kalerkantho


বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এখন বিশ্বসম্পদ

ফজলুল হক খান

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এখন বিশ্বসম্পদ

যুগে যুগে বিশ্বের নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জনা কয়েক মহাপুরুষ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদেরই একজন। তাঁরা অপূর্ব বক্তৃতার দ্বারা মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তাঁদের একটি ভাষণ পাল্টে দিয়েছে একটি দেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত। তাঁদের সেসব বক্তৃতা ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

এসব ভাষণের মধ্যে একটি প্যাট্রিক হেনরির ‘আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।’ ১৭৭৫ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন ভার্জিনিয়া রাজ্যের শাসক প্যাট্রিক হেনরি রিমেন্ডের সেন্ট জন চার্চে উপস্থিত নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষের উদ্দেশে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দেন।

নিগ্রোদের অধিকার আদায়ে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আফ্রিকান মার্কিন মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এই আন্দোলনের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর একটি। তিনি তাঁর ভাষণের একপর্যায়ে বলেছেন, ‘আমি স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। একদিন আলাবামায় ছোট ছোট কৃষ্ণাঙ্গ বালক-বালিকারা শ্বেতাঙ্গ বালক-বালিকাদের হাতে হাত মেলাবে ভাই-বোনের মতো।’

যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। গৃহযুদ্ধকালে তাঁর অবদানের কারণে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় আমেরিকা। ১৮৬৩ সালের ১৮ নভেম্বর গেটিসবার্গে তিনি যে ভাষণ দেন, সেটিই ঐতিহাসিক গেটিসবার্গের ভাষণ নামে খ্যাত। আব্রাহাম লিংকন তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আমরা এখানে যা-ই বলি না কেন, পৃথিবী হয়তো সেটি বেশিদিন স্মরণ রাখবে না। দৃষ্টিও দেবে খুব সামান্য। কিন্তু আমাদের বীর সন্তানদের কার্যকলাপ কখনো স্মৃতির পাতা থেকে বিস্মৃত হবে না; বরং তাদের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। নিজেদের উৎসর্গ করতে হবে প্রতিনিয়ত।’ তাঁর বিখ্যাত উক্তি—‘Government of the people, by the people, for the people’ গেটিসবার্গের ভাষণেরই অংশ।

উইনস্টল চার্চিল সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য ভাষণ দিলেও ১৯৪০ সালের ১৩ মে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া প্রথম ভাষণটি তাঁকে স্মৃতির পাতায় অমর করে রেখেছে। ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে অগ্নিপরীক্ষা, আমাদের মাসের পর মাস যুদ্ধ করতে হবে আর কষ্ট করতে হবে।...যদি প্রশ্ন করো—আমাদের লক্ষ্য কী, তবে শুনে রাখো, একমাত্র বিজয় ছাড়া আমাদের আর কোনো লক্ষ্য নেই।’

হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, আক্রমণ নয়—ত্যাগ আর ভালোবাসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব সংগ্রামের ডাক দিলেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৭ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন বোম্বের গাওলিয়া ট্যাক ময়দানে তিনি ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান, যা ভারত ছাড় বা কুইট ইন্ডিয়া বক্তৃতা নামে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা সর্বগ্রাসী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের এক নাম। তবে ১৯৫৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তৃতাটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর অমর বাণী—‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই।’

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবীর সাড়া-জাগানো ভাষণগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্লেষণ করে পাঠকপ্রিয় মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজউইক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনৈতিক কবি’ উপাধি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো)। ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা বাঙালি জাতির জন্য এক পরম পাওয়া।

সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে ইয়াহিয়া খান বিশ্বজনমত তাদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ দেননি। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে পাল্টে গেল বাংলাদেশের দৃশ্যপট। বাংলাদেশ পরিচালিত হতে লাগল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর থেকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিনের ভাষণ রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার না করায় কোনো বাঙালি রেডিও-টেলিভিশনে যায়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির মুখে পাকিস্তান সরকার পরের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করতে বাধ্য হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল কোর্ট-কাছারি, আদালত-ফৌজদারি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাষণে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশনা দিলেন এভাবে—‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।...প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৭ই মার্চের হাত ধরেই জন্ম নিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, একটি জাতীয় পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত।

লেখক : গীতিকার, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক


মন্তব্য