kalerkantho


একটি পরিবেশদূষণমুক্ত পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা

ধরিত্রী সরকার সবুজ

২২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



একটি পরিবেশদূষণমুক্ত পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা

আজ ২২ এপ্রিল। বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। পরিবেশকে সুস্থ, সুন্দর ও দূষণমুক্ত রাখার প্রত্যয়ে এ দিবসটি আমরা পালন করছি  ৪৮ বছর ধরে। প্রতিটি জন্মদিনে আগামীর জন্য নতুন প্রত্যয়ের কথা চিন্তা করে ইংরেজি ‘বার্থ ডে’-এর সঙ্গে মিলিয়ে দিবসটির নাম রাখা হয়েছিল ‘আর্থ ডে’। মানুষের মধ্যে পরিবেশসচেতনতা সৃষ্টি এবং বিশ্বের পরিবেশকে কিভাবে বাসযোগ্য রাখা যায়, সেটিই এ দিবসের মূল উপজীব্য। ১৯৭০ সালে এ দিবসটি প্রথম উদ্‌যাপন করা হয় এবং বর্তমানে প্রায় প্রতিটি দেশেই দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্লাস্টিকদূষণের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এ বছর বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের মূল থিম বা প্রতিপাদ্যে সবার প্রতি প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিল্পোন্নয়নের ফলে একসময় আমেরিকাসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কালো ধোঁয়ার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। মানুষ বুঝতে শুরু করে যে এই কালো ধোঁয়ার ফলে শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার এবং অন্যান্য দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির বিষয়টিও তখন সামনে চলে আসে। ১৯৬৯ সালে সানফ্রান্সিসকোর শান্তিকর্মী জন ম্যাককোনেল নিরাপদ পরিবেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালনের বিষয়টি সামনে আনেন। ম্যাককোনেল ২১ মার্চ দিবসটি পালনের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের সিনেটর গেলার্ড নেলসন ২২ এপ্রিল দিবসটি পালনের প্রস্তাব করেন এবং সর্বপ্রথম ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল প্রায় ১৫০ বছর শিল্পোন্নয়নের ফলে পরিবেশের ক্ষতির দিকটিকে তুলে ধরতে হাজার হাজার মানুষ একটি সমাবেশে অংশগ্রহণ করে। আর সেটিই বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের সূচনা, বলা চলে পরিবেশ আন্দোলনের সূচনাও এদিনই। আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মানুষ অনেকটাই নির্দয় ব্যবহার করছে প্রকৃতির সঙ্গে। পৃথিবীর ওজোনস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করে এই ওজোনস্তর। শিল্পবর্জ্যের দূষণে নদীগুলো দূষিত হয়ে পড়ছে। বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শিল্প-কারখানার দূষণ থেকে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। এসবই মানুষসহ পৃথিবীর জীবজগতের জন্য হুমকি। কিন্তু মানুষ সচেতন হলে পরিবেশের এ ক্ষতিকে অনেক কমানো যায়। বৃক্ষনিধন কমানো, বৃক্ষরোপণ, বায়ুদূষণ কমানোর জন্য রাস্তায় গাড়ির পরিমাণ কমানো, অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে জ্বালানি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত বা দলগত পর্যায়ে পরিবেশকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

অতিমাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহার আজ বিশ্ববাসীর জন্য বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন প্রায় এমন কোনো দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী নেই, যা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা যায় না। সহজলভ্য ও সুলভ হওয়ায় প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ৩০-৪০ বছর আগেও আমরা মাটির তৈরি বাসন-কোসন, তৈজসপত্র ব্যবহার করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেই স্থান দখল করেছে প্লাস্টিক। কয়েক বছর আগেও ধান-চাল সংরক্ষণে পাটের বস্তার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন সেই স্থান দখল করেছে প্লাস্টিকের বস্তা। পলিথিন ব্যাগ মানুষের হাতে হাতে।

প্লাস্টিক বা পলিথিনের মূল সমস্যা হলো, এটি বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল নয়। এটি পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। ফলে প্লাস্টিক যে নালা বা ড্রেনের মধ্যে পড়ে সেটিকে বন্ধ করে দেয়। নদীর তলদেশে পলিথিন জমা হয়ে গভীরতা কমিয়ে দেয় এবং জলজ প্রাণীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। সাগর-মহাসাগরের পানিকে দূষিত করে সাগরের বিশাল প্রাণিকুলেরও ক্ষতির কারণ হয়। আমরা বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করি। এমনকি চা-কফি খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের কাপ, গ্লাস ব্যবহার করছি, যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সারসহ বেশ কিছু রোগের কারণ হতে পারে প্লাস্টিকের ব্যবহার। পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিকের এই ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবারের বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে। এই ধরিত্রীর পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ অনেক রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন দেশ এ লক্ষ্যে পরিবেশবিষয়ক অনেক আইন তৈরি করেছে এবং সেসব আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশকে সুন্দর রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে অন্যান্য চেষ্টার পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা ও পরিবেশবিষয়ক জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি খুবই জরুরি ও কার্যকর।

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস শুধু দলগতভাবে নয়, প্রত্যেক মানুষকে প্রতিদিন পরিবেশ রক্ষার জন্য কিছুটা ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। প্রত্যেক ব্যক্তি যদি সচেতনভাবে প্লাস্টিকসামগ্রী ব্যবহার করে, তাহলেই সে মাটি এবং পানিদূষণ রোধে ভূমিকা রাখছে। প্লাস্টিকসামগ্রী বা পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে না দিয়ে তা আবার ব্যবহার করা যায় বা রিসাইক্লিং করে নতুন সামগ্রী তৈরি করা যায়। একজন মানুষ পরিবেশসচেতন হলে তিনি সড়ক, পার্ক অথবা যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলবেন না বা পড়ে থাকা দেখলে তা তুলে নিয়ে সঠিক জায়গায় ফেলে দিতে পারেন। আমরা যদি ব্যক্তিপর্যায়ে মানুষকে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করতে পারি, তাহলেই বৃহত্তর পরিমণ্ডলে একসময় বড় পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে। মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মানো দরকার যে তাদের জীবনে প্রতিটি দিনই ধরিত্রী দিবস এবং সে কারণে এই পৃথিবীর যত্ন নেওয়া দরকার প্রতিদিনই।

লেখক : প্রকৌশলী, ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন বিষয়ে মাস্টার্স

 



মন্তব্য