kalerkantho


সব বিচার যদি এমন হতো!

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সব বিচার যদি এমন হতো!

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। এমনকি অসম্ভবও সম্ভব হয়। এই পুরনো সত্যটাই দেশের পুলিশ ও বিচার প্রশাসন সম্প্রতি নতুন করে প্রমাণ করল।  যে দেশে ছয় বছরেও খুনিদের সাজা দূরে থাক, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনই জমা পড়ে না, খুনের কূল-কিনারা হয় না (সাগর-রুনি হত্যা); যেখানে দুই বছরেও হত্যাকারীদের টিকির খোঁজ মেলে না (তনু হত্যা), কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে বিচারপ্রার্থীর জোড়া জোড়া জুতা ক্ষয়ে যায়; সে দেশে যখন ১৪ কর্মদিবসে ২৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণসহ গোটা খুনের মামলা শেষ হয়, ঘটনার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় রায় হয়, তাতে আবার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজাও হয়—বিষয়টিকে তখন কি একটু অবিশ্বাস্য মনে হয় না? কল্পনাকে হার মানানো এমন ঘটনাকে ‘ইচ্ছাশক্তি’র ম্যাজিক ছাড়া আর কী-ইবা বলা যায়?

হ্যাঁ, চাঞ্চল্যকর রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দেশবাসী সম্প্রতি পুলিশ ও বিচার প্রশাসনের এমন ম্যাজিকই দেখল। যার জন্মদাতা টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক আবুল মনসুর মিয়া ও স্থানীয় পুলিশ। এ মামলায়  বিচারক মাত্র দুই সপ্তাহের কর্মদিবসে বিচার শেষ করে চারজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশে রূপার ঘটনাই প্রথম। এমন স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার এমন আশ্চর্য দ্রুততায় বিচার ও রায়; শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা ভারত উপমহাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে দ্রুত ও ন্যায়বিচারের গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এমন নজির সম্ভবত বিশ্বের অন্য দেশেও নেই।

শুধু বিচারিক নয়, এ রায় ও বিচার প্রক্রিয়ার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। গোটা সমাজব্যবস্থার জন্য এ রায়ে রয়েছে অসংখ্য বার্তা। যেমন—১. এ রায় প্রমাণ করল, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা যতটা না বিচারিক, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি মনস্তাত্ত্বিক। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে স্বল্পতম সময়েও সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার সম্ভব; ২.  এ রায়ে দেশে আইনের শাসনের নিভু নিভু বাতিটা আবার জ্বলতে শুরু করল; ৩. এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির’ রাজত্ব। নারী উত্ত্যক্ততা, যৌনপীড়ন, নারী সহিংসতার ক্ষেত্রে এ সংস্কৃতির প্রতাপ আরো দুর্দণ্ড। তার বিপরীতে এ রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া, নিঃসন্দেহে আমাদের বিচার বিভাগের প্রতি মানুষকে আবার ইতিবাচক ও আস্থাশীল করে তুলবে। নিঃসন্দেহে বিচারহীনতার কলঙ্কের তিলক মুছতে ভূমিকা রাখবে; ৪. পরিবারের কিশোরী-যুবতী মেয়েকে নিয়ে অভিভাবকরা বরাবরই চিন্তিত। এবং সেটা সংগত। রূপার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমসহ গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছে; যেভাবে খুনিদের সাজার দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, আন্দোলন করেছে, তাতে কিশোরী-যুবতী মেয়েরা মুক্তমন ও স্বাধীন চলাফেরায় আগের চেয়ে সাহসী হবে, যেকোনো নিগ্রহ ও অত্যাচারে প্রতিবাদমুখর ও প্রতিরোধ গড়তে উৎসাহী হবে। অভিভাবকদের শঙ্কা ও আতঙ্ক কমবে। তারা এই ভেবে স্বস্তি পাবে যে তার পরও যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়, তবে দুষ্কৃতকারীরা পার পাবে না এবং ৫. রূপার মামলার রায়ে একটি বিশেষত্ব আছে। ৭৩ পৃষ্ঠার ওই রায়ে বলা হয়, যে বাসে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল, সেই জব্দ হওয়া বাসটির মালিকানা রূপার পরিবারকে দিতে হবে। বিচারকদের এ ধরনের স্বতঃপ্রণোদিত ও কল্যাণকর নির্দেশনা বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের হৃত শ্রদ্ধা-আস্থা-বিশ্বাসকে শুধু পুনর্জীবিতই করে না, অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। 

সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় এ রায়ে রূপার পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে শুধু রূপার পরিবার নয়, গোটা জাতিই এ রায়ে সন্তুষ্ট। তার কারণটাও সংগত। রূপার জীবন হরণের দায়টা হয়তো ধর্ষক ও খুনিদের। কিন্তু এই রাষ্ট্রযন্ত্র, এই সমাজব্যবস্থা যে একটা নিরীহ মেয়ের স্বাধীন ও স্বাভাবিক চলাফেরা নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে পারল না—এ দায় তো আমাদের সবার। সে দায় এড়াব কিভাবে? এ রায়ে আমাদের কিছুটা শাপমোচন তো হলো।

অবশ্য দ্রুত ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে রূপার মামলার রায়ই এ দেশে প্রথম দৃষ্টান্ত নয়। এমন ঘটনা বর্তমান সরকারের আমলে আগেও ঘটেছে। যেমন—২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর শিশু রাকিব হত্যা মামলায় মাত্র ১০ কার্যদিবসে বিচার শেষ ও ঘটনার তিন মাসের মাথায় দুই আসামির ফাঁসির রায় প্রদান করে বাংলাদেশে দ্রুততম বিচারের রেকর্ড স্থাপন করেন খুলনার মহানগর দায়রা আদালত। একই দিনে শিশু রাজন হত্যা মামলায় ১৬ কার্যদিবসে বিচার সমাপন ও ঘটনার চার মাসের মধ্যে চারজনের ফাঁসির রায় দেন সিলেটের মহানগর দায়রা জজ। এরপর গত বছর ৮ মার্চ খাদিজাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১১ কার্যদিবসে ৩৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক শেষে মাত্র তিন দিনের মাথায় খাদিজাকে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে কোপানোর অভিযোগে আসামি বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন সিলেটের মহানগর দায়রা জজ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নারী সুরক্ষায় দেওয়া ওই রায় এখন বিচার বিভাগের গৌরবোজ্জ্বল দলিল।

‘দ্রুত বিচার’ ও ‘ন্যায়বিচার’ পাওয়ার অধিকার মানুষের মানবাধিকার ও সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। কিন্তু এ দুয়ের সংযোগ খুবই ক্ষীণ। ন্যায়বিচার হয়তো মেলে; কিন্তু ‘দ্রুত বিচার’? সে তো প্রায় আকাশ-কুসুম কল্পনা। কিন্তু চাইলে ওই কল্পনাকে যে বাস্তবে পরিণত করা যায়, রূপা-খাদিজা-রাজন-রাকিব হত্যার রায়ই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। চাইলে তনু-রিশা-সাগর-রুনির পরিবারের মুখেও আজ রূপা-খাদিজার পরিবারের মতো একটু হাসি ফোটানো যেত। কিন্তু সেটা আমরা পারছি না কেন? নাকি আমরা পারতে চাই না?  আমাদের বিচার বিভাগের ঘাড়ে ৩৩ লাখেরও বেশি মামলার ‘হিমালয়’। সরকার, পুলিশ ও বিচার প্রশাসনসহ আমরা সবাই  উদ্যোগী হলে নিশ্চিত মামলার এই ‘হিমালয়’ ধীরে ধীরে গলে যাবে। আমরা উদ্যোগী হলে থেমে যাবে ‘বিচারের বাণীর নিভৃত কান্না’। আমরা উদ্যোগী হলে থেমে যাবে অপরাধ ও অপরাধীদের চিরাচরিত ও সহজাত দৌরাত্ম্য। কিন্তু আমাদের উদ্যোগ নেই কেন? সমস্যা বা গলদটা কোথায়? এসব ভাবার মতো কেউ কি আছে? 

লেখক :  আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib2@gmail.com



মন্তব্য