kalerkantho


এযাবৎকালের কঠিন পরীক্ষায় সৌদি মিত্ররা

অনলাইন থেকে

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



এযাবৎকালের কঠিন পরীক্ষায় সৌদি মিত্ররা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত ১৬ অক্টোবর রিয়াদে পৌঁছানোর পর সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলার জন্য পোজ দেন। তাঁরা জেটলগ নিয়েও কথা বলেন। তবে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে বসবাসকারী খাশোগি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর আর ফিরে আসেননি। কয়েক দিন ছলনার আশ্রয় নেওয়ার পর সৌদি আরব খাশোগি ওই বিকেলেই ফিরে গেছেন বলে যে দাবি করে আসছিল, তা বলা বন্ধ করে দেয়। কেউ কেউ মনে করে, কনস্যুলেটের ভেতরেই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। আর কাজটি করেছে তাঁর নিজ দেশের নাগরিকরাই। প্রশ্ন হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমারা কী করার কথা ভাবছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব—দুটি দেশই চায় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ুক। তিনি (পম্পেও) সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করে খাশোগির বিষয়টি নিয়ে রিয়াদের তদন্তের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছেন। তাঁর বস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই ঘটনার বিষয়ে বাদশাহ ও তাঁর ছেলের বক্তব্য বয়ান করে গেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আবারও কাজটি করছি। আপনারা জানেন, নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আপনি অপরাধী।’

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। এর চাপেই একসময় হয়তো তারা অপরাধের অংশবিশেষ হলেও স্বীকার করতে বাধ্য হবে। হয়তো বলবে, অপহরণের বিষয়টি কেঁচে যাওয়ার কারণেই খাশোগির মৃত্যু হয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে ইস্তাম্বুলে উড়ে যাওয়া দলটির মধ্যে কেন একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞকেও রাখা হয়েছিল তার ব্যাখ্যা দিতে হবে রিয়াদকে। প্রিন্স মোহাম্মদকে আড়াল করতে তারা হয়তো পুরো ঘটনার জন্য কিছু ‘দুর্বৃত্ত’ কর্মকর্তার ঘাড়ে দায় চাপাবে। সাধারণের বিশ্বাস এমনই। অতীতের যেকোনো শাসকের তুলনায় যুবরাজ অনেক বেশি ক্ষমতাবান। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপরও তাঁর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

ট্রাম্পও হয়তো এই যেনতেন গল্প বিশ্বাস করতে আগ্রহী হবেন। যুক্তরাষ্ট্র আগামী মাসে ইরানের ওপর আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে। কাজেই আগামী মাস থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্প এখন সৌদি শাসকদের অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে চান না। ইরান অবশ্য সৌদিরও শত্রু। ইরানের ওপর এবার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় তেল রপ্তানির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হবে। তা ছাড়া গত বছর ১১ হাজার কোটি ডলারের যে অস্ত্র চুক্তি ট্রাম্প সৌদির সঙ্গে করে এসেছেন, সেটিও তিনি নষ্ট করতে চান না। অর্থের পরিমাণ বেশ বড়। তা ছাড়া ভবিষ্যতে চুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট করতে চান না তিনি। এ ছাড়া রাশিয়াকেও ভুললে চলবে না। প্রিন্স মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ এক সৌদি সাংবাদিক সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প পরিত্যাগ করলে ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে ঝুঁকবে সৌদি আরব।

তুরস্কও পরিস্থিতিকে যথেষ্ট ঘোলাটে করেছে। খাশোগির সম্ভাব্য এই হত্যার বিপুল তথ্য গণমাধ্যমের হাতে তুলে দিয়েছে তদন্তকারীরা। এর মধ্যে খাশোগিকে শেষ সময়ে করা ভয়াবহ নির্যাতনের অডিও রেকর্ডিংও রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সতর্কভাবে তৎপর। কেউই প্রকাশ্যে সৌদি আরব ভুল করেছে এমন অভিযোগ করেননি। আংকারার কর্মকর্তারা এককভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে আগ্রহী নন। এ ধরনের কোনো তৎপরতা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হাসিল করতে চান তাঁরা। খাশোগি হত্যার যেকোনো স্পষ্ট প্রমাণ তাঁদের উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে বাঁচাতে সৌদি বিনিয়োগও পেয়ে যেতে পারেন তাঁরা।

হয়তো কোনো সংকট ছাড়াই সৌদি আরব এর থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। তবে বিষয়টি তাদের ভাবমূর্তিতে বিশাল একটি কালো দাগ হিসেবে থেকে যাবে। কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই পক্ষই ঘটনাটি নিয়ে ক্ষুব্ধ। রিপাবলিকান সিনেটর এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ লিন্ডসে গ্রাহামের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে গত ১৬ অক্টোবর ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসে’  (ট্রাম্পের প্রিয় অনুষ্ঠান) তিনি প্রিন্স মোহাম্মদকে ‘অক্ষম বল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘তাঁকে যেতেই হবে। আমি সৌদি আরবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছি।’ আইন প্রণেতারা ম্যাগনিটস্কি আইন প্রয়োগ করতে আগ্রহী। এই আইনবলে খাশোগির মৃত্যুর জন্য দায়ী যেকোনো ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব। 

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র নৃশংস স্বৈরাচারদের সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী। স্বৈরাচাররা আস্থাভাজন না হলে বিষয়টি ভিন্ন। প্রিন্স মোহাম্মদের আবেগপ্রবণ আচরণের রেকর্ড রয়েছে। এর নজির পাওয়া যায় কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ থেকে শুরু করে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে অপহরণের মধ্য দিয়ে। ইয়েমেনে তিনি যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তা থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। খাশোগির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তাঁর এই ধারাবাহিক রেকর্ডের ওপর আরো তীক্ষ্মভাবে আলো ফেলেছে। তবে ওয়াশিংটনে কেউ কেউ মনে করে, সৌদি আরব এখন আর বিশ্বের সর্বোচ্চ তেল উৎপাদনকারী নয়। কাজেই তাদের অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়ার আর প্রয়োজন নেই।

প্রিন্স মোহাম্মদ কখনোই সৌদি আরবকে একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি তাঁর জনগণকে একটি চুক্তির কথা শুনিয়েছেন, ‘সামাজিক স্বাধীনতা এবং অর্থনীতির আধুনিকায়নের বিনিময়ে আমার শাসন গ্রহণ করো।’ তবে শেষ পর্যন্ত প্রিন্স মোহাম্মদ তাঁর এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আগামী ২৩ অক্টোবর রিয়াদে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বড় বড় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এ সম্মেলন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করেছে। রাজপরিবারের বহু সদস্যের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের পতনের কারণই না হয়ে দাঁড়ান সালমান।

বাদশাহ যুবরাজ পাল্টাতে পারেন। এরই মধ্যে তিনি দুই দফা কাজটি করেছেন। তবে বাদশাহ সালমানের বয়স এখন ৮২ বছর এবং তিনি অসুস্থ। তাঁর সজ্ঞানে থাকার সময় কমে আসছে। সব নিয়ন্ত্রণ তাঁর ছেলের হাতে। এমনকি বাদশাহকে যেন পরামর্শ দিতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে নিজের মাকেও বন্দি করে রেখেছেন প্রিন্স মোহাম্মদ। কেউ কেউ আশা করছে পারিবারিক পরিষদ হয়তো তাদের নতুন বাদশাহ বেছে নেবে। তবে দেশের ভেতরে সমবেত না হওয়ার ব্যাপারে তীব্র চাপের মুখে রয়েছে রাজপরিবারের সদস্যরা। যুবরাজের বহু ভাই এখন দেশের বাইরেই বেশির ভাগ সময় অবস্থান করে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সৌদি আরবের এক প্রতিবেশী দেশের রাজপরিবারের এক সদস্য বলছিলেন, ‘রাজপরিবারের সদস্যদের শরণার্থীদের মতো জীবন যাপন করা দুঃখজনক।’

প্রিন্স মোহাম্মদ ধর্মীয় নেতাদের পরিষদ, জাতীয় গার্ড এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁকে সরানো কঠিন হবে। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর দিন নিয়ে আমার ভীতি আছে। আমি হয়তো আমার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত করার আগেই মারা যাব।’ নতুন সৌদি আরব সৃষ্টির ঘোষণা দেওয়া এই ব্যক্তি হয়তো তাঁর আগের বহু আরব স্বৈরাচারের মতোই দেশের আগে নিজেকে স্থান দিয়েই শেষ হয়ে যাবেন।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য