kalerkantho


কূটনীতিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের বৈঠক হতেই পারে

এ কে এম আতিকুর রহমান

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কূটনীতিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের বৈঠক হতেই পারে

একজন রাজনীতিবিদ যতই কূটনৈতিক রীতিনীতি আর কৌশল রপ্ত করতে সক্ষম হবেন রাজনীতিতে তাঁর ততটাই সফল হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ কূটনীতি ছাড়া রাজনীতি পরিপূর্ণ হয় না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রতিটি ধাপেই কূটনীতির আশ্রয়ে ওপরে উঠতে হয়। অনেক সময় অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা রাজনৈতিক ক্যুর ছায়াবরণে ওপরে উঠতে পারা গেলেও যেকোনো মুহূর্তে ধপাস করে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। অপরাজনীতি বা বিশ্বাসহীনতার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায় তাকে অর্জন বলে না, কূটনীতি বলে না। রাজনীতিতে অহরহ এই দুটি অবস্থার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন পৃথিবীর অনেক দেশেরই রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক—সব দেশেই এ পরিস্থিতি কমবেশি বিরাজমান।

নানা কারণেই রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। একজন রাজনীতিবিদ যেমন তাঁর রাজনৈতিক গণ্ডিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তারিত করে থাকেন; কূটনীতিবিদও তেমনি অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বার্থকে সংযোজিত করার কাজটি করে থাকেন। দুজনের কর্মের উদ্দেশ্য ও দায়বদ্ধতা এক হলেও কর্ম পদ্ধতি ও বিচরণক্ষেত্র ভিন্ন। তাই দুজনের মধ্যে সংযোগ থাকাটা দুই পক্ষের কল্যাণের জন্য আবশ্যক, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। এর ব্যতিক্রম কখনো ভালো দেখায় না বা ভালো ফল বহন করে না।

দুটি দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতিতেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে। সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে সম্পর্ককে জোরালো করার উদ্দেশ্যেই কূটনৈতিক সম্পর্কের বাঁধন ঘটে। শুধু দুটি দেশের মধ্যেই নয়, এ সম্পর্ক স্থাপিত হয় দুই দেশের মানুষের মধ্যে। পারস্পরিক উন্নতি ও স্বার্থ রক্ষার জন্যই দুই দেশের মধ্যে এ কূটনৈতিক বন্ধনের অঙ্গীকার করেন দুই দেশের নেতৃত্বে থাকা রাজনীতিবিদরা। এ সম্পর্ক এতটাই স্পর্শকাতর যে কারো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বা সম্মানে আঘাত লাগে এমন কোনো বিষয়ে নাক গলানো যাবে না। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচিত। তবে এসবই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের বিশ্বরাজনৈতিক অঙ্গনে অবস্থানের ওপর।

পৃথিবীর সব দেশেই রাজনৈতিক দল অর্থাৎ রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদের মধ্যে সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকাটাকে স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হয়। বরং না থাকাটাই অস্বাভাবিক। আমাদের দেশেও সে রকমটি থাকার কথা। কিন্তু মাঝেমধ্যে আমরা কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলি। আমাদের উচিত, অনুচিত বা আত্মসম্মানবোধ ভুল করে ভুল পথে চলে যায়। হয়তো সংবিৎ ফিরে আসে। কিন্তু ততক্ষণে দেশের অনেকটা ক্ষতি হয়ে যায়। নিজের পায়ে নিজেরাই কুঠার মারি। সেই ক্ষত সারাতে আর পারি না।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থসংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় আদালত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড প্রদান করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য প্রগ্রাম ছাড়াও বিএনপি গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, ওই বৈঠকে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতসহ সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, তুরস্ক, জাপান, পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৫ জনের মতো কূটনীতিক অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কারাদণ্ড ও এ বিষয়ক ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, অন্যান্য মামলা, আসন্ন নির্বাচন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের পরিকল্পনা ইত্যাদি সম্পর্কে কূটনীতিকদের ব্রিফ করা হয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকরা শুনেছেন, বুঝে নিয়েছেন এবং তাঁদের করণীয়টা অবশ্যই করে থাকবেন। তবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার কাহিনিটা কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং উপস্থিত কূটনীতিকরা কিভাবে সেই কাহিনিকে গ্রহণ করেছেন, সে বিষয়ে তাঁরাই বলতে পারবেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। বিদেশি কূটনীতিকদের কাছ থেকে দুর্নীতিকে সমর্থন করার ব্যাপারে বিএনপি কি আশাবাদী? জানি না, দু-একটি দেশ দিতেও পারে।

একজন রাজনৈতিক নেতা, সাবেক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান যদি রাজনৈতিক কারণে এ ধরনের ঘটনার শিকার হন, সেটি এক কথা। আর তা যদি ঘটে অর্থনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগে, সেটি অন্য কথা। রাজনৈতিক কারণে এ ধরনের ঘটনায় সরকার মুখ্য ভূমিকায় থাকে অর্থাৎ সরকার বিরোধী দলকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে এসব করে থাকে। কিন্তু দুর্নীতি অর্থাৎ আর্থিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে সরকার জোর করে তার পুলিশ বাহিনী দিয়ে ধরে জেলে পুরে দেয় না। এ ক্ষেত্রে আদালত যথাযথ প্রমাণাদি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ সাপেক্ষে দণ্ড দিয়ে থাকেন। প্রথমটির ক্ষেত্রে কখনো কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারি দল করে থাকে বিরোধী শক্তিকে দমন করার জন্য। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থে এ কর্মটি হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের এখতিয়ার। স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রত্যেক মানুষই এ কথা জানেন।

পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের আর্থিক দুর্নীতির কারণে জেলে যেতে হয়েছে। এইতো দুই দিন আগে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হলো। এমনকি বাংলাদেশেও এ রকম ঘটনা ঘটেছে। পরিচিত স্বৈরাচারী শাসক বলে খ্যাত রাষ্ট্রপতি এরশাদকেও জেলের ঘানি টানতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে জোর করে জেলে ঢোকানো হলে সে ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের সব মানুষই তার প্রতিবাদ করার অধিকার রাখে। কিন্তু আর্থিক বা নৈতিক দুর্নীতির কারণে আদালত যদি কাউকে দণ্ড দেন, তার প্রতিবাদ করার উপায় নেই। আর তা যদি কেউ করে, তাহলে সেটি শুধু আদালত অবমাননা করাই হবে না; সেটি হবে দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেওয়া, উৎসাহিত করা। দলের লোকজন হয়তো এ কাজ করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিবিদরা কেন, পৃথিবীর কোনো দেশের নেতা বা সাধারণ মানুষও এ বিষয়টি সমর্থন করবে না। আইনকে আইনের পথে চলতে দেওয়াই শ্রেয়। আর বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক—এটি আমরাও যেমন চাই, সারা বিশ্বের মানুষও চায়।

এদিকে সরকারও এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। বিএনপি নিয়েছে, সরকার তো নিতেই পারে। কিন্তু আমার একটা কথা আছে। নিজেদের ভেতরের মানসম্মান নিয়ে বাইরের মানুষকে ঢাকঢোল পিটিয়ে না জানানোই বোধ হয় ভালো। তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারপারসনই নন, তিনি বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বিদেশিদের কাছে এ কাহিনি বলে দেশের জন্য আর লজ্জা বয়ে আনবেন না। এ লজ্জা থেকে উভয় পক্ষ যেন আমাদের রক্ষা করে বিনয়ের সঙ্গে এ প্রার্থনা করি। একজন অধম বলে অন্যজন কেন উত্তম হবে না?

কূটনীতিকদের জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকারের, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের ব্রিফিং দেওয়া একটি চলমান ঘটনা। নানা উপলক্ষেই সরকার বা রাজনৈতিক দল কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। প্রক্রিয়াটি অবশ্যই অব্যাহত থাকতে হবে। আর এ সব কিছুই হবে বাংলাদেশের সম্মান, ঐতিহ্য ও সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণ্ন রেখে। আমাদের একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কারো দয়ায় সৃষ্টি হয়নি। তাই অন্যের দয়াভিক্ষা চাওয়ার প্রবণতা ত্যাগ করাই উত্তম ও বুদ্ধিমানের লক্ষণ। কারণ এতে পরিশেষে অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


মন্তব্য