kalerkantho


রামমন্দিরই কি মোদীর শেষ অস্ত্র

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১২ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রামমন্দিরই কি মোদীর শেষ অস্ত্র

ছেলেবেলায় আমরা দেখেছি, কোনো হিন্দু মারা গেলে শ্মশানে সৎকারের জন্য নিয়ে যাওয়ার পথে তার পরিবার-পরিজনের লোকেরা খুব আস্তে স্লোগান দিত ‘রাম নাম সত্যি হ্যায়’, ‘রাম নাম সত্যি হ্যায়’। ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন বিজেপি বা আরএসএস বোধ হয় আন্দাজ করতে পারছে তাদের ভবিষ্যৎ কী। তাই ১৯৯২ সালের মতো আবার ‘রাম নাম সত্যি হ্যায়’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেছে দেশব্যাপী। মোদি সরকার স্থির করেছে বা ঘোষণা করেছে, নির্বাচনের আগেই অযোধ্যা থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত ‘রাম এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন চালু করবে। দীর্ঘ এই আড়াই হাজার কিলোমিটার পথে ট্রেনে দেখানো হবে বিগত শতকের শেষ দিকে টিভির পর্দায় রামায়ণ কান্তের সিরিয়াল। উদ্দেশ্য ভোট ব্যাংক। অযোধ্যা থেকে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার পথে বিশাল সমুদ্র, সমুদ্রের ওপর দিয়ে কি রেললাইন যাবে? এ চিন্তা দেশের ইতিহাসবিদ বিশেষজ্ঞদের। নাকি এই ছয় মাসে সমুদ্র সংকীর্ণ হয়ে যাবে। বিজেপির যে রাম নাম ছাড়া গতি নেই, তা জলের মতো পরিষ্কার। এ পর্যন্ত যা রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে স্বয়ং রামও মোদিকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারবে না। যতই তাঁরা রাম নাম জপ করুক রাম তাঁদের অপকর্মের সঙ্গী হবে না।

এবারে একটু পেছনের দিকে তাকানো যাক, কী করে বিজেপি ১৯৯৮-৯৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। ১৯৯২ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ির আপত্তি সত্ত্বেও লালকৃষ্ণ আদবানির নেতৃত্বে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। এর পরবর্তী সময় সারা দেশে কী ঘটনা ঘটেছিল, তা দেশবাসীর কাছে জলের মতো পরিষ্কার। মসজিদ যে তারা ভাঙবে এ খবর গোয়েন্দারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওকে দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উদ্বিগ্ন রাও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে দিল্লিতে গিয়ে আদবানিকে বোঝাতে অনুরোধ করেন। জ্যোতিবাবু দিল্লি গিয়ে আদবানির সঙ্গে দেখা করে কলকাতায় ফিরে এসে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘মিস্টার আদবানিকে অনুরোধ করলাম ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে খেলবেন না, যার পরিণাম হবে মারাত্মক, যা আপনার দল দেশকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেবে।’ জ্যোতিবাবু সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি আদবানিকে জিজ্ঞেস করলাম, মিস্টার রাম যে ওখানে জন্মেছেন, তা আপনি কী করে জানলেন। কোনো ভূতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ তো আমরা এখনো কোথাও দেখিনি। উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে ওটা তাঁর (আদবানির) ‘ডাওনা’।” সেদিন সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে যদি কোনো দাঙ্গা লাগে, তবে আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাঙ্গা বন্ধ করে দেব।’ জ্যোতিবাবু সাংবাদিক বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, হিন্দু যাবে মন্দিরে পূজা করতে আর মুসলমান যাবে মসজিদে নামাজ পড়তে—এতে বিভেদ কোথায়। জ্যোতিবাবু সেদিন একটি বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এই তথ্যটি আমাকে জানিয়েছে ভারতের হাইকমিশন।’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, লন্ডনের স্ট্রান্ডে ইন্ডিয়া ক্লাবের রেস্তোরাঁয় বসে বাংলাদেশের জামায়াত আর ভারতের আরএসএস নেতারা সব সময় শলাপরামর্শ করেন। জ্যোতিবাবুর উক্তি, ‘এর মানেটা কী আপনারাই বুঝে নিন।’

অন্যদিকে উত্তর প্রদেশের সন্ন্যাসী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সরাসরি ঘোষণা করে দিয়েছেন লোকসভা নির্বাচনের আগেই তিনি অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবেন। যেন মূর্খের স্বর্গে বসবাস। গোহত্যাকে কেন্দ্র করে দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গত সাড়ে চার বছরে কি না হয়েছে? সর্বভারতীয় বিরোধী দলগুলো এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছে। যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তর প্রদেশে গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘু এবং দলিত ভাইয়েরা মারা গেছে আর ওই রাজ্যগুলোতে ধর্ষণ এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। সাড়ে চার বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর দেশে যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে, তা নিয়ে জাতিসংঘ এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গেরুয়া বাহিনী যত রকম চেষ্টাই করুক না কেন, তারা ভারতকে কিছুতেই হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না। ধর্মের নামে দেশে বিভাজন ভারতবর্ষের ১৩০ কোটি মানুষ হতে দেবে না। মিস্টার রামই আসুন বা নরেন্দ্র মোদি বা আরএসএসপ্রধান মোহন ভগবতই আসুন।

এরই মধ্যে রাজ্যে রাজ্যে ঘুরে মোদি, অমিত শাহ ও মোহন ভগবতরা ঝুড়ি ঝুড়ি অসত্য কথা বলে যাচ্ছেন, যার সঙ্গে ঘটনা বা ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই, তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীকে যেনতেন প্রকারে মোদিবিরোধী আন্দোলন থেকে সরিয়ে দেওয়া। কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে ১৭ দলের জোট হয়েছে, সেই জোটের মধ্যেই বিভাজন সৃষ্টি করা। সম্প্রতি সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবীদের এক সভায় রাহুল গান্ধী বলেছেন, ভারতের সংবিধানে যেমন মুখবন্ধে বলা আছে Of the people by the people for the people. কংগ্রেস পার্টির কর্মসূচির মধ্যেও আছে of সংখ্যালঘু of দলিত by দলিত। তাঁর এই উক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মোদি বাহিনী প্রচারে নেমেছে কংগ্রেস মুসলমানদের দল। যেসব বুদ্ধিজীবী রাহুলের ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁরা পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, এরা রাহুলের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এটা নিয়ে গলা ফাটিয়ে টিভির পর্দায় দাবি করেছেন, কংগ্রেস দল মুসলমানের দল। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জেড কে ফয়জান। তিনি টিভির পর্দায় বলেছেন যে রাহুল ওই সভায় বলেছেন, সংখ্যালঘু মুসলমান, দলিত ও বিসি অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া মানুষদের অভাব-অভিযোগ কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মিটিয়ে ফেলবে। মোদি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীর মন্তব্য আরো নিন্দনীয়। তাঁর মন্তব্য হলো, রাহুল সাম্প্রদায়িক শক্তিকে তুলে ধরে নির্বাচনী ফায়দা লুটতে চাইছেন।

এই বিতর্ক সবই ভোটকেন্দ্রিক। এরই মধ্যে রাহুল একটি মোক্ষম রাজনৈতিক চাল দিয়েছেন। মোদিকে একটি চিঠি লিখে বলেছেন, ‘মহিলা আসন সংরক্ষণের বিলটি আনুন, আমরা সমর্থন করব।’ এই বিল আনা হবে বলে ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু সংগ্রেস থেকে বারবার দাবি করা সত্ত্বেও এই বিল ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন মোদি। এই বিলের মূল বক্তব্য হলো—

বিধানসভা, বিধান পরিষদ, লোকসভা ও রাজ্যসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ, আরএসএস বা বিজেপি—কেউই চায় না মহিলারা রাজনীতির প্রথম সারিতে উঠে আসুক। তাই এই বিল তারা পাস করতে চায় না। ভারতের গেরুয়া বাহিনী কিছুতেই মহিলাদের রাজনীতিতে আসতে দেবে না। রাহুল যতই দাবি করুন, ঘর সামলাতে না পেরে এখন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের একমাত্র লক্ষ্য হলো রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসকে হেয় করে হিন্দুত্ববাদের স্লোগান দিয়ে তাঁরা পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হবেন।

মোদি, অমিত শাহরা যতই রাহুল, তাঁর বাবা রাজীব গান্ধী ও তাঁর ঠাকুমাকে গালাগাল করে ইতিহাস থেকে তাঁদের নাম মুছে দেওয়ার কথা বলেন না কেন, এটাই স্পষ্ট, তাঁরা রাজনীতিতে এতই নিচে নেমে গেছেন যে তা ব্যাখ্যা করা বা সংবাদপত্রে লেখা বেশ কষ্টকর।

মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আরএসএস বা গেরুয়া বাহিনী প্রচার শুরু করেছে যে রাহুল গান্ধীর মা বিদেশিনী। তিনি বিদেশিনীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। সুতরাং রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। রাহুল বা কংগ্রেস দল এখন পর্যন্ত দাবি করেনি যে রাহুলই প্রধানমন্ত্রী হবেন। তাহলে এই আশঙ্কা কেন? তবে কি বুঝতে হবে তাঁদের মাটিতে চিড় ধরেছে? না, তা নয়। আসল খবরটা আরএসএসের দিল্লি অফিসে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে। বর্তমানে মোদি যে সংখ্যালঘু সরকার চালাচ্ছে (সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দরকার ২৭৪ আর মোদির আছে ২৬৯), দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তর ও নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তরে কান পাতলে শোনা যায়, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বর্তমান সংসদের লোকসভার সদস্যদের পক্ষে ১৫০ জন সদস্যকে মনোনয়ন দেবে না। এই ১৫০ জন সদস্যের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন বিজেপির জন্মদাতা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নায়ক লালকৃষ্ণ আদবানি। অমিত শাহর লাল চোখ দেখে এরা আর ভয় পায় না। যেমন রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার কাছে অমিত শাহ পর পর তিনজনকে রাজস্থানে বিজেপির প্রদেশ সভাপতি করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। বসুন্ধরা তা বাতিল করে দিয়ে বলেছেন যে ‘আমার রাজ্যে কে সভাপতি হবেন তা আমি ঠিক করব, অমিত শাহ কে?’ এককথায় বলা যায়, দেশের বর্তমান হাল দেখে বিজেপির অভ্যন্তরীণ সংগঠন এখন পুরোটা আরএসএসের হাতে।

যেসব আঞ্চলিক দল; যেমন—উত্তর প্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতী এবং অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু তাঁদের ভাঙানোর জন্য আরএসএস নানা কৌশল করছে। তাদের কৌশল হলো, যেভাবেই হোক রাহুল গান্ধীকে আটকাতে হবে, সে জন্য ব্যক্তি রাহুলের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে কুৎসা রটানো হচ্ছে। কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষ আরএসএসের এই কুচক্রী প্রচারকে মেনে নিতে পারছে না। আরএসএস কী ধরনের নোংরামি করতে পারে, তা আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। হিন্দি বলয়ের নানা নির্বাচনে প্রতিবেদন করতে অনেকবার গিয়ে দেখেছি তাদের কদর্য নোংরামি। আমার মনে আছে, উত্তর প্রদেশে একবার নির্বাচনী প্রতিবেদন করতে গিয়ে আরএসএসের হুমকির মুখে পড়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে আমরা সেভাবে আরএসএসের দাপট দেখিনি। অথচ মমতার আশকারায় আরএসএস পশ্চিমবঙ্গকেও গ্রাস করে ফেলছে। শুধু কি সংগঠনের জোরে, নাকি আর্থিক জোরে? বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে আমেরিকা প্রচণ্ডভাবে বিরোধিতা করেছিল, এটা ইতিহাস। তারই পরিণামে বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

বর্তমানে আরএসএস, বিজেপির আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্য রাহুল গান্ধী কেন? এ প্রশ্নটা উঠেছে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ও কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী শশী থারু আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি মোদি আবার ক্ষমতায় ফেরেন, তবে ভারত হবে একটি হিন্দু তালেবানি রাষ্ট্র। তাঁদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তা ভারতের প্রত্যেক মানুষ প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে। তাই এখন মোদির ভরসা হলো ‘রামমন্দির’ ও রাম এক্সপ্রেস। এতেই কি সামাল দিতে পারবেন? এ প্রশ্নটাই এখন ভারতের রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।

লেখক : কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



মন্তব্য