই যেকোনো সচেতন ও সভ্য সমাজে শিশুকে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের মাধ্যমেই এই বিশ্বের নিরন্তর এগিয়ে যাওয়ার নিয়ম প্রতিফলিত হয়। আমাদের ইসিডি সেন্টারগুলো বা শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলো শিশুদের এই মনস্তত্ত্ব কতটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ডিল করে, তা দেখার বিষয়।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক



মন্তব্য