kalerkantho

শুভ জন্মাষ্টমী

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শুভ জন্মাষ্টমী

কৃষ্ণ চরিত্র মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। অখণ্ড ধর্মীয় ভারতের রূপকার কৃষ্ণ। অন্তত সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ভারত সভ্যতার যিনি বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জীবনব্যাপী সাধনার দ্বারা কৃষ্ণ ভারতীয় সভ্যতার শুধু জন্মই দেননি, তাঁর ভালে যৌবনের জয়টিকাও পরিয়ে দিয়েছেন। আজ তাঁর জন্মোৎসব। কৃষ্ণের জন্মজয়ন্তীকে বলে জন্মাষ্টমী। ‘জন্মাষ্টমী’ না হয়ে ‘কৃষ্ণাষ্টমী’ হলেই ভালো হতো, তাহলে কৃষ্ণের সঙ্গে অষ্টমীর যুগল বন্ধন হয়ে কৃষ্ণের জয় ঘোষণা করত। যেমন রাধাষ্টমী। রাধাষ্টমী শব্দের ভেতর দিয়েই রাধার জন্মের উৎসব সূচিত হয়—নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। জন্মোৎসবে জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা করাই সংগত।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও কর্ম অভিনব ও অসাধারণ। ভাদরের আদরে কৃষ্ণের জন্ম হলেও সে রাতটি ছিল ভয়াবহ-ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিদ্যুৎ চমকিত। কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল কংসের কারাকক্ষে। সংসারে ও সমাজে একটি সন্তানের জন্ম হলে সেটি উৎসবে পরিণত হয়। চারদিকে ললনাগণের উলুধ্বনি ও মঙ্গল শঙ্খ বাজতে থাকে। কৃষ্ণের জন্ম সময়ে কোনো উলুধ্বনি হয়নি, কোনো মঙ্গলশঙ্খ বাজেনি। বেজেছিল। বৃষ্টি উলুধ্বনি দিয়েছিল। আর বিদ্যুৎ বাজিয়েছিল মঙ্গলশঙ্খ। তাই কৃষ্ণ জনমদুঃখী। কিন্তু কৃষ্ণ শুধু নিজের জীবনের নয়, জগত্জনের দুঃখও মোচন করেছিলেন। কৃষ্ণের ইতিহাস বিজয়ের ইতিহাস। কৃষ্ণের জীবনে পারিবারিক, সামাজিক, পারিবেশিক ও রাষ্ট্রীয় ঝড় ও দুঃখ নেমেছে। কৃষ্ণ কোনো দুঃখই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেননি বরং সব দুঃখ বুক পেতে গ্রহণ করেন এবং স্থির হয়ে তার সুষ্ঠু সমাধান দিয়েছেন। সমস্যা থেকে পালিয়ে গেলে সমস্যা কমে না বরং বাড়ে, জড়িয়ে ধরে। কৃষ্ণ তাই কোনো সমস্যা থেকে পালিয়ে যাননি। বীরবিক্রমে সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে তার সমাধান করেছেন।

বাল্যকালেও কৃষ্ণের জীবনে প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে। কংসবধ থেকে কুরুক্ষেত্র পর্যন্ত কৃষ্ণের জীবনে নেমেছে কঠিন ঝড়। বীরত্ব বীরত্ব বিশেষত তীক্ষ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কৃষ্ণ এসব ক্ষেত্রে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন, বিশেষত কুরুক্ষেত্রের বিজয় কৃষ্ণকে ভারতের অদ্বিতীয় ভাবমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কংসের কারাকক্ষে জন্ম হলো কৃষ্ণের। প্রকৃতি অস্বাভাবিক। ঝড়-বৃষ্টি বিদ্যুৎপাত। পূর্বপ্রতিশ্রুতি মোতাবেক বসুদেব সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে চললেন কংসের আগারে। দৈবকী বললেন হে আর্য, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তুমি (বসুদেব) সাতটি সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দিয়ে সত্য ধর্ম রক্ষা করেছ, কিন্তু একটি ধর্ম রক্ষা হয়নি। সেটি পিতৃধর্ম। সন্তানকে সর্বতোভাবে রক্ষা করাই পিতৃধর্ম, তুমি অনেকবার কংসের হাতে সন্তানকে তুলে দিয়ে সত্য ধর্ম পালন করেছ; কিন্তু একটি সনির্বন্ধ প্রার্থনা—তুমি এই সন্তানটিকে কংসের হাত থেকে রক্ষা করে অন্তত একটিবারের জন্য পিতৃধর্ম রক্ষা করো। প্রিয়তমা স্ত্রী দৈবকীর কাতর প্রার্থনায় বসুদেবের চিন্তায় মোড় খেল, সত্যিই তো, আমি একটি সন্তানকেও যমের করালগ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারলাম না। এটি কি পিতার কর্তব্য। হ্যাঁ, দৈবকীর কথাই ঠিক। এই সন্তানটিকে নিষ্ঠুর যম কংসের হাত থেকে রক্ষা করে অন্তত একবার পিতৃধর্মকে রক্ষা করি। বসুদেব মুখ ফেরালেন। কংসের গৃহাভিমুখ থেকে গোকুলের দিকে। গোকুলে রয়েছে বসুদেবের কাকাতো ভাই নন্দ। নন্দ বসুদেবের ভাই। তা ছাড়া পূর্বপরীক্ষিত। বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী পুত্র বলরামকে নিয়ে নন্দের আশ্রয়েই তো আছে। অতএব কালবিলম্ব না করে বসুদেব পুত্রকে নিয়ে নন্দের গোকুলেই রওনা হলো। ওদিকে গোকুলে নন্দের স্ত্রী যশোদা একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেছে। বসুদেব নন্দের সহায়তায় নিজ পুত্রকে যশোদার কাছে রেখে তার কন্যাটিকে নিয়ে মথুরার দিকে যাত্রা করলেন। তখনো প্রকৃতি অশান্ত। ভোর হয়নি, পাখি ডাকেনি। কংস কন্যাটিকে পেয়ে দুহাত ধরে পাষাণে আছাড় মারলেন। কন্যাটি কিন্তু কংসের হাত থেকে পিছলে আকাশের দিকে উঠে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘আমারে মারিলি তুই, তোরে মারিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ কংস প্রশ্ন করলেন গোকুলে কে বাড়ছে, তাকে নিধন করার জন্য? খোঁজ করে তাকে হত্যা করতে হবে। চারদিকে কংসের সেনারা বেরিয়ে পড়ল। কংসের মন্ত্রক নারদ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মথুরার চারদিকে বিশেষত গোকুলে কঠিন তল্লাশি চলতে লাগল। কৃষ্ণকে খুঁজতে গিয়ে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করল কংসের সৈন্যরা। কৃষ্ণকে নিয়ে নন্দ পালিয়ে গেল বৃন্দাবনের মাঠে।

রাজার সন্তানকে বনবাসে বাস করতে হলো। কৃষ্ণ নিজের গুণে বনবাসকে নিজবাস করে নিল। কৃষ্ণের কত বন্ধু, কত সখা, কত খেলার সাথি। প্রতিদিন নতুন নতুন খেলা খেলে গোধন চড়িয়ে কৃষ্ণের সময় কাটে। গোকুলে একটি বাৎসরিক প্রথা ছিল। ইন্দ্রপূজা। পহেলা বৈশাখে এই পূজাটি হতো। ইন্দ্রপূজা হলে বৃষ্টি নামত। কৃষ্ণ এই পূজার পরিবর্তন সাধন করেন। কৃষ্ণ বোঝালেন যারা কৃষক, তাদের গ্রীষ্ম ঋতুতে বৃষ্টি প্রয়োজন আছে। বৃষ্টি নামলে মাটি নরম হয়। কৃষকের চাষ ও বীজ বপনের সুবিধা হয়। কিন্তু গোপিদের পেশা কৃষিকাজ নয়। অতএব তাদের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক নেই। গোপিদের মূলধন, ঘি, ঘোল বিক্রয় করে গোপদের জীবন চলে। অতএব গোপিদের যদি কোনো পূজা করতে হয়, তাহলে গরুপূজা করাই উচিত। অতএব কৃষ্ণ গোপিদের ইন্দ্রপূজার পরিবর্তে গোপূজা করতে বলেন। প্রচলন হলো দেব পূজার পরিবর্তে জীবিকা পূজা। জীবিকা জীবন ও জাতিকে রক্ষা করে। অতএব জীবন ও জাতিকে রক্ষা করার স্বার্থেই জীবিকাকে অধীর করতে হবে—ভালোবাসতে হবে, পূজা করতে হবে। পূজা না পেয়ে ইন্দ্র খেপে গেলে সে অনর্গল বৃষ্টি আরম্ভ করল। লক্ষ্য গোপিদের ভাসিয়ে দেবে। কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত ধারণ করে গোকুলকে রক্ষা করল।

গোকুলের ঘন বনে প্রচুর বাঘ। মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট পাহাড়, গাছপালাবেষ্টিত অন্ধকারাচ্ছন্ন জলাশয়। প্রায়ই গরু বাঘে নিয়ে যায়। গোপিদের একমাত্র অবলম্বন গাভি বাঘে নিয়ে গেলে তাদের আর দুর্দশার অন্ত থাকত না। কৃষ্ণ পরামর্শ দিলেন বৃন্দাবনে গেলে কেমন হয়। কৃষ্ণের পরামর্শ আহিরি পল্লী মেনে নিল। গোপেরা বৃন্দাবনে চলে গেল। এখানে বন আছে, ফুলের বন। বাঘ পালানো জঙ্গল নেই। অতএব গোপিদের গাভি আর বাঘে নেয় না। তা ছাড়া বৃন্দাবনের উঁচু ভূমিতে প্রচুর ফুলের বাগান মৃদুমন্দ বাতাস। ফুলের প্রাণভরা সুগন্ধ। জ্যোত্স্নামোদিত মৃদু চঞ্চল নদীর জল গোপিদের পাগল করে তুলল। রসিকেন্দ্র ব্রজ কিশোর কৃষ্ণ নদীর ধারের পুষ্প-গন্ধ মাতাল প্লাবিত রাতে বাঁশিতে তাল ধরলেন। সে তাল কি শুধু বৃন্দাবনকে, বিশ্বের সব বনকেই মাতাল করল। সে বাঁশি আজও বাজে। যার কান আছে, সে উপলব্ধি করতে পারে।

কৃষ্ণ গোকুল ত্যাগ করে বৃন্দাবনে এলেন। আসলে গোকুলের গোপিরা উন্নত পরিবেশের কারণে জনপদের স্থানান্তর করেনি। উন্নত পরিবেশের জন্য নিরাপত্তার কারণে কৃষ্ণ আরেকবার সভ্যতার স্থানান্তর করেছিলেন সে মথুরা থেকে দ্বারকায়। কংস বধের পর কংসের শ্বশুর মথুরা আক্রমণ করেছিল। একবার নয়, দুবার নয়, ১৮ বার। অতএব নিরাপত্তার কারণে কৃষ্ণ মথুরা সভ্যতাকে দ্বারকায় স্থানান্তর করে। অতএব সভ্যতার বিকাশ সাধনে ও নিরাপত্তার কারণে স্থানান্তরের দৃষ্টান্ত কৃষ্ণ স্থাপন করেছেন কৃষ্ণের বৃন্দাবন অংশের শেষ লীলা বয়স। পুষ্প-গন্ধ ব্যাকুল জ্যোত্স্না রাতে যমুনার তীরে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতে আরম্ভ করলে সেই বংশীধ্বনি জগেক মোহিত করল, মাতাল করল গোপ নারীদের। গোপিরা সাংসারিককাজে ব্যস্ত ছিল—তারা ভুলে গেল সংসারের কাজ। বৈষ্ণব কবিরা তার অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যেও রাসের বর্ণনা অপরূপ। তবে ভাগবতের সঙ্গে গীত গোবিন্দের সময়গত পার্থক্য লক্ষণীয়। কৃষ্ণের বাঁশির আকর্ষণে গোপ-গোপিরা যমুনা তীরে পৌঁছালে কৃষ্ণ গোপিদের ভর্ত্সনা করেছেন। নারীরা স্বামী-সংসারের কাজ ফেলে রাতে যমুনা তীরে আসাটা অনুচিত বলে কৃষ্ণ মনে করেছেন। শেষে কৃষ্ণ গোপিদের সঙ্গে মিশেছেন—উল্লাস করেছেন। রাসের মাধ্যমে কৃষ্ণ রস ও রসময়ের সেতুবন্ধ ঘটিয়েছেন। গোপিরা কৃষ্ণের রসময় ও সর্বময় অবস্থান সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করেছে। ক্ষুদ্র নিবন্ধে সংক্ষিপ্তাকারে রাস পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই।

 

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ

ujjalray21@gmail.com

 



মন্তব্য