kalerkantho


আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

জুরানা আজিজ

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

স্বাধীনতার সংজ্ঞা নানাজনের কাছে নানা রকম। আমার কাছে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কিছুটা ভিন্ন। স্বাধীনতার অর্থ কি এই যে শুধুই সমান অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া, বিপ্লবী হওয়া? আমার কাছে নারীস্বাধীনতার অর্থ এই প্রথাগত নারীবাদের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারীর স্বাধীনতার ভিন্ন রূপ আমি অন্তরে লালন করি। এই স্বাধীনতা নারী তার মনের গভীরে পোষণ, ধারণ, লালন ও উপভোগ করতে পারে।

একজন নারী প্রকৃত অর্থে বন্দি। কারণ প্রকৃতি তাকে বন্দিদশা দান করেছে। তার ওপর নির্ভর করে একটি দেশ, জাতি, পরিবারে মায়ের ভূমিকা, এরপর মেয়ের ভূমিকা, পরবর্তী সময়ে স্ত্রী এবং অন্য যেকোনো ভূমিকায় নারীর যে দায়িত্বভার অর্পিত, সেটি নিঃসন্দেহে কঠিনতর।

তবু আমি বিশ্বাস করি, নারী চাইলেই মুক্ত হতে পারে। এই মুক্তির স্বরূপটি নারীকে নিজের ভেতর থেকে খুঁজে নিতে হবে। বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, নারী যখন দৃঢ় মনোবল ধারণ করে তখন তার মনোজগতে অনেক ব্যাপক একটি পরিবর্তন হয়। সেটি হলো, তখন তার নিজের ভেতর আরেকটি শক্তিশালী সত্তা কাজ করে, সত্তাটি তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—তুমি জেগে ওঠো, তুমি পারবে। এই অনুভূতি সম্ভবত একজন নারী তখন আর নারী হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে বোধ করে। বেগম রোকেয়া আজ থেকে বহুদিন আগে যে অন্তর্মুক্তির কথা বলেছিলেন, এই নারীর ভেতর তখন কি সেই মুক্তির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যায় না? নিজের ভেতরের সত্তাটিকে মুক্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নারী সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করে।

বিষয়টির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘A Room of One’s Own’ বইয়ে; যেখানে তিনি নারীর নিজস্বতা উপলব্ধি করার জন্য একটি কক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। এই কক্ষ প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করলে নারীর মনটাই হতে পারে সেই কক্ষ। কক্ষটি হলো একটি Space, যা একজন নারীর নিজেকে চেনার জন্য ভীষণ জরুরি। যখন নারী আলাদাভাবে এই কক্ষে প্রতিনিয়ত বিচরণ করতে শুরু করবে তখন সে হয়তো বুঝতে সক্ষম হবে তার নিজস্বতা, নিজস্ব চাওয়া, ভালো লাগা, মন্দ লাগা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ। অর্থাৎ একজন ‘সত্যিকার মানুষ’ হয়ে ওঠার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তখন নারী সেগুলো পুরোপুরি নিজের মধ্যে ধারণ করতে শুরু করবে। তখন কি নারীর মুক্তির ও স্বাধীনতার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যাবে না?

আমাদের নারীরা স্বাধীনতার যে অধিকার অন্যের হাতে দান করে এবং বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষকে প্রতিপক্ষ ভেবে নারীস্বাধীনতার সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করে, আমার মনে হয়েছে সেটি ঠিক নয়। সত্যিকার স্বাধীনতা তো মানুষ নিজেকেই নিজে দিতে পারে; যখন সে জীবনের নানা উপকরণ থেকে সুশিক্ষা অর্জন করে। তাই আমাদের নারীদের সত্যিকার সুশিক্ষা অর্জন করতে হবে।

তাই নারী দিবস শুধু ৮ মার্চ নয়, বছরের প্রতিটি দিনই হতে পারে। একেকটি দিন নারী যখন একেকভাবে নিজের শক্তিগুলো সম্পর্কে জানবে, তার আত্মা ততই মুক্তি লাভ করবে।

কারণ তখন কেউ তাকে যতই বন্দি ও পরাধীন করুক না কেন, সে নিজেকে মুক্ত করার চমৎকার নিয়মটি জেনে যাবে।

একবার একজন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে সবেমাত্র বিয়ে করেছে। বিয়ের পর তার জীবনে নেমে এলো বাধা—পড়াশোনা করা যাবে না, ক্লাস করা যাবে না। একসময় মেয়েটিকে ভুলে গেলাম। হঠাৎ একদিন সে হাজির। পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে এবং যথারীতি সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই পরাধীনতার ভেতর এত চমৎকার ফল কিভাবে করলে? উত্তরে সে বলল, ‘ম্যাডাম, রোজ রাতে সব কাজ শেষ করে আমি পড়তে বসতাম আর ভাবতাম, আমাকে অবশ্যই পারতে হবে। কাজটা প্রথম প্রথম কঠিন। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমি এই লড়াইয়ে একা নই, আমার ভেতর আরেকটি দ্বিতীয় সত্তা—যেটি শক্তিশালী, সেটি আমাকে সাহায্য করছে—তখন আর বিষয়টি কঠিন মনে হলো না।’

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, কতটা শক্তিশালী হয়ে এমনভাবে ভাবতে পারা যায়। এই শক্তিশালী সত্তাটি নারীকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। তাই নারী দিবসে আমি উচ্ছ্বসিত এই কারণে নয় যে আজকে নারীদের স্বাধীনতা উপভোগের একটি আলাদা দিন, বরং আমি উচ্ছ্বসিত এই ভেবে—বছরের অন্য ৩৬৪টি দিনের সঙ্গে মানুষ হিসেবে নিজেকে আলাদাভাবে চেনার আরেকটি দিন পাওয়া গেল। নিজেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আরেকটি দিন।

সব শেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়,

‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

এই আকাশে

আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায়

ঘাসে ঘাসে এই আকাশে’

বিশ্বের সব নারীর প্রতি শ্রদ্ধা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

zurana879@gmail.com


মন্তব্য