kalerkantho


কোটার সংস্কার প্রয়োজন

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কোটার সংস্কার প্রয়োজন

‘কোটা’ বিতর্কটি বেশ পুরনো। তবে এখনো সমানে প্রাসঙ্গিক ও অমীমাংসিত। এই কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা কতবার যে রাস্তায় নামল! ২০১৩ সালে তো একেবারে উত্তাল আন্দোলন! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্মঘট পর্যন্ত হলো। তার পরও বিষয়টির সুরাহা নেই। হাইকোর্টে মামলাও হলো। তারও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নেই। সম্প্রতি ছাত্র-ছাত্রীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আবারও কোমর বেঁধে রাস্তায় নেমেছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হলো। এতে দাবি পূরণে সরকারকে ৩ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হলো। না হলে আবারও দুর্বার আন্দোলনের হুমকি। প্রশ্ন হলো, আন্দোলনকারীদের এই দাবি কতটা সংগত? কারণ কোটার কথা তো দেশের সর্বোচ্চ আইন, সংবিধানেই আছে। সেখানে অনগ্রসর সমাজের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। তাহলে এই আন্দোলন কেন? উত্তর খোঁজা যাক।

এটা ঠিক, সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ সরকারি চাকরিতে সবার সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা বা কোনোরূপ বৈষম্য প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ২৯(৩) অনুচ্ছেদ মতে, তিনটি ক্ষেত্রে সমতার এই সাধারণ নিয়ম লঙ্ঘন করা যাবে। সেগুলো হলো—

১. অনগ্রসর নাগরিকদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা যাবে [অনু-২৯(৩)(ক)]।

২. ধর্মীয় বা উপসম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে শুধু ওই ধর্ম বা সম্প্রদায়ের লোক নিয়োগ করা যাবে। যেমন ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনে’ শুধু মুসলিম কিংবা ‘হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টে’ শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোক নিয়োগ বৈধ।

৩. যে কাজ বিশেষভাবে নারীর জন্য কিংবা পুরুষের জন্য উপযুক্ত, ওই কাজে যথাক্রমে শুধু নারী বা পুরুষ নিয়োগ করা যাবে। যেমন নার্সিংয়ের কাজে মহিলা অগ্রাধিকার পাবে। 

শেষের দুই ব্যতিক্রম নিয়ে খুব একটা জটিলতা নেই। যত সমস্যা ওই প্রথমটি তথা ‘নাগরিকদের অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান’ সংবলিত ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদ নিয়ে। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটার সাংবিধানিক ভিতও এই অনুচ্ছেদ। ওই আলোকে প্রচলিত ‘কোটা’ সিস্টেমটি ব্যাখ্যা করছি।

প্রথমত, সংবিধানের কোথাও ‘অনগ্রসর অংশ’ (Backward section)-এর সংজ্ঞা  বা ব্যাখ্যা নেই।  সাধারণ বিবেক-বুদ্ধিতে প্রতিবন্ধীদের (১ শতাংশ কোটা) ‘অনগ্রসর অংশ’ বলা যায়। কিন্তু দেশি-বিদেশি সরকারি-বেসরকারি বিচিত্র সাহায্যপুষ্ট ও সুবিধাভোগী উপজাতিদের (৫ শতাংশ কোটা) সবাইকে কি ‘অনগ্রসর’ বলা যায়? মুক্তিযোদ্ধা বা তাঁদের পোষ্য (৩০ শতাংশ কোটা) মাত্রই কি ‘অনগ্রসর অংশ’? প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার পদসহ দেশের শাসন, বিচার ও আইন বিভাগসহ জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে বিপুল বিক্রমে কর্মরত এবং জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধাসহ ডিগ্রি পর্যন্ত উপবৃত্তিভোগী একুশ শতকের দুরন্ত, দুর্বার, আধুনিক নারীর (১০ শতাংশ কোটা) মাথায়ও কি অনগ্রসর অংশের মুকুট? একই যুক্তিতে অনেক পুরুষও তো ‘অনগ্রসর’ বিবেচনায় কোটার দাবিদার! তা ছাড়া ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নকালে যাঁদের ‘অনগ্রসর’ ভাবা হয়েছিল, ৪৬ বছর পরও তাঁদের ‘অনগ্রসর’ ভাবার যৌক্তিকতা কতটুকু?

দ্বিতীয়ত, অনগ্রসর নাগরিকদের জন্য বিশেষ বিধানসহ ২৯(৩) অনুচ্ছেদের বিধানগুলো সাধারণ নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। সমতার বিধান [২৯(১)] ও বৈষম্যহীনতার নীতিই [২৯(২)] সাধারণ নিয়ম। অথচ বিসিএসে ৫৬  শতাংশ কোটার ফাঁকে ৪৪ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগ যেন ঠিক তার উল্টো।

তৃতীয়ত, ওই ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে অসংজ্ঞায়িত অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের এখতিয়ার দিয়েছে। কিন্তু তা বাধ্যতামূলক নয়, ইচ্ছামূলক এখতিয়ার। যার অর্থ দাঁড়ায়, অনগ্রসর নাগরিকদের ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব’ লাভের সুযোগ দিতে রাষ্ট্র প্রয়োজনে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে; আবার না করলেও সমস্যা নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, ইচ্ছামূলক ‘বিশেষ বিধান’টিকে  চূড়ান্ত বাধ্যতামূলক বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কোটার পদগুলো এখানে ‘অগ্রাধিকার’ ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। বরং এগুলোকে আগলে রাখা হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের জন্য। এতে জনপ্রশাসন দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। বেকারত্বের উদ্ধারহীন যন্ত্রণায় মেধাবীতর ছাত্র-ছাত্রীরা অহর্নিশ খাবি খাচ্ছে। উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় কোটার পদগুলো বছরের পর বছর খালি যাচ্ছে। এর পরও অপেক্ষাকৃত যোগ্য ও মেধাবীরা সেখানে যেন অচ্ছুত!

চতুর্থত, ওই অনুচ্ছেদে ‘বিশেষ বিধান’ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব’ লাভের সুযোগদান। সংবিধানে ‘পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব’ শব্দের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা নেই। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, এটি নির্ণয়ে ‘আকার’ আর গুণগত মানের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে (এআইআর ১৯৬২ সুপ্রিম কোর্ট ৩৬) । অর্থাৎ কোটার পরিমাণ নির্ধারণে অনগ্রসর নাগরিকদের সংখ্যা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আকার ও গুণগত মান ইত্যাদি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। আর আমাদের দেশে কোটার অনুপাতগুলো সম্পূর্ণ বাছবিচারহীন ও মনগড়া। এ বিবেচনায় জেলা কোটা, নারী কোটাসহ প্রচলিত কোটার পরিমাণ কি পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে না?

পঞ্চমত, ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সব নাগরিককে সমান ঘোষণা করেছে। ২৯(৩) অনুচ্ছেদ, ২৭ অনুচ্ছেদের সর্বজনীন সমতার বিধানকে বাতিল করেনি। তাই ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে সমান সুযোগ লাভের অধিকার’ ২৯(৩) অনুচ্ছেদবলে বারিত হলেও ২৭ অনুচ্ছেদবলে তা পাওয়ার সুযোগ আছে। তা ছাড়া ২৯(৩) অনুচ্ছেদের ‘বিশেষ বিধান’ও ২৭ অনুচ্ছেদের সমতা বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ প্রসঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, ‘২৯(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আসন সংরক্ষণ কোনোভাবে এমনতর স্বেচ্ছাচারী ও অযৌক্তিক হবে না, যাতে ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার বিধান লঙ্ঘিত হয়’ (এআইআর ১৯৯৩ সুপ্রিম কোর্ট ৪৭৭)।

প্রচলিত কোটার আইনগত বৈধতা নির্ণয়ে সংবিধানের আরো কিছু অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক। যেমন সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট থাকিবেন।’

২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “(১) কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেকে কর্মানুযায়ী’—এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন। (২) রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক—সব ধরনের শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।”             

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৫০ শতাংশের বেশি কোটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। তা ছাড়া পৃথিবীর খুব কম দেশ আছে, যেখানে মেধার চেয়ে কোটার জোর বেশি। তাই আশা করি, সরকারের সুমতি হবে। কোটার বুটে থেঁতলে পিষ্ট মেধাবী জীবনগুলোকে উদ্ধারে তারা উদ্যোগী হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাশা, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের মতো আমাদের উচ্চ আদালতও কোটার অসামঞ্জস্যতা বিষয়ে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয়, সুস্পষ্ট, যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেবেন।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib2@gmail.com

 



মন্তব্য