kalerkantho


আনন্দযাত্রা মরণযাত্রা হবে না তো

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



আনন্দযাত্রা মরণযাত্রা হবে না তো

আবার শুরু হয়েছে ‘নাড়ির টানে, বাড়ির পানে’ সেই রুদ্ধশ্বাস যাত্রা। ট্রেনে টিকিট নেই। লঞ্চ-স্টিমারে তিল ধারণের জায়গা নেই। দ্বিগুণ ভাড়া। ট্রেনের লাগাতার শিডিউল বিপর্যয়। লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, টার্মিনাল, রেলস্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনিশ্চিত অপেক্ষা। চার-পাঁচ ঘণ্টার পথ গড়াচ্ছে ১৬-১৭ ঘণ্টায়। সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য চারদিকে ওত পেতে আছে অজ্ঞান পার্টি, পকেটমার ও ছিনতাইকারীচক্র। ঘরমুখো মানুষের উৎসাহে তার পরও কমতি নেই এতটুকু। নেমে পড়ছে আনন্দযাত্রার মিছিলে। টিকিট নেই তো কী হয়েছে, ছাদ তো আছে। সিট নেই তো কী হয়েছে, বাম্পার তো আছে। বাম্পারে বা লঞ্চের ডেকে পা দুটি রাখতে পারলেই যেন সই। শিকড়ের কাছে যাওয়া যে চাই-ই চাই।

গত ঈদুল ফিতরেও ঈদ যাত্রায় শতাধিক লোক মারা যায়। এর আগে ২০১৬ সালের ঈদের আগে-পরে ১২ দিনে (১-১২ জুলাই) সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮৬ জন নিহত ও ৭৪৬ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন নিহত ও ৬২ জন আহত। ওই সময় ১২১টি সড়ক দুর্ঘটনা, তিনটি নৌ দুর্ঘটনা ও তিনটি রেল দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। ২০১৫ সালের রমজানের ঈদের আগে-পরে ১১ দিনে ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় রেকর্ডসংখ্যক ২৫২ জন প্রাণ হারায়। গড়ে প্রতিদিন ২৩ জন। ওই সময় এক দিনে সর্বাধিক ২৯ জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এমনকি ঈদের দিনও ২৩ জন নিহত হয়। আর আহতের সংখ্যা? আল্লাহ মালুম! ওই রেকর্ডটি আগে ছিল ২০০৯ সালে। ওই বছর ঈদুল ফিতরে ১৭৫ জন মারা যায়। ২০১৪ সালেও দুই ঈদের আগে-পরে ১৪ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৫ জন মারা যায়; গড়ে  প্রতিদিন ২০ জন।

বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ রাষ্ট্রগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের জরিপে এখানে প্রতিবছর ১৮ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ওই সংখ্যা ১২ হাজার, বিআরটিএর হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১৬ জন এবং বছরে পাঁচ হাজার ৭৬০ জন প্রাণ হারাচ্ছে। চালকদের ভুলেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া বিভিন্ন কারণে দেশের ৪০ শতাংশ মহাসড়কই চলাচলের অনুপযুক্ত।

তা ছাড়া রাস্তায় এখনো দুই লাখের বেশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার চালককে। নিবন্ধিত প্রায় ১০ লাখ গাড়ি চলছে লাইসেন্সহীন চালক দিয়ে। নিয়ম-নীতি না মেনে লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৩২ হাজার পেশাদার চালকের। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার সড়ক দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হত্যা মামলাগুলোকে মাত্র তিন বছর কারাদণ্ডযোগ্য মামলায় রূপান্তর করছে। এমনকি এই রূপান্তরকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বৈধতা দানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তো সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কী করে?

দেশের যে যোগাযোগ অবকাঠামো, তা কোনো অর্থেই ঈদের মতো বড় উৎসবে বিপুল মানুষের চাপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তা ছাড়া ঈদে যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি পরিবহন কম্পানি বাসের যাত্রা (ট্রিপ) ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। স্বাভাবিক সময়ের মতো মেরামতের জন্যও তখন বিরতি দেওয়া হয় না। ফলে বাস-চালক কারও বিশ্রাম থাকে না। বাড়তি চাহিদার সুযোগে হাজার হাজার লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এসব গাড়ির চালকদের অনেকেরই দূরপাল্লার বাস চালানোর অভিজ্ঞতা থাকে না। সঙ্গে তাদের বেপরোয়া গতি তো আছেই। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ।

নৌপথে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা লঞ্চ। কিন্তু এ যাত্রাও নিরাপদ নয়। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোয় চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক লঞ্চেরই ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। তদারকি সংস্থার কর্মকর্তাদের তদারকি নেই। ঈদ এলে এ সমস্যাগুলো আরো প্রকট হয়। এক শ্রেণির অসাধু লঞ্চ ব্যবসায়ী তখন অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য পুরনো ও অকেজো শত শত লঞ্চ মেরামত ও নতুন রং করে নদীতে ছেড়ে দেয়। নদীতে এরূপ ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসহীন নৌযানের ছড়াছড়ি, নৌ কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব, যাত্রী পরিবহনে মাত্রাতিরিক্ত অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা, ধারণক্ষমতার চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, টিকিটের স্বল্পতা ও কালোবাজারি, নাজুক নৌ ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে ঈদের সময় নৌযাত্রাটা  স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আর ঈদের মতো বড় উৎসবে রেলের সার্ভিস দানের ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। ঈদ এলে রেল কর্তৃপক্ষ কয়েকটি অতিরিক্ত বগি যোগ এবং বিভিন্ন রুটে কিছু ট্রিপ বাড়িয়েই বেশির ভাগ সময় দায় সারে। তা ছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বারবার সময়সূচি পরিবর্তন, যখন-তখন বগিচ্যুতি আর ছাদ থেকে পড়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় রেলযাত্রা খুব একটা সুখকর নয়। সঙ্গে টিকিটের সোনার হরিণ সংকট তো আছেই। আর আকাশছোঁয়া ভাড়ায় আকাশপথ এখনো গণমানুষের নাগালের বাইরে। ঈদ যাত্রায় তাই অনিরাপদ বাস-ট্রেন-লঞ্চ-স্টিমারই ভরসা।

ঈদের দিন এগিয়ে আসছে, পাল্লা দিয়ে তাই আতঙ্কটাও বাড়ছে—এই বিপুলসংখ্যক ঘরমুখো মানুষ নিরাপদে ঘরে পৌঁছতে পারবে তো, নাকি মাঝপথে ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড হয়ে যাবে? ঈদ শেষে সবাই অক্ষত শরীরে ফিরতে পারবে তো, নাকি পদ্মা, মেঘনা বা যমুনা নদী কিংবা বঙ্গোপসাগরের কোনো দ্বীপে লাশ হয়ে ভেসে উঠবে? এই ঈদ যাত্রা যে আমাদের মৃত্যুযাত্রা বা শেষ যাত্রা হবে না তার গ্যারান্টি এই পোড়া দেশে কে দেবে?

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib2@gmail.com

 



মন্তব্য