kalerkantho


মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা মেনে নেওয়া যায় না

মো. জাকির হোসেন

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা মেনে নেওয়া যায় না

অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী বলেছে, জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু, তাই সে হামলা করেছে। আরেক শ্রেণির মানুষ জাফর ইকবাল কেন মারা যাননি—এমন নিষ্ঠুর মন্তব্যের পাশাপাশি নানা রকম অশ্লীল মন্তব্য করছে। কেউ কেউ ফেসবুকে মন্তব্য করেছে এটি স্যাম্পল মাত্র, সামনে আরো বড় আঘাতের জন্য তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। আমি ঠিক জানি না, জাফর ইকবাল ইসলামের বিরুদ্ধে কী শত্রুতা করেছেন? ফেসবুক, ইউটিউবে জাফর ইকবাল সম্পর্কে নানা বিষোদ্গার করা হয়েছে। যারা এগুলো শুনে বিশ্বাস করে, তাদের অনেকেই মিডিয়াকে বলতে পারেনি জাফর ইকবাল ইসলামের বিরুদ্ধে কী বলেছেন আর এর ভিত্তি কী? আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কু-ধারণা ও সন্দেহ-সংশয় করা থেকে সর্বদা বিরত থাকবে। কেননা ধারণা ও সন্দেহ হলো সর্বাপেক্ষা বড় মিথ্যা।’ (মিশকাত)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনবে যাচাই না করে তা-ই বর্ণনা করবে।’ (মুসলিম)।  পবিত্র  কোরআনে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ওহে যারা ঈমান এনেছ! অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্দেহ এড়িয়ে চলো। কেননা কোনো কোনো সন্দেহ নিশ্চয়ই পাপজনক।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১২)। কোরআনের অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমান গ্রহণকারীরা! যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখো, এমন যেন না হয় যে না জেনে-শুনেই তোমরা কোনো গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)। যদি ধরেও নিই জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু, তাহলেও কি ইসলামের শত্রুদের এভাবে ছুরিকাঘাত করার কথা ইসলামে বলা আছে?

ইসলামের শত্রুরা রাসুল (সা.)-এর পথে নিয়মিতভাবে কাঁটা বিছাত, তাঁর নামাজ পড়ার সময় ঠাট্টা ও হৈচৈ করত, সিজদার সময় তাঁর পিঠের ওপর জবাই করা পশুর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করত, চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিত, কাফিররা তাদের সন্তান-সন্ততিদের রাসুল (সা.)-কে উত্ত্যক্ত করতে হাতে তালি দেওয়া ও হৈ-হল্লা করে বেড়ানোর জন্য লেলিয়ে দিত এবং কোরআন পড়ার সময় রাসুল (সা.)-কে, কোরআনকে এবং আল্লাহকে গালি দিত। এই সব গালি শুধু যে রাসুল (সা.)-এর অনুপস্থিতিতে দেওয়া হতো তা নয়, বরং সামনাসামনিও গালি দেওয়া হতো, বিদ্রূপ করা হতো। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, ‘ওহে ওহিপ্রাপ্ত হওয়ার দাবিদার, তুমি তো একটা পাগল ছাড়া আর কিছু নও।’ (সুরা আল-হিজর, আয়াত : ৬)। কোরআন পাঠের সময় হৈচৈ করার বিষয়ে কাফিরদের সর্বসম্মত ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে, ‘এই কোরআন তোমরা শুনো না, বরং কোরআন পাঠের সময় হৈচৈ করো, হয়তো এভাবেই তোমরা জয়ী হতে পারবে।’ (সুরা হা-মিম আস-সাজদা, আয়াত : ২৬)

ইসলামবিরোধিতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিল আবু লাহাব ও তার স্ত্রী। আবু লাহাবের স্ত্রী একনাগাড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত নবীজি (সা.)-এর পথে ময়লা-আবর্জনা ও কাঁটা ফেলত। রাসুল (সা.) প্রতিদিন অতি কষ্টে পথ পরিষ্কার করতেন। আবু লাহাবের স্ত্রী রাসুল (সা.)-কে এত উত্ত্যক্ত করেছিল যে তাঁর সান্ত্বনার জন্য আল্লাহতাআলা আলাদাভাবে সুরা লাহাব নাজিল করেন এবং ওই দুর্বৃত্ত দম্পতির ঠিকানা যে জাহান্নামে, তা রাসুল (সা.)-কে অগ্রিম জানিয়ে দেন।

একবার পবিত্র কাবার চত্বরে রাসুল (সা.) নামাজ পড়ছিলেন। এ সময় উকবা ইবনে আবু মুয়িত রাসুল (সা.)-এর গলায় চাদর পেঁচিয়ে এমনভাবে ফাঁস দেয় যে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। এই দুর্বৃত্তই একবার নামাজের সময় তাঁর পিঠের ওপর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করেছিল। একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক দুরাচার রাসুল (সা.)-এর মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। তিনি ওই অবস্থায়ই নীরবে বাড়ি চলে যান। শিশু ফাতেমা (রা.) তাঁর মাথা ধুয়ে দেওয়ার সময় দুঃখে ও ক্ষোভে কাঁদতে থাকেন। তিনি শিশু ফাতেমা (রা.)-কে এই বলে সান্ত্বনা দেন, ‘মাগো, তুমি কেঁদো না। আল্লাহ তোমার পিতাকে রক্ষা করবেন।’ আরেকবার যখন তিনি হারাম শরিফে নামাজ পড়ছিলেন তখন আবু জাহেল ও অন্য কয়েকজন কোরাইশ সরদার তা লক্ষ করল। তখন আবু জাহেলের নির্দেশে উকবা ইবনে আবু মুয়িত গিয়ে নাড়িভুঁড়ি নিয়ে এলো এবং রাসুল (সা.)-এর গায়ে নিক্ষেপ করে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেদিনও শিশু ফাতেমা (রা.) তাঁর গা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেন এবং উকবাকে অভিশাপ দেন।

যখনই রাসুল (সা.) কোনো রাস্তা দিয়ে যেতেন, অমনি কাফিররা বলে উঠত, ইনি নাকি সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ রাসুল করে পাঠিয়েছেন? আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে, ইঙ্গিত করে করে মক্কার কাফিররা বলত, দেখো, আল্লাহ নবী ও রাসুল বানানোর জন্য এই চাল-চুলাহীন লোক ছাড়া আর কাউকে পেলেন না। কী চমৎকার নির্বাচন! অনুরূপভাবে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের দেখিয়ে বলা হতো, এরা নাকি সেই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি, যাদের আল্লাহ আমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে বাছাই করেছেন। এ কথাও বলা হতো, যে আজাবের ভয় দেখিয়ে তুমি নেতা হতে চাইছ, তা নিয়ে আসো না কেন? আমাদের মতো কাফিরদের ওপর তুমি আকাশের একাংশ ভেঙে ফেলো তো দেখি! খোদ আল্লাহর কাছেও দোয়া করত যে এই দাওয়াত সত্য হলে হে আল্লাহ, আমাদের আজাব দিয়ে খতম করে দাও! এ অবস্থা মোকাবেলায় মহান রব রাসুল (সা.)-এর ওপর আয়াত নাজিল করে বলেছেন, ‘ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎ কাজের আদেশ দিন এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৯৯)। ছুরিকাঘাত করার কথা বলা হয়নি কোথাও।

ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে মক্কার যে নরাধমরা সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল তাদের মধ্যে ছিল বনু আসাদ গোত্রের আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব, বনু জুহরা গোত্রের আসওয়াদ বিন আবদু ইয়াগুস, বনু মাখজুমের ওলিদ ইবনুল মুগিরা, বনু সাহমের আস বিন ওয়ায়েল এবং বনু খুজায়া গোত্রের হারিস বিন তালাতিলা। রাসুল (সা.) কিংবা তাঁর কোনো সাহাবি (রা.) যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো সময়ে ইসলামের শত্রু হওয়ার কারণে ছুরিকাঘাত করেছেন কিংবা ইসলামের শত্রুদের ওপর আক্রমণ করেছেন—এমন ঘটনা জানা যায়নি।

আল্লাহর রাসুল (সা.) কি ইসলামের শত্রুদের পরিবর্তনে জোরজবরদস্তি, নেতিবাচক, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং যদি তোমার প্রভু ইচ্ছা করতেন, তাহলে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী সব মানুষকেই একসঙ্গে বিশ্বাসী বানিয়ে ফেলতে পারতেন। সুতরাং (হে মুহাম্মদ) আপনি কি তাহলে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য লোকদের জবরদস্তি করতে চান?’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৯৯)। রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের (অনুসারীদের) আত্মঘাতী হওয়ার, চোরাগোপ্তা হামলার শিক্ষা দিয়েছিলেন—না সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন? হামলাকারী আপনারা তাহলে কার অনুসরণ করছেন? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনো শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, ‘হে নবী, লোকদের বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও অসীম দয়াবান। তাদের বলুন আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য প্রকাশ করো। এরপর বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ৩১-৩২)। কোরআনের অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। অবশ্য তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের ও পরকালীন মুক্তির ব্যাপারে আশা রাখে এবং যারা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে, উত্তমরূপে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন সবচেয়ে উত্তম পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা ওই ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভালো জানেন তাদের, যারা সঠিক পথে আছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৫)। শান্তি, দয়া, ক্ষমা ও করুণার ধর্ম ইসলাম কখনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অনুমতি দেয় না। মুসলিম নামধারী এক শ্রেণির মানুষ ইসলামের বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘৃণা ও বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা (রা.) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, “রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত অবস্থায় সূর্য ঢলে পড়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এরপর তিনি লোকজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। বললেন, ‘হে লোকেরা! তোমরা শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষ কামনা করবে না, বরং আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করো। আর যখন শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করবে তখন ধৈর্যের সঙ্গে অবিচল থেকে মোকাবেলা করবে। জেনে রাখো, তরবারির ছায়াতলেই জান্নাত।’” (বুখারি)। এ হাদিস থেকে এটি স্পষ্ট যে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা উচিত নয় এবং শত্রু আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিলে সাহসিকতার সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ, প্রতিহত করতে হবে। এখন যদি বিকৃতভাবে হাদিসের খণ্ডিত অংশ এভাবে উপস্থাপন করা হয় যে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, তরবারির ছায়াতলেই জান্নাত’—তাহলে জান্নাতের লোভ দেখিয়ে তাকে তরবারি ব্যবহার করতে উসকে দেওয়া হলো।

ইসলামের নামে যাঁরা সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় সৃষ্টির অপচেষ্টা করছেন তাঁরা জানেন কি বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়কে কোরআনে হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে? কারো কথায় বিভ্রান্ত হয়ে, যাচাই-বাছাই না করে কিংবা কারো নির্দেশে ইসলামের খেদমত করতে কাউকে ছুরিকাঘাত করেছি, হত্যা করেছি—এমন কোনো ওজর শেষ বিচারের দিন গ্রহণ করা হবে না বলে কোরআনে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কাজেই সময় থাকতে বিভ্রান্তি ছেড়ে কোরআন-হাদিসের পথ অনুসরণ করুন, সব সন্ত্রাসী কাজ বর্জন করুন। ভ্রান্তির কবলে ইসলামের শান্তিকে বিসর্জন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহির জ্ঞান ছাড়া নিজের ধারণা, মতামত, সমাজের প্রচলন ইত্যাদির ওপর নির্ভরতা, মানুষের বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ বলে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো এবং আমাকে ছাড়া অন্য অভিভাবককে অনুসরণ কোরো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩)।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com



মন্তব্য