kalerkantho


‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন’

‘বাজেটকে শুধু এক বছরের আয়-ব্যয় হিসেবে না দেখে আমাদের বুঝতে হবে যে অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা আছে কি না? এ বাজেট আমাদের কোথায় নিতে চায়। আমাদের সামনে দুটি বড় লক্ষ্যমাত্রা আছে। একটি হচ্ছে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, আরেকটি হচ্ছে সরকার ঘোষিত ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছা। সেখানে পৌঁছতে হলে বাজেট স্টেপে স্টেপে বাড়ছে কি না তা দেখতে হবে। আমরা দেখেছি, এবারের বাজেট আমাদের টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরছি, কিন্তু সেই মহাসড়কে পৌঁছতে ব্যর্থ।’

শনিবার রাতে সময় টিভির ‘সম্পাদকীয়’ অনুষ্ঠানে ‘কার কথা বলে বাজেট’ শীর্ষক আলোচনায় সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক, অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান এসব কথা বলেন। এটি সঞ্চালনা করেন খান মুহাম্মদ রুমেল।

অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান আরো বলেন, আমরা চাই বাজেট সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হোক। কিন্তু বাজেটের কারণে দরিদ্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি হচ্ছে তাত্ক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, যেমন দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এখন বাজেটের আগেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। জনগণ স্বল্প এবং মধ্য মেয়াদে বড় ধরনের প্রভাবিত হয় তা দুটি বিষয়ে। একটি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ। আমরা এ দুই জায়গায়ই দেখছি বেশ কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। মধ্যবিত্তদের মধ্যে এখন শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। গ্র্যাজুয়েটদের বেশির ভাগ সেভাবে কাজ পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বাজেট কোনো ধরনের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে কি না সেটা বড় প্রশ্ন।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করলে যে সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো প্রয়োজন, পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরো বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা যদি বৃহত্তর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই, সে ক্ষেত্রে এবারের বাজেটে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে প্রান্তিক সেক্টরে। আসলে নির্বাচনের আগে সরকার বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন করতে চায়নি। তারা স্ট্যাটাস রক্ষা করতে চেয়েছে এবং সেটা পেরেছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, নির্বাচনের আগের ছয় মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। এই ব্যয়ের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ওপর চাপ পড়বে।

তিনি বলেন, আমাদের অনেক আশা ছিল ব্যাংকিং খাতের সংকট সমাধানের জন্য অর্থমন্ত্রী একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং কমিশনের কথা বলবেন। কিন্তু তিনি পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে দিয়েছেন। কিন্তু কেন? সংকটটা তো এরই মধ্যে বাজেটে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। অনেক সাধারণ মানুষ বিনিয়োগকারী ব্যাংকিং খাত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক বেশি হারে সুদে ঋণ নিচ্ছে বা নিতে হচ্ছে অথবা ঋণে প্রাপ্তি নেই। এ অবস্থায় শুধু ব্যাংক মালিকদের জন্য যে ট্যাক্স সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে তাঁদের কাছ থেকে কি ওই বিষয়গুলো আদায় করতে পারছি? তারা সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে, সেবাগুলো দেবে—এসব জায়গায় বেশ কিছু অসংগতি আছে। সেদিক থেকে সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে কিছুটা আশাহত হয়েছি। আমরা আশা করব, সরকার এই কয়েক মাসে অর্থনীতিকে একটি ট্র্যাকের মধ্যে রাখার জন্য চেষ্টা করবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, দেশের ২৫ শতাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত। তারা কোনো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সংগঠিত হয়ে বা ব্যাবসায়িক বিভিন্ন দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য নির্বাচনী বাজেটে সরকার নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের সুবিধা না দিলে কী করতে পারত? ইরান, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনে অর্থনৈতিক ট্রান্সফরমেশনে মধ্যবিত্তরা বিরাট অবদান রাখছে। এটি ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা ছোট ছোট এসএমই লোনের ক্ষেত্রে। সুতরাং ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনে এখন বাজেটে ব্রেকগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। অবশ্য উদ্যোক্তারা টাকার পুনর্বিনিয়োগে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। আমরা যে মডেলটা ফলো করি—অধিকতর বিনিয়োগ, অধিকতর কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে ত্বরান্বিত করা। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিভিন্ন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকদের মানসিকতা হচ্ছে, আমরা উদ্যোক্তাদের হাতে বেশি টাকা দিতে চাই, যাতে উদ্যোক্তারা পুনর্বিনিয়োগ করতে পারে, শিল্প-কারখানা খুলতে পারে, ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে এবং তার ফলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হবে, দারিদ্র্য বিমোচন হবে এবং জাতীয় পুঁজির সম্প্রসারণ ঘটবে।

দ্বিতীয় হচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষার জন্য দরিদ্রদের হাতেও টাকা দিতেই হবে। কিন্তু কত টাকা দেব? সেখানে আমরা বিনিয়োগকে যদি ত্বরান্বিত করতে পারি, প্রাইভেট সেক্টরে যদি টাকা দিতে পারি, তারা আরো কলকারখানা খুলতে পারবে এবং গরিবদের চাকরি হবে। কিন্তু মধ্যবিত্তরা তো ভোক্তা শ্রেণির। অর্থনীতিবিদরা সে জন্য বলছেন, মধ্যবিত্তরা তো বাজেটে কিছুই পেল না। তাদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বৈতনিক মধ্যবিত্তদের জন্য কিছু করা যাচ্ছে না। তাদের ব্যাপারেও ভাবতে হবে।

 

 



মন্তব্য