kalerkantho


নির্বাচনের সময় পুলিশের কাছে প্রত্যাশা

মো. নুরুল আনোয়ার

৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচনের সময় পুলিশের কাছে প্রত্যাশা

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বসনিয়ায় ছিলাম। সেখানে উন্নত-অনুন্নত মিলে ৪৩টি দেশের পুলিশের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাই। ভাষাবিভ্রাট এড়ানোর জন্য মিশনের সরকারি ভাষা ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। মিশন থেকে তিনটি ইংরেজি শব্দ শিখে এসেছি। একটি হচ্ছে ‘সাউন্ডস ওয়েল’। তখন খুবই ব্যবহৃত হতো শব্দটি, যার বাংলা প্রতিশব্দ মনে হয় শ্রুতিমধুর বা সুবচন। আমাদের ১১তম সংসদ নির্বাচন অত্যাসন্ন। নির্বাচন যত সন্নিকটবর্তী হচ্ছে একটি শ্রুতিমধুর শব্দ বা সুবচন অনবরত নির্বাচন কমিশন (ইসি), মিডিয়া, বোদ্ধা শ্রেণি, সুধীসমাজ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, এমনকি পুলিশের মুখ থেকেও নিঃসৃত হচ্ছে। সেটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড; যা শুনে শুনে ভোটার তথা জনগণ শিহরিত, আনন্দিত, পুলকিত ও নির্ভার হচ্ছে। কিন্তু কোনো আইনে শব্দটির ব্যাখ্যা নেই। গোলটি সেখানেই। আসলে লেভেল ফিল্ড একটা ধারণাগত শব্দ, আপেক্ষিক কথা। এর নেই নির্দিষ্ট কোনো পরিমাপক, নেই কোনো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা। পক্ষগুলো নিজ নিজ সুবিধামতো এর ব্যাখ্যা দেয়। ‘ক’ দলের কাছে যেটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, ‘খ’ দলের জন্য সেটি অসমতল।

একটা পুরনো কথা মনে পড়ছে এই মুহূর্তে, সবাই পড়েছেন সেটি, ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর।’ দেশে নির্বাচন হবে, অংশীজন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল, মোর্চাগুলো। ভোট দেবে জনগণ এবং রেফারি নির্বাচন কমিশন। বল আছে ভোটার তথা জনগণের হাতে। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা যদি কাম্য-সৌম্য আচরণ করে প্রাক-নির্বাচন দিনগুলোতে, নির্বাচনকালে এবং ফল প্রকাশের পর, তাহলে তো নির্বাচন আসলেই উৎসব। এর ফল ভোগ করবে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ। শান্তিতে-সুখে বসবাস করবে জনগণ। সর্বমুখী উন্নয়নে এগিয়ে যাবে দেশ। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পুলিশ কোনো পক্ষই নয়, তবু নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা ওঠে, আলোচনা হয়, হয় কঠোর সমালোচনা। গত ২২ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে অনুষ্ঠিত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের লিখিত বক্তব্যে পরিষ্কার উঠে এসেছে, এই পুলিশ দক্ষতা ও আন্তরিকতায় অতীতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরেছে। তাঁর আহ্বান এবারও একই পুলিশ নির্বাচনী দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে সক্ষম হবে। জনাব তালুকদার অবশ্য নির্বাচনকালীন আরো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথা অনুল্লেখ রেখেছেন, সেটি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অংশীজনের সংযম। তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন অতীতের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে পুলিশ সফল হয়েছে এবং পুলিশের একইরূপ ভূমিকা আসন্ন নির্বাচনকালে চেয়েছেন। তাহলে তো পুলিশ পরীক্ষায় পাসই করল। অথচ তিনি তাঁর লিখিত প্রবন্ধের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে পুলিশের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ এনেছেন। তাঁর বক্তব্যটি স্ববিরোধী কি না পাঠক বিবেচনা করুন।

প্রাক-নির্বাচন, নির্বাচনকালীন এবং পরবর্তীকালে পুলিশের কাম্য আচরণ কিরূপ হওয়া প্রয়োজন, সেদিকে। আগেই বলেছি, নির্বাচনে অংশ নেয় রাজনৈতিক দলগুলো, পরিচালনায় থাকে নির্বাচন কমিশন, ভোট দেয় ভোটাররা। তারা ঠিক থাকলে ভোটপর্ব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তব সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কারণ নির্বাচনমুখী দলগুলো মুখে গণতন্ত্র, জনসেবা ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের কথা বললেও আসলে তাদের মন ও ধ্যান ‘কুরসির’ দিকে। এটিই মোক্ষ। বাকি কথা উপলক্ষ। একবার কুরসিতে বসতে পারলে পাঁচ বছরের সুখ-আনন্দ, প্রশান্তি ও আত্মসমৃদ্ধির জীবন। সেই কুরসি পাওয়ার জন্য এবং ধরে রাখার জন্য সব কূটবুদ্ধি ও মেধাকে কাজে লাগানো হয়। ফেসবুকে নাকি লন্ডন থেকে এক বড় দলীয় নেতা পুলিশকে আশ্বাস দিচ্ছেন নির্বাচনকালীন কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে। নির্বাচনের কারণে কোনো পুলিশ সদস্যকে তাঁরা চাকরিচ্যুত করবেন না। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে, ২০০১ সালে নির্বাচনের পর জয়লাভ করে দলটি। ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৫৮১ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে তাঁরা চাকরিচ্যুত করেন। এর মধ্যে প্রথম বিসিএসের অতিরিক্ত আইজিপি থেকে পুলিশ সুপার পর্যন্ত ৬৮ জন ছিলেন এবং সবাই মুক্তিযোদ্ধা। লক্ষণীয়, তখন দেশের সব জেলায় ডিসি ও এসপি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা। তখন গোপালগঞ্জে বাড়ি কনস্টেবলকেও পার্বত্য জেলায় বদলি হতে হয়েছে। এখন দলটি পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে অভিযোগ করে। নিরপেক্ষ আচরণ চায় পুলিশের কাছে। যে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা নিরপেক্ষতার দ্বারা তাঁদের ক্ষমতায় আনলেন, ‘কুরসিতে’ বসে তাঁদের চাকরিচ্যুত করে নিজ দলীয় পুলিশ কর্মীদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে সে স্থানে বসালেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য। সেই কর্মকর্তারা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কী ভূমিকা রেখেছিলেন দেশবাসী দেখেছে। অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস ঘটনারোধে গৃহীত আইনি ব্যবস্থা নিয়ে। পুলিশের আইনি পদক্ষেপই সে সময় ভয়াবহ অরাজক অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করেছিল। সেসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বহুদিন আত্মগোপনে থেকে নির্বাচনকালীন সুবাতাসের সুযোগ নিয়ে গর্ত থেকে বের হয়ে নির্বাচনী মাঠে সোচ্চার হচ্ছে। পল্টনে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এটি প্রমাণিত হলো যে তারা বদল হয়নি, প্রয়োজন মনে করলে তারা আবার ছোবল দেবে, সারা দেশে বিধ্বংসী ঘটনা ঘটাবে। সে জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দ্রুত করা দরকার, যাতে আবার তারা জনজীবনকে শ্বাসরুদ্ধ করতে না পারে। ২০১৪-১৫ সালে যে মামলাগুলো হয়েছে, ঘটনাগুলোর জন্য যারা প্রকৃত দায়ী তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি, যাতে এবার নির্বাচনকালে তারা আবার আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটাতে পারে, সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে নির্দোষ মানুষ যাতে মামলাগুলোয় অযথা কষ্ট না পায়। ২১ আগস্ট মামলার রায়ের আগে যে মামলাগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল মনে হয় আইন-শৃঙ্খলা অবনতি রক্ষায় অগ্রিম সতর্কতা হিসেবে, সে মামলাগুলো যেন অতি সতর্কতায় তদন্ত করা হয়, যাতে অকারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এসব মামলায় অতি প্রয়োজন না হলে নির্বাচনের আগে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাওয়া যথাযথ হবে। জানা যাচ্ছে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৪০ হাজার ২০০ কেন্দ্র, কক্ষ দুই লাখ এবং ছয় লাখের বেশি ভোটকর্মী নিয়োজিত হবে। পুলিশ বা আনসার কত নিয়োজিত হবে সে সংখ্যা পাওয়া যায়নি। নির্বাচনকালে ব্যবসা; যেমন—হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ছাপাখানা, মাইক, কম্পিউটার ইত্যাদির প্রচুর ব্যবসা হয়, তদ্রূপ কালো টাকা, জাল টাকা, মাদক, পতিতাবৃত্তি, অপহরণ, গুম, খুন ইত্যাদি সংঘটিত হয়। সঙ্গে হোন্ডা, গুণ্ডা, পাণ্ডাদেরও ভালো আয়-রোজগার হয়। এরই মধ্যে যশোরের এক মনোনয়ন প্রার্থী হোটেল থেকে অপহৃত হয়ে খুন হয়েছেন। মামলাটির সঠিক দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনকালে সন্ত্রাসী খুনিদের কদর বাড়ে। সে জন্য এখন থেকে ১. বিভিন্ন শহরে-এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনির্দিষ্টভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা যেতে পারে। ২. তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গতিবিধির ওপর সর্বত্র নজরদারি করতে হবে, প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করতে হবে। ৩. ওয়ারেন্টভুক্ত অপরাধীদের আটক করতে হবে। ৪. বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাতে হবে। ৫. অবৈধ যানবাহন, বিশেষ করে মোটরসাইকেল আটক করতে হবে। ৬. কালো টাকা ও জাল টাকার ছড়াছড়ি হবে নির্বাচনের প্রাক্কালে, এটা বন্ধ করতে হবে। ৭. চিহ্নিত অগ্নিসন্ত্রাসীদের এখন থেকে আটক করতে হবে। ৮. জঙ্গিদের তৎপরতার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে হবে। ৯. হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে নজর রাখতে হবে। ১০. মাদকের আখড়া ভেঙে দিতে হবে। ১১. ডিজিটাল ‘পুষ্প বালিকা’দেরও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। ১২. সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগ নিরাপদ ও সচল রাখতে হবে। এবার নির্বাচনে পক্ষগুলোর বিরোধ ছাড়াও আরো একটি অতি বড় উপদ্রব আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেটি হচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের হতাশা। এই হতাশা নির্বাচন সময়জুড়ে সংঘর্ষের আশঙ্কার সৃষ্টি করল। বড় দুটি দল ছাড়াও জোটের ভেতরও একইরূপ হতাশা বিরাজ করছে। তারা নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারে। এ ছাড়া সব পক্ষই নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করবে হরহামেশাই। ফলে পুলিশকে অতি কৌশলী ও সাবধানী হতে হবে এখন থেকে। অতি উৎসাহ ও বাড়াবাড়ি পরিহার করতে হবে। নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশ লেজেগোবরে এক করে অনেক দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে অথচ ভোটকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও এসংক্রান্ত বিধিতে পুলিশের কোনো ভূমিকাই নেই। সম্ভবত নতুন জেলাপ্রধান এবং অতি উৎসাহীদের কর্মফল এটি। অথচ এ ধরনের কাজ তো অতীতে করেছে পুলিশ। কোনো কথা হয়নি কখনো। মনে রাখতে হবে, এবারের ভোট হবে ষষ্ঠমুখী, ভিন্নতর মাত্রার। সবাই পুলিশের কাঁধে বন্দুক দিয়ে পার হতে চাইবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পুলিশকে হতে হবে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ, দৃঢ় ও কৌশলী। নির্বাচনের আগের দিন নির্বাচনসামগ্রী নিয়ে পুলিশ ও আনসার দল ভোটকর্তাদের সমভিব্যাহারে ভোটসামগ্রী পাহারা দিয়ে সরাসরি কেন্দ্রে নিয়ে যাবে। রাত্রিকালীন অবস্থান, বিশ্রাম, আহার সেই কেন্দ্রেই করতে হবে। সম্ভব হলে জেলা বা থানা সদর থেকে দলগুলোকে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। ভোট গণনাকালে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অন্ধকারের সুযোগে কোনো দুষ্কৃতকারী অঘটন না ঘটাতে পারে। পোলিং এজেন্ট, ভোটকর্তা, সাংবাদিক, মিডিয়া, পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আচরণে অতি সতর্ক থাকবে পুলিশ। কেন্দ্রের সব ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রিসাইডিং অফিসার পুলিশ নয়। ফলে কেন্দ্রের সব পদক্ষেপ তাঁর সম্মতি বা আদেশে করতে হবে। ভোটকেন্দ্রে অবস্থানকালে কোনো প্রার্থী বা তাঁর সমর্থকদের সঙ্গে মেলামেশা বা খাওয়াদাওয়া করা চলবে না। কোনো কেন্দ্রে জাল ভোট, কারচুপি বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে পুলিশ প্রিসাইডিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার ও কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মতিক্রমে ও আদেশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। মনে রাখতে হবে, রাতে ভোট গণনার ফলাফল আংশিক ফাঁস হয়ে গেলে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা বেসামাল ও মারমুখী হয়ে পড়ে। গুলিবর্ষণের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রিসাইডিং অফিসারের নির্দেশে অতি নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রতিহত করতে হবে, সম্ভব হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি না করে।

সব শেষে বলব, ইসি, রাজনৈতিক দল, ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতার সঙ্গে পুলিশের সংযমী ও কৌশলী আচরণ সমন্বিত হলে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব।

লেখক : সাবেক আইজিপি

 



মন্তব্য