kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

প্রাণের ভয়ে কুফরিমূলক বাক্য উচ্চারণের বিধান

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রাণের ভয়ে কুফরিমূলক বাক্য উচ্চারণের বিধান

১০৬. কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে ও কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আল্লাহর আজাব পতিত হবে। আর তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে ওই ব্যক্তির জন্য নয়, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছে; কিন্তু তার অন্তর ঈমানে অবিচল। [সুরা : নাহল, আয়াত : ১০৬ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : জীবনসংগ্রামের অনিবার্য বাস্তবতায় মুসলমানদের কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে কাফিরদের পাহাড়সম নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে ইসলামবিরোধী কিছু কথা মুখে প্রকাশ করতে হয়। অথচ তাদের অন্তর ঈমানে অবিচল। এমন লোকদের প্রসঙ্গে আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তাফসিরবিদ ইবনে আবি হাতেম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ইচ্ছা করেন তখন মক্কার মুশরিকরা বেলাল, খাব্বাব ও আম্মার বিন ইয়াসের (রা.)-কে গ্রেপ্তার করে। বিপদ থেকে বাঁচতে আম্মার (রা.)-এর মুখ থেকে এমন কিছু কথা বের হয়ে যায়, যা কাফিরদের মনঃপূত হয়। অতঃপর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন। মহানবী (সা.) তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘ওই সময় তোমার মনের অবস্থা কেমন ছিল? তুমি কি সেটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলে?’ আম্মার (রা.) বলেন, না। এর পরই আলোচ্য আয়াতের এ অংশ নাজিল হয় যে ‘তবে ওই ব্যক্তির জন্য নয়, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছে; কিন্তু তার অন্তর ঈমানে অবিচল।’ (তাফসিরে মুনির : ১৪/৫৬২)

এ আয়াত সামনে রেখে প্রাচীন ও আধুনিক যুগের তাফসিরবিদরা দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, ‘উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে যার ওপর জোরজবরদস্তি করা হয়, প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাফিরদের পক্ষ অবলম্বন করা তার জন্য বৈধ। আবার এমন পরিস্থিতিতে তাদের কথা অমান্য করাও বৈধ। যেমন বেলাল (রা.) এমন করে দেখিয়েছেন।’ (ইবনে কাসির)

মানুষের দৈহিক সক্ষমতা যেমন সবার সমান হয় না, তেমনি ঈমান সবার সমপর্যায়ের হয় না। পরিস্থিতিও সব সময় এক ধরনের থাকে না। আম্মার বিন ইয়াসের (রা.)-এর পরিস্থিতি ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। তাঁর চোখের সামনে তাঁর মাতা ও পিতাকে কঠিন শাস্তি দিয়ে শহীদ করে দেওয়া হয়। তারপর তাঁকে এমন অসহনীয় শাস্তি দেওয়া হয় যে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাফিরদের চাহিদামতো কিছু কথা উচ্চারণ করতে হয়। এরপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনাকে মন্দ ও তাদের উপাস্যকে ভালো না বলা পর্যন্ত তারা আমাকে ছেড়ে দেয়নি।’ তাঁর কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তারা যদি আবার তোমার সঙ্গে এমন আচরণ করে, তাহলে তুমিও আবার এই পন্থা অবলম্বন করবে?’ (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান ও ইবনে কাসির)

এ আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় যে ইসলামে দুর্বল ও সবল ঈমানদারদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিভাষায় এটাকে ‘আজিমত’ ও ‘রখসত’ নামে অভিহিত করা হয়। আজিমত মানে কাজটি করা সর্বোত্তম। আর রখসত মানে কাজটি করার অবকাশ রয়েছে।

ইসলামের প্রায় প্রতিটি বিধানে ‘আজিমত’ ও ‘রখসত’ রয়েছে। এটা রাখা হয়েছে সবল ও দুর্বলদের প্রতি খেয়াল রেখে। ইসলামের চেতনা ও দর্শন না বোঝার কারণে অনেকে এ ধরনের বিধান নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করে। অথচ দুটি পন্থাই গ্রহণ করা বৈধ।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ



মন্তব্য