kalerkantho


পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে ট্রাম্প ও কিমের সিঙ্গাপুর বৈঠক

গাজীউল হাসান খান

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে ট্রাম্প ও কিমের সিঙ্গাপুর বৈঠক

আধিপত্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী ও সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদীরা সম্ভবত খুব কমই তাদের পরাজয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বোধ হয় যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তির ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী এই শক্তিটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার নিজ আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছে। ইন্দোচীন, বিশেষ করে ভিয়েতনামে পরাজয়ের পরও কোনো শিক্ষা নেয়নি এই নয়া সাম্রাজ্যবাদী দেশটি। শুধু এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সরকারই নয়, দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলসভাবে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছে। তাতে বাদ পড়েনি আফ্রিকার কোনো দরিদ্র কিংবা স্বল্পোন্নত দেশও। সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন থাকতে হবে। পুঁজিবাদী স্বার্থে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ও অর্থনীতিকে উচ্ছেদ করার কৌশল সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন নয়। তার জন্য প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও তারা পিছপা হয় না। তাদের স্বার্থপরতার কাছে সামাজিক ন্যায়নিষ্ঠা কিংবা সাম্যের কোনো ভাবধারা কাজ করে না। মস্কোভিত্তিক সোভিয়েত পদ্ধতির শাসনামলে কোনো দেশ তাদের বন্ধু হওয়ার অর্থ ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শত্রুতে পরিণত হওয়া। সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকালে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করা হয়েছিল উত্তর কোরিয়াকে। বাকি অংশ অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তিকালে বিভক্ত কোরিয়ার একত্রীকরণের চেষ্টা চালানো হয়নি।

রাশিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও কর্মরত কিম ইল সুং ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। তাঁরই নেতৃত্বে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দুই অংশের মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই পক্ষকে সাহায্য ও সমর্থন দিলেও তখন বামপন্থী কিম ইল সুং মার্কিন সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আদর্শিক কারণে হাত মেলাতে রাজি হননি। সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়া তখন সামরিক দিক থেকে উত্তর কোরিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৩ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যে সংঘর্ষের অবসান ঘটলেও তখন থেকে এখন পর্যন্ত দুটি দেশেই যুদ্ধাবস্থা জারি রয়েছে। তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, কোরিয়ার যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও দুটি দেশের মধ্যে কখনোই কোনো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তাতে মার্কিন সমর্থন ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান দক্ষিণ কোরিয়া শুধু উত্তর কোরিয়ার নয়, রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধেও অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার শাসকরা মাঝেমধ্যে দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ, বিভক্ত দেশের মানুষের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা মেলামেশা এবং এমনকি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু পক্ষান্তরে উত্তর কোরিয়ার সীমান্তজুড়ে রচনা করেছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ। তাতে উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। শিল্প, বাণিজ্য এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়াকে একত্রীকরণের নামে প্রতিনিয়তই গ্রাস করার প্রবণতা দেখায়। তদুপরি মার্কিন আগ্রাসনবাদী মনোভাব ও হুমকি-ধমকির মুখে অনেকটা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পিয়ংইয়ংয়ের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় পরিচালিত শাসকরা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট দক্ষিণ কোরিয়ার হুমকিতে শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার শাসকরা, বিশেষ করে কিম জং উন ও তাঁর পিতা কিম জং ইল বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ব্যাপারে হন্যে হয়ে ওঠেন। নিজেদের নিরাপত্তার কারণে উত্তর কোরিয়ার তরুণ নেতা কিম জং উন জাপান এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ঘাঁটিতে আঘাত করতে পারে এমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে তৎপর হয়ে উঠলেন। শুধু তা-ই নয়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক অস্ত্র সংযোজন করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং সফলভাবে তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এরই মধ্যে তিনি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণও সফলভাবে ঘটিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে। উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিতে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৯৮ সালে উত্তর কোরিয়া জাপানের ওপর দিয়ে তার প্রথম পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এবং ২০০৬ সালে মাটির গভীর তলদেশে তারা প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারে, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র সংযোজিত তেমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাঁর অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করেননি কিম জং উন। প্রথম প্রথম ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন হুমকি-ধমকি নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন কিম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অত্যন্ত শক্তভাবে ধরলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা বন্ধ করতে হবে উত্তর কোরিয়াকে। তা ছাড়া উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা তৈরিকে ট্রাম্প ও অন্যান্য পশ্চিমা নেতারা বিশ্বশান্তির জন্য এক বিরাট হুমকি বলে মনে করলেন। সে কারণে তাঁরা উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ পশ্চিমা নেতারা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে প্রস্তাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন ও বর্তমান সেক্রেটারি মাইক পম্পেও অত্যন্ত নীরবে কাজ করেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে দুই পক্ষ যখন তৎপর, তখন উত্তর কোরিয়ার বিশেষ দূত কিম ইয়ং চন মাইক পম্পেওর সঙ্গে নিউ ইয়র্কে সাক্ষাৎ করেন ৩১ মে। তাতে ১২ জুন সিঙ্গাপুরে নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সভার ব্যাপারে কোনো কিছুই নিষ্পত্তি হয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আশা করেন না যে দু-একটি বৈঠকে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার বহু দাবিদাওয়া রয়েছে। প্রথমত, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জারীকৃত সব অর্থনৈতিক বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার। তারপর রয়েছে উত্তর কোরিয়ায় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি। কারণ উত্তর কোরিয়ায় বর্তমানে তীব্র খাদ্য ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাপক খাদ্যসামগ্রী ও কৃষিপণ্যের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। তা ছাড়া উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের বিপরীতে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দাবি করেছে। সেসবের প্রেক্ষাপটে কিম যেভাবে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে চান, তাতে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। সে কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১২ জুন সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠেয় দুই নেতার সভা বাতিল করেন। পরে নতুনভাবে কিমের দিক থেকে প্রস্তাব এলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্ধারিত সভায় সিঙ্গাপুর যেতে রাজি হয়েছেন। এ ব্যাপারে উত্তর কোরীয় দূত পরদিন অর্থাৎ ১ জুন হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কিমের একটি পত্র প্রদান করেন। বিগত ২০০০ সালের পর এটিই বোধ হয় উত্তর কোরীয় কোনো দূতের প্রথম হোয়াইট হাউস সফর।

কৃষিপণ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় সহযোগী দেশ হচ্ছে গণচীন। কিম জং উন এরই মধ্যে চীন সফর করে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তা ছাড়া পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে কিম জং উনের সম্প্রতি পিয়ংইয়ংয়ে আলোচনা হয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

অর্থনৈতিক অবরোধ জারির ফলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীন ব্যাংকিং ক্ষেত্রে সব আদান-প্রদান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, অবরোধ সত্ত্বেও কিম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ তাঁর নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন। রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে উত্তর কোরিয়া ঘাস খেয়ে হলেও তার পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। সেটি শেষ পর্যন্ত করে দেখিয়েছেন তরুণ উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। উত্তর কোরিয়া একটি দরিদ্র দেশ। তা ছাড়া তাদের রয়েছে চরম খাদ্য সংকট। তবু তাঁর দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কিম একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল পরমাণু কর্মসূচি সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। যার ফলে এখন বিশাল সাম্রাজ্যবাদী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কিমের সঙ্গে একটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করাতে হন্যে হয়ে উঠেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকের সিদ্ধান্তকে একটি সাহসী ও পরিপক্ব সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের ক্ষেত্রে সব অবাঞ্ছিত উত্তেজনা হ্রাসে দুই নেতার সিঙ্গাপুর বৈঠক ফলপ্রসূ হোক—সে আশাবাদ অনেকেই ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ঘুরেফিরে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের কথা এসে যায় যখন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ দেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এর আগে স্বাক্ষরিত একটি বহুজাতি পরমাণু চুক্তির বৈধতা নিয়ে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের ক্রীড়নকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সে চুক্তির বিরুদ্ধে সমর্থন আদায়ের জন্য ইসরায়েলের সুবিধাবাদী নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন সফর করেছেন। কিন্তু কোথাও কোনো সমর্থন পাননি। একমাত্র সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কেউ সেই স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে সরে আসতে রাজি হয়নি। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও রাশিয়া মনে করে, ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তিটির আর কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে তাদের কাছে নেই। সেটা থেকেও ইহুদিবাদী দেশ ইসরায়েল ও তাদের সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শিক্ষা হয়েছে বলে মনে হয় না।

উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ জুনে অনুষ্ঠেয় বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করে এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস করা এবং শান্তি নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি অনেকে মনে করেন, দুই কোরিয়ার মধ্যে অবিলম্বে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত, যা এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। উত্তর কোরিয়ায় সিউলের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দেশটির দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। উত্তর কোরিয়ায় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দ্রুত বিনিয়োগ দেশটিতে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। সেগুলো না করে উত্তর কোরিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার আধিপত্য বিস্তার করতে যাওয়ার পরিণাম শুভ হতে পারে না। একত্রীকরণের নামে উত্তর কোরিয়ার শ্রমজীবী মানুষের আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক কাঠামো বা ভিত্তি ভেঙে দেওয়া ঠিক হবে না। তাতে দক্ষিণ কোরীয় পুঁজিবাদী শ্রেণি ও তাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আবার বৈরী মনোভাব তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না। উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এটি একটি গভীর চিন্তার বিষয়। দুই কোরিয়ার একত্রীকরণের প্রশ্ন উঠলেই পিয়ংইয়ংয়ের নেতারা তাই চমকে ওঠেন। সুতরাং একত্রীকরণের প্রশ্নে দুই কোরিয়া অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে অগ্রসর হবে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে। চীন ও রাশিয়া উভয়েই এ অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করার পক্ষে। দক্ষিণ চীন সাগরে জল ঘোলা করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মনোভাব ছিল অনেক আগে থেকেই। দুই কোরিয়ার ক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতি ঘটলে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়েও পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসবে বলে আশা করা যায়। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি। উত্তর কোরিয়ার পরমাণুবিষয়ক সব কর্মসূচির পেছনে তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি এবং বিশেষ করে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভুলে যাওয়া উচিত শীতল যুদ্ধ চলাকালে তার আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের এখন অধিক মনোযোগী হওয়া উচিত বিশ্বশান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে। পক্ষপাতিত্বের পরিবর্তে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিরপেক্ষ ও গঠনশীল ভূমিকা পালন করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্ববাসীর কামনা। নতুবা কোনো অর্থেই যুক্তরাষ্ট্র তার ‘নম্বর ওয়ান’ হওয়ার যোগ্যতা ধরে রাখতে পারবে না।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)

সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

 



মন্তব্য