kalerkantho


এক নির্বাচন অনেক দুশ্চিন্তা

মো. জাকির হোসেন

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এক নির্বাচন অনেক দুশ্চিন্তা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বলতে গেলে দরজায় কড়া নাড়ছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আগামী চার মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। সে হিসাবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্র যেহেতু শুধুই ক্ষমতা দখল কেন্দ্রিক, তাই বাংলাদেশি স্টাইলে গণতন্ত্রচর্চার সব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। নির্বাচনই গণতন্ত্রের ধন্বন্তরি চিকিৎসা ও দাওয়াই হিসেবে বিবেচিত, যদিও এটি একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। শুধু ব্যথা নিবারক ওষুধ দিয়ে যেমন ক্যান্সার নিরাময় করা যায় না, তেমনি শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়েই আমাদের শয্যাশায়ী গণতন্ত্রের জটিল অসুখ সারানো যাবে না। ৪৭ বছর বয়সী বাংলাদেশে ২০ বছর তথা চারটি সরকার অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু নির্বাচন দ্বারা গঠিত হলেও গণতন্ত্রের অসুখ এতটুকু কমেনি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিহিংসা ও সহিংসতা ক্রমাগতই বেড়েছে। রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রের শাখা-প্রশাখা নানামুখী বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশিদের ডেকে এনে রাজনীতি আরো অশ্লীল করা হয়েছে। রাজনীতিতে বিদেশি প্রভুদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিনাশী এ আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সুধীবাবু ও ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্নরাও’ যুক্ত হয়েছেন বলে চাউর হয়েছে।

আমাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় যেহেতু নির্বাচনই সব, তাই নির্বাচন এলেই নানামুখী দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচন ঘিরে বিএনপির দুশ্চিন্তা হলো, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার প্রশ্ন মীমাংসা। অন্যদিকে বিদ্যমান সাংবিধানিক স্কিমের আওতায় শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাওয়া, নাকি আন্দোলন করে সরকারকে বাধ্য করে নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা, তা-ও বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। নানা প্রতিকূলতার কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন প্রতিহত করতে বিএনপি ২০১৪ সালের মতো পেট্রল আন্দোলনে যাবে কি না, তা-ও দুর্ভাবনার বিষয়। নির্বাচনের আগে সরকারের পতন ঘটাতে ‘রাজনৈতিক এতিম’ ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের নিয়ে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রেও বিএনপির দুশ্চিন্তা রয়েছে। রাজনীতিতে অপেশাদার শৌখিন ভূমিকা পালনকারী কামাল হোসেনকে আস্থায় নেওয়া ও তাঁর ওপর নির্ভর করা নিয়েও বিএনপিতে দুশ্চিন্তার কমতি নেই। কলকাতায় জন্ম নেওয়া, ঢাকায় বেড়ে ওঠা, পাকিস্তানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কামাল হোসেনকে নিয়ে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। একাত্তরের ৯ মাস তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে পাকিস্তানে শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উদারতায় তাঁরই ছেড়ে দেওয়া আসনে ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তিনি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আইনমন্ত্রী হন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সব শেষে পেট্রোলিয়াম ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায়ই তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজে নেতৃত্ব দান করেছেন। অথচ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর ভূমিকা রহস্যজনক। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর আন্তর্জাতিক কানেকশন কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য সোচ্চার হতে পারতেন। আর তেমনটি করলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য বাঙালিকে দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হতো না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে তিনি সে ভূমিকা পালন করেননি। আর এখন তো বঙ্গবন্ধুর গড়া দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তিনি শত্রুতা-ষড়যন্ত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। যাঁরা মনে করেন, কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নয়, বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সোচ্চার হয়েছেন, তাঁদের কাছে আমার একটি বিনীত জিজ্ঞাসা—গণতন্ত্রের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করা কামাল হোসেন গণতন্ত্রের কোন নীতি অনুযায়ী গত প্রায় তিন দশক গণফোরাম নামক দলের প্রধান হয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। দলে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় অনেকেই সটকে পড়েছে। যিনি ক্ষুদ্র একটি রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারেন না, তাঁর পক্ষে ১৭ কোটি মানুষের দেশে গণতন্ত্রচর্চার আশ্বাস মোটেও বিশ্বাসযোগ্য কি?

আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন, বৃহৎ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি কোন ভরসায় কামাল হোসেনের ওপর আস্থা রাখবে? তিনি অতীতে একাধিকবার জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়েছেন। এরপর খেই হারিয়ে আবার উল্কার মতো অদৃশ্য হয়ে গেছেন। তদুপরি তাঁর তো কোনো গণভিত্তিও নেই। সর্বশেষ যে নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন, তাতে সাকল্যে ছয় হাজার ১৮৭ ভোট পেয়ে জামানত খুইয়েছেন। অন্যদিকে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির সমন্বয়ে জোট গঠনেও রয়েছে নানা শঙ্কা। বিএনপি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে জোর করে অপদস্থ করে বের করে দিয়েছিল। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র (১৯৯১-২০০৬)’ শিরোনামের গ্রন্থে সে অপমান, অপদস্থ ও জুলুমের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘জাতি যেসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে, এটা ছিল তার মধ্যে একটি অন্যতম নজিরবিহীন ও অশোভনীয় ঘটনা। নিজের দলের লোকদের হুমকির মুখে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতির এহেন নিষ্ক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। গোটা জাতি ঘটনাক্রমে স্তম্ভিত ও আহত হয়েছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে যেভাবে হেয় করা হয়েছে এবং পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তা কেউই পছন্দ করেনি।’

ব্যারিস্টার মওদুদ আরো উল্লেখ করেছেন, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার পর তিনি সরকারবিরোধী হিসেবে রাজনীতিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপি সরকার তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। ২০০৪ সালের ১৩ মার্চ বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিকল্পধারা নামে মুক্তাঙ্গনে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ঘোষণার আয়োজন করেন। অনুষ্ঠান হওয়ার আগের দিন রাতেই বিএনপির ক্যাডাররা তাঁর নির্মিত মঞ্চ ভেঙে দেয়। পরদিন সকালে ‘বাস্তুহারা কল্যাণ পরিষদ’ নামে পরিচয়বিহীন নামসর্বস্ব বাস্তুহারাদের একটি ভুয়া সংগঠনের গুণ্ডারা সেই জায়গা দখল করে রাখে। বিএনপির ক্যাডাররা সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজাকে তাড়া করলে তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন।” বদরুদ্দোজা চৌধুরী মওকা পেলে এ অপমানের প্রতিশোধ নেবেন না, তা হলফ করে বলা যায় না। কামাল হোসেন, বি চৌধুরীরা বুঝতে পেরেছেন, বিভিন্ন দলছুট ‘এতিম রাজনীতিকদের’ নিয়ে ‘রাজনীতির এতিমখানা’ খোলা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার মতো রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় না।

বাতাসে ফিসফাস শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জোটের আড়ালে আসলে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। শোনা যাচ্ছে, কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ছাড়াও এই নতুন রাজনৈতিক দলে বিএনপির বড় একটি অংশ থাকবে। খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত হলে তাঁর রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন হবে। এ অবস্থায় বিএনপির একটি অংশ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা জুতসই মনে করছে অনেকেই। এটিও বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার কারণ। এসবের কিছুই যদি না ঘটে, বরং বিএনপির কয়েকজনকে নিয়ে যদি নির্বাচনকালীন সরকার হয়, তাতেও বিএনপির নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে কি? জনগণকে কাছে টানতে গত ১০ বছরে বিএনপি কী এমন করেছে যে জনগণ তাদের ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে? তদুপরি পেট্রল আন্দোলনে শতাধিক মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা, কোটা সংস্কার ও খুদে ছাত্র-ছাত্রীদের নিষ্পাপ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বিএনপির ছিনতাইয়ের চেষ্টা এবং একে সহিংস রূপ দেওয়া মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতিবাচক বিষয়গুলো ছাড়া নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের আর কী ইতিবাচক বিষয় রয়েছে?

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার কারণ শেখ হাসিনা। তিনি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দেশপ্রেমের মহান ব্রতে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। পররাষ্ট্রনীতিতে পশ্চিমা কূটনীতির পরিবর্তে প্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে মনোযোগী হয়েছেন। শেখ হাসিনার নতুন কূটনীতি পাশ্চাত্যের স্বার্থে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করেছে। ফলে কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির সালভাদর আলেন্দে, ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট, ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, গুয়াতেমালার জ্যাকাবো আরবেঞ্জ, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা ও বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনারও মৃত্যু কিংবা নিদেনপক্ষে ক্ষমতাচ্যুতির পরওয়ানা জারি হয়েছে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে শেখ হাসিনাবিরোধী প্রচারণাযুদ্ধ ও ভয়ানক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছড়ানো গুজব থেকে সৃষ্ট উসকানির ব্যাপারে যাচাই-বাছাই না করেই অতি উৎসাহী ছিল কিছু পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও আলজাজিরা নামের গণমাধ্যম এবং তাদের এ দেশীয় লোকাল এজেন্টরা। অন্য সব রাষ্ট্রের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৌড়ঝাঁপ, ষড়যন্ত্র বাড়াবাড়ির সীমাকেও অতিক্রম করেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কারণে-অকারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে, পদ্মা সেতু নিয়ে মিথ্যা গুজব সৃষ্টি করেছে, বিনা কারণে জিএসপি বাতিল করেছে, এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও মন্তব্য করে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো, একদিকে তারা তাদের দূতাবাস থেকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চলাচলের ওপর সতর্কতা জারি করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রাতের আঁধারে পুলিশকে না জানিয়ে ঢাকা শহরে গোপন বৈঠক করেছেন! অথচ নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রদূতের চলাচলের আগে পুলিশকে বাধ্যতামূলকভাবে জানাতে হয়।

শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করতে কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপির সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট কিংবা নতুন দল গঠনে মূল প্রযোজক ও পরিচালকের ভূমিকায় রয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। সরকারের সিদ্ধান্ত সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে বিধায় সব সময়ই সরকারি দলের বিরুদ্ধে জনমনে নানা অসন্তোষ বিরাজ করে। তদুপরি আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী, কিছু মন্ত্রী-সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী ‘হাইব্রিড’ ‘কাউয়াদের’ গণবিরোধী কর্মকাণ্ড আগামী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করছে, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে জনগণ তাদেরই আবারও বেছে নেবে। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে যে তত্ত্বটি কাজ করে তা হলো, সরকার কী করেছে সেটাই শুধু মুখ্য নয়, বরং সরকার কী করতে পারত সেটিও বেশি বিবেচ্য বিষয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের কিছু আত্মঘাতী কৌশল ভোটের বাক্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আগামী নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপি যদি অংশ না নেয়, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তখন নির্বাচনোত্তর সরকারের দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর সে ক্ষেত্রে সরকারকে অস্থিতিশীল ও ক্ষমতাচ্যুত করতে বিএনপি সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। আর বিএনপি অংশ নিলে এবং নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়ম হলে বিএনপি গণ-অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে যে আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করবে, তা দ্রুতই অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়া ও আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা কামাল হোসেন ও বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জোট বা নতুন দলে যোগ দিতে পারেন—এমন একটি আশঙ্কার কথাও শোনা যাচ্ছে। এমনটি হলে নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ বেকায়দায় পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়, তাহলে কী ঘটবে সেটিও আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার বিষয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের মৃত্যুদণ্ডকে তারা বিবেচনা করছে হত্যাকাণ্ড হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমানের নির্বাসনের জন্যও বিএনপি আওয়ামী লীগকে দায়ী করে প্রকাশ্যেই বলছে—এসব জুলুমের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়া হবে। আর এটি অবাস্তবও কিছু নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই পিলখানা ট্র্যাজেডি ঘটানো হয়েছে। তার আগে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য ও রাজনীতিকের মেলবন্ধনে আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে বিএনপি-জামায়াতের জমে থাকা আক্রোশ আর ক্রোধ কত গুণ শক্তিশালী হয়ে আওয়ামী লীগকে আঘাত করে, তা-ও আওয়ামী লীগের জন্য বড় দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার বিষয়। এদিকে নির্বাচন না করে ১/১১ স্টাইলে বিরাজনৈতিকীকরণের একটি দুর্বল প্রচেষ্টাও আমাদের সুধীবাবুদের বিবেচনাধীন। এটিও আওয়ামী লীগের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।

কথায় বলে—রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। সব দুশ্চিন্তা আর শঙ্কার জবাব দেবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমজনতারূপী উলুখাগড়াদের রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

 

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com



মন্তব্য