kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো। ধারাবাহিক

পাপাচারে লিপ্ত হওয়া এক ধরনের জুলুম

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পাপাচারে লিপ্ত হওয়া এক ধরনের জুলুম

৫৭. তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যাকে তার রবের আয়াতগুলো স্মরণ করানো হয়, অথচ সে তা থেকে বিমুখ হয়ে যায় এবং তার কৃতকর্ম ভুলে যায়? নিশ্চয়ই আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়েছি, যেন তারা (সত্য বা কোরআন) হৃদয়ঙ্গম করতে না পারে। আর তাদের কানে বধিরতা এঁটে দিয়েছি। তুমি তাদের সৎ পথে আহ্বান করলেও তারা কখনো সৎ পথে আসবে না। (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৫৭)

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, অবিশ্বাসীরা মিথ্যার ওপর ভর করে সত্যকে ব্যর্থ করতে চায়। আলোচ্য আয়াতে তাদের কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বিশ্ব মানবতার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে, যাদের কাছে আল্লাহর কোরআন উপস্থাপন করা হয়, অথচ তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? এমন মানুষের সামনে সত্যের যত প্রমাণ হাজির করা হোক না কেন, তারা ঈমান আনে না। এসব মানুষ সমাজে দম্ভভরে চলাফেরা করে। অথচ আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে না। তারা তাদের অতীত পাপের কথা মনে রাখে না। এই পাপাচার ও অনাচার নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। কেন তারা পাপের পথ থেকে বের হতে পারে না? এর কারণ হলো, তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা সত্য গ্রহণ ও অনুধাবন করতে অক্ষম। স্বাভাবিকভাবে যারা মিথ্যা ও প্রতারণার অস্ত্র দিয়ে সত্যের মোকাবেলা করে, তারা সত্য মেনে নিতে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত হয় না। এর ফলে মহান আল্লাহ তাদের অন্তর তালাবদ্ধ করে দেন, সত্যের প্রতিটি ধ্বনির জন্য তাদের কানকে বধির করে দেন। ফলে তাদের পাপের পথ থেকে বের হওয়ার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয় না। এ ক্ষেত্রে তাদের ঈমান আনতে বাধ্য করা হয় না। কেননা কাউকে ঈমান আনতে বাধ্য করা নবীদের কাজ নয়। মানুষকে সুসংবাদ ও সতর্ক করার মাধ্যমে সুপথ দেখানোই নবীদের কাজ। এ ব্যাপারে বল প্রয়োগের কোনো অধিকার তাঁদের নেই। নবীদের সদিচ্ছা ও সর্বতো চেষ্টা সত্ত্বেও এসব মানুষ হেদায়েতের পথে আসে না। তাই আয়াতের শেষাংশে মহানবী (সা.)-এর উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘তুমি তাদের সৎ পথে আহ্বান করলেও তারা কখনো সৎ পথে আসবে না।’ কেননা পাপ থেকে মুক্ত হয়ে পুণ্যের পথে আসার দরজাগুলো তারা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে। তারা নিজেরাই সুপথে চলতে ও সুপথ পেতে আগ্রহী নয়। ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি ও ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকা ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। ঘুমন্ত ব্যক্তিকে কয়েকবার ডাকার পর একসময় জেগে ওঠে; কিন্তু যে ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে, তাকে লাখো-কোটিবার জাগানোর চেষ্টা করলেও সে জাগবে না।

আলোচ্য আয়াতের একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয়। এ আয়াতে ঈমান না আনা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়াকে সবচেয়ে বড় জুলুম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কোরআনের পাঠক মাত্রই জানে যে এ আয়াত ছাড়াও কোরআনের বহু আয়াতে পাপাচারকে জুলুম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর কারণ হলো, জুলুম বা অবিচার যেভাবে অন্যের ওপর করা যায়, একইভাবে তা নিজের ওপর করা যায়। কাউকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলা জুলুম। একইভাবে নিজেকে হত্যা করা নিজের ওপর জুলুম। কোরআনের পরিভাষা অনুযায়ী, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া নিজের ওপর এক ধরনের অবিচার। কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার নিজের ওপর আজাব অবধারিত করে ফেলে। আদম ও হাওয়া (আ.)-এর জবানে কোরআনে বিবৃত হয়েছে, ‘তারা বলল, হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো, তাহলে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৩)

গ্রন্থনা : মুফতি কাসেম শরীফ



মন্তব্য