kalerkantho


শারদীয় দুর্গোৎসব ► বিশেষ আয়োজন

দুর্গাপূজার উৎসকথা

নিরঞ্জন অধিকারী

১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



দুর্গাপূজার উৎসকথা

একসময়ে শুধু মহিষমর্দিনীরূপে দেবী দুর্গার পূজা প্রচলিত ছিল। লক্ষ্মী এখনকার মতো লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও শিবের প্রতিমা দেবী দুর্গার সঙ্গে ছিল না। প্রচলিত বিশ্বাস এই, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। মনু সংহিতার বাঙালি টীকাকার কুল্লুকভট্টের পিতা উদয় নারায়ণ যজ্ঞ করতে ইচ্ছুক হয়ে রাজশাহী জেলার অন্তর্গত তাহিরপুরের রাজপুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী মহাশয়ের কাছে উপদেশ নিতে যান। রমেশ শাস্ত্রী তাঁকে দুর্গাপূজা করার উপদেশ দেন এবং নিজেই একখানা দুর্গাপূজা পদ্ধতি রচনা করেন। অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করেছিলেন সম্ভবত উদয় নারায়ণের পৌত্র কুল্লুকভট্টের পুত্র রাজা কংস নারায়ণ।

তাই বলে এটাই প্রথম দুর্গাপূজা নয়। বর্তমানে যে পদ্ধতিতে দুর্গাপূজা হয় সেই পদ্ধতিতে এবং রমেশ শাস্ত্রী সংকলিত রীতি-পদ্ধতিতে যে দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয়, সেই পদ্ধতির দুর্গাপূজা এখনো চলছে। এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে রাজা কংস নারায়ণই প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন, এর আগে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল না।

ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতের শক্তি ও শাক্ত সাহিত্য’ শীর্ষক গ্রন্থে বাংলায় দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘দুর্গাপূজা ঠিক কখন হতে বাংলাদেশে প্রচলিত একবারে সেকথা নিশ্চিত করিয়া কিছু বলা যায় না।’ 

দুর্গাপূজার বিধানসংবলিত যে পুঁথিগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো দেবী পুরাণ-মার্কণ্ডেয়, পুরাণ-দেবী-ভাগবত, কালিকা পুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, বৃহৎ নদ্দিকেশ্বর পুরাণ প্রভৃতি উপপুরাণ থেকে সংকলিত। বিদ্যাপতি লিখেছেন ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী।’ তাতে উদ্ধৃত হয়েছে, ‘কলিবিলাসতন্ত্রে’ কার্তিক-গণেশ, জয়-বিজয় (লক্ষ্মী-সরস্বতী) এবং দেবীর বাহন সিংহ সমেত প্রতিমায় শারদীয় দুর্গাপূজার উল্লেখ আছে।

স্মার্ত রঘুনন্দন (১৫০০-১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ)-এর ‘তিথিতত্ত্ব’ গ্রন্থে ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’  নামক একটি মৌলিক গ্রন্থও তিনি রচনা করেছেন। রঘুনন্দন ‘কলিকাপুরাণে’ বৃহৎ নন্দিকেশর পুরাণ ও ভবিষ্য পুরাণসহ পূর্বতন গ্রন্থাদি থেকে অনেক উপাদান তাঁর গ্রন্থদ্বয়ে ব্যবহার করেছেন বলে নিজেই ঋণ স্বীকার করেছেন।

ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত আরো উল্লেখ করেছেন : রঘুনন্দনের  পরবর্তীকালের নিবন্ধনকার রামকৃষ্ণের নিবন্ধের নাম ‘দুর্গার্চনাকৌমুদি’। মিথিলার প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত বাচস্পতিমিশ্র (১৪২৫-১৪৮০) তাঁর ‘ত্রিয়াচিন্তামণি’ ও ‘বাসন্তীপূজাপ্রকরণ’ গ্রন্থদ্বয়ে দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমার পূজা পদ্ধতি বিবৃত করেছেন। বাচস্পতি রঘুনন্দনের বয়োজ্যেষ্ঠ বিবৃত ছিলেন। বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি (১৩৭৫-১৪৫০) তাঁর ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গণী’ গ্রন্থে (১৪৭৯) মৃন্ময়ী দেবীর পূজা বর্ণনা করেছেন। রঘুনন্দনের গুরু শ্রীনাথের ‘দুর্গোৎসব বিবেক’ গ্রন্থে উত্তর পদ্ধতির আলোচনা পাওয়া যায়।

দ্বাদশ শতকের নিবন্ধকার শূলপাণির দুর্গাপূজাবিষয়ক তিনটি নিবন্ধগ্রন্থ আছে। যথা—‘দুর্গোৎসব বিবেক’,  ‘বাসন্তী বিবেক ও দুর্গোৎসব-প্রয়োগ’। শূলপাণি তাঁর পূর্ববর্তী নিবন্ধনকার জীবন ও বালক নামক দুজন পণ্ডিতের বাকাবলি উদ্ধার করেছেন। বাংলার প্রাচীনতম স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট ও জীকন এবং বালকের বহু বাক্য উদ্ধার করেছেন। জীকন ও বালক বাংলার সেনরাজাদেরও পূর্ববর্তী ছিলেন এবং ভবদেব ভট্ট ছিলেন একাদশ শতকের রাজা হরিদেব বর্মণের প্রধানমন্ত্রী।

ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানে শরৎকালে বাংলায় দুর্গাপূজা হয় তা মহিষমর্দিনী। পুরুলিয়ার দেইলাঘাটায় মহিষমর্দিনী দুর্গা নবম শতকে নির্মিত ক্লোরাইট পাথরের একটি মূর্তি পাওয়া গেছে। অবশ্য মহিষমর্দিনী বা প্রাচীনতম নিদর্শন হচ্ছে মধ্য ভারতের উদয়গিরিতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়ে নির্মিত একটি প্রস্তর মূর্তি। মূর্তিটি চতুর্থ শতকের।

এ পর্যন্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম যে চতুর্থ শতকেও মহিষমর্দিনী বা দুর্গার পূজা করা হতো। অবশ্য দুর্গা উমা বা পার্বতীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গিয়েছিলেন অনেক আগেই, সেই সঙ্গে লৌকিক দেবতা চণ্ডীও।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে দুর্গরক্ষাকারিণী এক দেবীর পূজা করা হতো। তাঁর নাম অপরাজিতা।

তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অন্তর্গত যাজ্ঞিকা উপনিষদে দেবীর নাম হিসেবে দুর্গা নামের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋগেবদেও স্ত্রী দেবতা হিসেবে দেবী সুক্তে দেবীর বন্দনা করা হয়েছে।

উমা-পার্বতী, দুর্গাচণ্ডী প্রভৃতি শক্তিদেবীর সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে একটি কথা বোঝা যায়, দেবীর মধ্যে শাক্ত মতের বা মাতৃপূজার নানা কাল্ট বা ধর্মমতের ধারা এসে মিশেছে। এর মধ্যে লৌকিক দেবী, বৌদ্ধ দেবী ও পৌরাণিক দেবী—এই তিনটি প্রধান ধারার সমন্বয় ঘটেছে। মিশে গেছে ‘নবরাত্র’ উৎসব, যে উৎসবে দেবী মূর্তিতে নয়, ঘটে ও মন্ত্রে পূজিত হয়ে থাকেন।

দুর্গাপূজার মন্ত্রে বৈদিক ও তান্ত্রিক উভয়বিধ মন্ত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। তন্ত্রে পরমা প্রকৃতি হিসেবে শক্তির দেবী এবং পরম পুরুষ হিসেবে শিবের পূজা তথা শিব-শক্তিভিত্তিক কায়া সাধনার প্রাগার্য তত্ত্ব ও প্রায়োগিক দিকের আলোচনা হয়েছে। আবার শস্যের দেবী এবং উর্বরতার দেবী হিসেবে স্ত্রী-দেবতা ও মাতৃকার পূজা সিন্ধু সভ্যতার অনেক আগে থেকে চলে এসেছে। সিন্ধু সভ্যতার কাল খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ বছর থেকে ১৯০০ বছর পর্যন্ত। আর্যরা প্রাগার্যদের কাছ থেকে মূর্তিপূজার ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিল। আর হিন্দু সভ্যতা প্রাগার্য ও আর্য সভ্যতার সমন্বয়ের ফলেই গড়ে উঠেছিল।

যা হোক, সিন্ধু সভ্যতায় মাতৃকাদেবী মূর্তির বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায় মাতৃকা তথা শক্তি দেবতার পূজা খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগেও প্রচলিত ছিল।

এবার বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের বাইরে তাকানো যাক। গ্রিসের রুহী দেবী, এশিয়া মাইনরের সিবিলি, ইজিপ্টের ইস্থার, আইসিস প্রভৃতি প্রাচীন মাতৃকাদেবী ভারতবর্ষীয় মাতৃকাদেবীর অনুরূপ। ঠিক মহিষমর্দিনী দুর্গার অনুরূপ এক দেবী হচ্ছেন ভূমধ্য সাগরাঞ্চলের বাইর্গো দেবী। এই বাইর্গো যুদ্ধের দেবী। ভূমধ্য সাগরাঞ্চলবাসী মন-খেম্ও জাতিকে পরাজিত করেছিলেন। এই মহিষমর্দিনী দেবী মূর্তির মূল কথা বলেছে অনেকে। এই মন-খেম্ও কি মহিষাসুর? অন্তত এর মধ্যে ভারতবর্ষের বাইরের সাক্ষ্যে দেবী ও মহিষাসুরের যুদ্ধের এবং মহিষমর্দিনী তথা দুর্গাপূজার প্রাচীনতার একটি পরিচয় মেলে।

এবার কিছু পৌরাণিক প্রমাণ গ্রহণ করা যাক। ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণের বোধনমন্ত্রে এর উল্লেখ আছে। যদিও বাল্মীকির রামায়ণে রাম কর্তৃক দুর্গাপূজার ঘটনা নেই। বাল্মীকির পুঁথিতে না থাকলেও রাম দুর্গাপূজা করেননি, এ কথা বলা যায় না এবং তা যৌক্তিক নয়। বাল্মীকির রামায়ণ খুঁজে দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ না পেয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারে বলে বাহুল্য হলেও এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখলাম।

শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীর বোধন করেন। বোধন মানে জাগানো। এর অর্থ কী? প্রাচীন রীতি অনুসারে হিন্দুরা বর্ষকে দুভাগে ভাগ করেছেন—দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ। আষাঢ় মাস থেকে সূর্যদেব মকর রাশিতে অগ্রসর হতে থাকেন একে দক্ষিণায়ন বলে। আর পৌষ মাসে সূর্যদেব আবার উত্তর দিকে আসতে শুরু করেন। একে উত্তরায়ণ বলে। দক্ষিণায়ন দেবতাদের নিদ্রার কাল। শরৎকাল দক্ষিণায়নের মধ্যে পড়েছিল বলেই শ্রীরামচন্দ্রকে দেবীর বোধন করাতে হয়েছিল অর্থাৎ শ্রীরামচন্দ্রকে দেবীকে জাগাতে হয়েছিল। শরৎকালে দুর্গাপূজা করার সময় তাই এখনো দেবীর বোধন করা হয়। এতে বাসন্তীপূজার মতো শুধু আমন্ত্রণ অধিবাস করলে চলে না।

অনেকে মনে করে, শ্রীরামচন্দ্রই বহু আগে শরৎকালে দেবীর আরাধনা করেন এবং তিনিই সর্বপ্রথম অকালবোধন করেন। এ ধারণা ঠিক নয়। শ্রীরামচন্দ্রের  আগেও শরৎকালে দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল।

শ্রীরামচন্দ্রের বহু আগে স্বারোচিষ মন্বন্তরে হৃতসর্বস্ব হয়ে চৈত্রবংশীয় রাজা সুরথ মেধস মুনির আশ্রমে গমন করেন। মেধস মুনি তাদের নদী তীরে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে ‘দেবীসূক্ত’ দ্বারা দেবীর আরাধনা করার উপদেশ দেন। তখনো চণ্ডী বা দেবী মাহাত্ম্য পাঠ প্রচার হয়নি। তাই ভক্তরা দেবীসূক্ত পাঠ করেই শক্তির আরাধনা করত। সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য তিন বছর দেবীর আরাধনা করে রাজা সুরথ তাঁর হৃতরাজ্যে ফিরে পান। মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রী চণ্ডী অংশে এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। মনোমোহন গুহ তাঁর ‘বঙ্গে দুর্গোৎসব’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : ‘এই মেধস মুনির আশ্রম চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীতীরে ছিল। খুব সম্ভবত রাজা সুরথ নিকটবর্তী কোনো প্রদেশের রাজা ছিলেন। দেবীর কৃপায় নিজ রাজ্য লাভ করিয়া নৃপতিবর যে দেবী পূজা প্রচলন করিবেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এইরূপে বঙ্গদেশে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গড়িয়া পূজার প্রচলন হয়।’ অবশ্য এ মত এখনো সর্বসম্মত নয়।

স্বারোচিষ দ্বিতীয় মনু। পৌরাণিক উল্লেখ অনুসারে তাঁর মন্বন্তরে মৃন্ময়ী মূর্তিতে দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটে। বলা বাহুল্য, এ পর্যন্ত সর্বমোট ছয় মনু অতীত হয়েছেন। এখন সূর্যতনয় বৈবস্বত নামক সপ্তম মনুর অধিকার চলছে।

এখন মাতৃকা দেবীর পূজার আরো পেছনের কৃষি যুগের আগেকার অতীতের দিকে তাকাই। এ বিষয়ে পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর ‘পূজাপার্বণের উৎস কথা’ নামক গ্রন্থে যা উল্লেখ করেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘প্রাচীনতম যেসব প্রাসঙ্গিক প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেছে তার থেকে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে নব্য প্রস্তর যুগ শুরু হওয়ার ঢের আগেই প্রত্ন-প্রস্তর যুগের মধ্য কিংবা শেষ স্তরের গোড়ার দিকে মানুষের মানসলোকে মাতৃকা সত্তার প্রতিষ্ঠা ও আরাধনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন, সেই অতি প্রাচীন যুগের মাতৃকা মূর্তিগুলো কমবেশি ২০ হাজার বছর আগের প্রত্ন-প্রস্তর যুগের শেষ দিকে শেষ তুষারাচ্ছন্ন পর্বের মধ্যলগ্নে প্রমাণ হিসেবে তিনি অস্ট্রিয়ার ভিল্লেরফে, ফ্রান্সের ল্যাসেলে, ইতালির স্যাভিন্যানোতে পাওয়া ভেনাস পিগারাইনস নামক মাতৃকামূর্তিগুলো এবং দক্ষিণ ইউরোপ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত মাতৃকামূর্তিগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে দুর্গা তথা শক্তিপূজার প্রাচীনতা সম্পর্কে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলো রেরিয়ে আসে।

১. মন্ত্রময়ী দেবীর পূজা থেকে যন্ত্র, ঘট ও প্রতীক এবং প্রতীক থেকে পরে প্রতিমাপূজার প্রচলন ঘটেছে।

২. বর্তমানে মহিষমর্দিনী দুর্গতিনাশিনী দুর্গার লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, শিব প্রভৃতি দেবতাসহ যে প্রতিমার পূজা প্রচলিত, তাও কমপক্ষে ৪০০ (চার শ) বছরের পুরনো। দুর্গা প্রতিমা শস্যদায়িনী (নবপত্রে যা দৃষ্টান্ত রয়েছে), উমা-পার্বতী, চণ্ডী ও অন্যান্য লৌকিক দেবী এবং শৈব ও বৈষ্ণব মতের সঙ্গে শক্তি মতের সমন্বিত অবস্থার পরিচয় বহন করে। হিন্দুধর্মে সামগ্রিকভাবেই এই সমন্বয় ঘটেছে।

৩. শুধু মহিষমর্দিনী দুর্গা পূজিত হচ্ছেন চতুর্থ শতক থেকে, এ ঐতিহাসিক প্রমাণ যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি দ্বিতীয় মনু স্বারোচিষের মন্বন্তরে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য শ্রীরামচন্দ্রের বহু আগে সেই মহিষমর্দিনীর পূজা করেছেন এ পৌরাণিক প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। পৌরাণিক কাহিনিটি (শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বিধৃত) এই প্রমাণ দিচ্ছে যে সুদূর অতীতেও মহিষমর্দিনীর পূজা বঙ্গদেশে-বাংলাদেশে আরো ক্ষুদ্র পরিসরে চট্টগ্রামে প্রচলিত ছিল।

৪. তৈত্তিরীয় আরণ্যকের যাজ্ঞিক উপনিষদে ‘দুর্গা’ নামের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।

৫. ঋগেবদের দেবী সূক্তে বাক্নাম্নী এক দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তবে আর্যচিন্তাসম্ভূত ঋগেবদে স্ত্রীদেবতার প্রাধান্য ছিল না।

৬. সিন্দু সভ্যতার কালে প্রাগার্য সভ্যতা পোড়ামাটির মাতৃকা মূর্তিগুলো থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে মাতৃকাপূজা সেকালে (২৫০০-১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) প্রচলিত ছিল। পরে পৌরাণিক যুগে আর্য ও প্রাগার্য সভ্যতার সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট নতুন সভ্যতায় (হিন্দু সভ্যতা) দেবীর গুরুত্ব বাড়ে।

৭. লৌকিক দেবী এবং তন্ত্রের প্রমাণে প্রমাণিত যে দেবী পূজা বা শক্তি পূজা অতি প্রাচীন।

৮. ভারতবর্ষে ও বহির্বিশ্বে প্রাপ্ত মহিষমর্দিনী মূর্তিগুলো মহিষমর্দিনীর প্রাচীনতা প্রমাণ করে।

৯. সর্বশেষে বলা যায়, মাতৃকা মূর্তিপূজা কমবেশি ২০ হাজার বছর আগে থেকে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের শেষ দিকে তুষারাচ্ছন্ন পর্বের মধ্যলগ্নেও প্রচলিত ছিল।

১০. আমরা ২০ হাজার বছর আগেকার সাক্ষ্য উপস্থিত করেছি। কিন্তু সেটাই যে শুরু তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু তার আগেকার তথ্য আমাদের জানা নেই।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

 

 



মন্তব্য