kalerkantho


অর্থবলের নির্বাচনে পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি পোক্ত হবে কি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অর্থবলের নির্বাচনে পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি পোক্ত হবে কি

নির্বাচনের ফলাফল বেরোতে না বেরোতে ত্রিপুরার সাধারণ মানুষ এক মহাসন্ত্রাসের সম্মুখীন হলো। দিকে দিকে গরিব মানুষের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সিপিআই (এম) তথা অন্য বাম দলগুলোর পার্টি অফিস আক্রান্ত। কিন্তু এখানেই সব কিছু থেমে নেই। গরিব মানুষকে বামপন্থার প্রতি বিশ্বাস রাখার অজুহাতে ধনে-প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে। সন্ত্রাসের এই লাগামছাড়া ব্যবহার মনে করিয়ে দিয়েছে ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গের কথা। সেই সময় তৃণমূল কংগ্রেস এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর ঠিক এভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভৈরব বাহিনী। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সিপিআই (এম)-এর অফিস দখল করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রাণ হারায় অসংখ্য সিপিআই (এম) সমর্থক। পরিস্থিতি দেখে ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেছেন, ‘যারা সরকার পাল্টাল তারা নিশ্চয় এ জিনিস চায়নি। আশা করি, তারা সন্ত্রাস বন্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

বিজেপি আইপিএফটি জোট ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক স্থানীয় বামপন্থী পার্টির অফিসগুলো তো বটেই, এমনকি একটি-দুটি জেলা কমিটির অফিসও দখল করে নিয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রাবারবাগান। সিপাহিজলা জেলা কমিটির অফিসটি দখল করে ভাঙচুর করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাজ্যপাল তথাগত রায়ের সঙ্গে দেখা করে মানিক সরকার পদত্যাগপত্র পেশ করেন। রাজ্যপাল তাঁকে বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান। সেখানে অপেক্ষারত দলীয় কর্মীদের বলেন, সরকারি কর্মী ও দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ছাড়া ২৫ বছর ধরে সরকার টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। এদিকে ভাবী মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন মৃত সিপিআই (এম) প্রার্থী খগেন্দ্র জামাতিয়ার বাড়ি। সেখানে তিনি মানিক সরকারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। একদিকে যখন নেতারা সৌজন্য দেখাচ্ছেন, ঠিক একই সময় বিজেপির সাধারণ কর্মীরা কিন্তু অন্যদিকে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আগরতলা শহরের বুকে কার্ল মার্ক্সের মূর্তি ভাঙচুর করা হয়। দিকে দিকে মার্ক্স-লেনিনের ছবি মাটিতে আছড়ে ফেলা হচ্ছে। সিপিআই (এম)-এর পতাকা নামিয়ে সেখানে বিজেপির পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকদের ইউনিয়ন অফিসগুলো পর্যন্ত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। বিশ্রামগঞ্জে সিপিআই (এম)-এর সিপাহিজলা জেলা কমিটির অফিস দখল হয়ে যায়। মোহনপুরের মহকুমা অফিসে ভাঙচুর করা হয়। জিরানিয়ায় দুটি রাবারবাগানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। শতাধিক লোকের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের নামে অত্যাচার করা হয়েছে। উদয়পুরে সব পার্টি অফিসে হামলা চলে। বিলোনিয়ায় আইপিএফটি ও বিজেপি কর্মীদের যৌথ আক্রমণে প্রতিটি বামপন্থী দলের পার্টি অফিস বেদখল হয়েছে। সিপিআই (এম)-এর মুখপত্র দেশের কথায় যেসব গাড়িতে কাগজ নিয়ে যাওয়া হতো তাদের মালিকদের গাড়ি দিতে বারণ করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় কাগজের বোর্ড উপড়ে ফেলা হয়েছে। জেলা ও মহকুমা সংবাদদাতাদের কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছেন।

এই আবহে আগরতলার আস্তাবল ময়দানে নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করবে। বামপন্থীদের পরাজয়ে উৎফুল্ল বিজেপি নেতৃত্ব দলের শাসনাধীন ১৯টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরই ৮ মার্চের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির করানোর চেষ্টা করছেন। থাকবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। এদিকে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে বিজেপি-আইপিএফটি জোটের মধ্যে বিরাট বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। আরএসএস বলে দিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী হবেন তাদের ক্যাডার বিপ্লব দেব। কিন্তু কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে আসা নেতারা বলে দিয়েছেন, আমরা কংগ্রেসের সব ভোট বিজেপিতে নিয়ে এসেছি। ফলে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার আমরাই। কংগ্রেস ছেড়ে আসা এই নেতাদের শীর্ষ নেতা হিসেবে সুদীপ রায়বর্মণ এরই মধ্যে বিজেপির শীর্ষস্তরে দাবি পেশ করেছেন। অন্যদিকে আইপিএফটি বলেছে, উপজাতি অধ্যুষিত ২০টি আসনের মধ্যে ১৯টিই জোটের দখলে এসেছে। তাই উপজাতিদের মধ্য থেকেই একজনকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে হবে। এই বিতর্কের জের কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা বোঝা দুষ্কর।

এদিকে নির্বাচন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, নির্বাচনের সময় বিজেপি অভাবনীয় অর্থবল দেখিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের বড় অংশকে তারা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে। অসত্য ও বিকৃত বক্তব্য তুলে ধরে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বামরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়েছে। ত্রিপুরার লড়াই এই পরাজয়ে বন্ধ হয়ে যাবে না। লড়াই চলতেই থাকবে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ফল দেখে মনে হচ্ছে ত্রিপুরায় অ-বাম ভোটের বেশির ভাগ অংশই বিজেপি নিজেদের দিকে জড়ো করতে পেরেছে। বামরা ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বামদের ভোটের একটা অংশও বিজেপি-আইপিএফটি জোটের দিকে চলে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ত্রিপুরায় দীর্ঘ সময় বিরোধী আসনে থাকা কংগ্রেস যখন ভাঙতে শুরু করেছে তখন থেকেই ওই রাজ্যে বিজেপির উত্থান। বামবিরোধীদের বেশির ভাগই প্রথমে তৃণমূলে ভিড়লেও পরে গেরুয়া পতাকাই তুলে নেন সুদীপ রায়বর্মণরা। তখন থেকেই সিপিআই (এম)-এর মাথাব্যথার কারণ বিজেপি। তৃণমূল স্তরে সংঘ পরিবার এবং সর্বস্তরের প্রচারে কোনো রকম খামতি রাখেননি অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদিরা। শুরু থেকেই ত্রিপুরা নিয়ে বিজেপির উদ্যোগ অন্য রকম ছিল। উত্তর-পূর্বের বাকি রাজ্যগুলোর জন্য এতটা আগ্রাসী ছিল না বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ফলে জাতীয় রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে দুটি লোকসভা আসনের ত্রিপুরা।

মেঘালয়ে বিজেপি জেতেনি। তবু তারা সরকার তৈরির জন্য দেদার টাকা খরচ করছে। শেষ পর্যন্ত প্রয়াস সফল হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। নাগাল্যান্ডেও সেই একই অবস্থা। কয়েক শ কোটি টাকা খরচ করে সেখানে এনপিপি নেতা কনরাড সাংমার নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি।

এক বছর আগে মণিপুরে যে কায়দায় সরকার গঠন করা হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় মেঘালয়ে ঘোড়া কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। অসমে এই খেলায় দক্ষ বিজেপি সেনাপতি হিমন্ত বিশ্বশর্মা এরই মধ্যে শিলং পৌঁছে নানা ধরনের খেল দেখাচ্ছেন। কংগ্রেস এই রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও একক বৃহত্তম দল হিসেবে ২১টি আসন জয় করেছে। অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছে মাত্র দুটি আসন। ৪২টি আসনে বিজেপির জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে মেঘালয়বাসী বিজেপিকে কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে তারা সাতজন কংগ্রেসি মন্ত্রীকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছিল। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। অন্যদিকে এনপিপি গোড়ায় বিজেপির সঙ্গ ছাড়লেও পরে এককভাবে লড়াই করে। তারা কিন্তু ১৯টি আসন পেয়েছে। ফলাফল ঘোষণার দিন কংগ্রেসের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হওয়ায় শিলংয়ে ছুটে আসেন দলের শীর্ষ নেতা গুলাম নবি আজাদ, কপিল সিব্বলরা। নির্দলদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পাল্টা আগরতলা থেকে বিমান ভাড়া করে শিলংয়ে পৌঁছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। শুরু হয়ে যায় ঘোড়া কেনাবেচা। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে হাত মেলায় এনপিপি, ইউডিপি, এইচএসডিপি ও বিজেপি। মোট ২৭ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানান এনপিপির প্রধান কনরাড সাংমা।

অন্যদিকে নাগাল্যান্ডে আঞ্চলিক দল এনডিপিপিকে সঙ্গে নিয়েও গরিষ্ঠতা ছুঁতে পারেনি বিজেপি। দুই দল মিলে ২৯টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে শাসকদল এনপিএফ এককভাবে ২৯টি আসন পেয়েছে। কিন্তু বিজেপি দুজন নির্দলকে মোটা টাকার টোপ দিয়ে সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়েছে। সেই কারণে এনডিপিপি নেতা নেফিউ রিও সরকার গঠনের দাবি পেশ করেছেন। আগামী ১০ মার্চ নাগা শান্তিচুক্তি পেশ হবে বলেও জানানো হয়েছে।

দুই রাজ্যে বিজেপি সরকারে থাকতে পারলেও তাদের নিজস্ব শক্তি খুবই কম। অন্যরাই সেখানে গরিষ্ঠ। তা ছাড়া মানুষের সমর্থনও তাদের দিকে নেই। কিন্তু কিছুসংখ্যক জনপ্রতিনিধির বিশ্বাসঘাতকতার দৌলতে তারা সরকার গড়তে সমর্থ হয়েছে।

লেখক : কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক



মন্তব্য