kalerkantho


বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী

তারাপদ আচার্য্য

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী

ঋগ্বেদে বাগদেবী ত্রয়ীমূর্তি হলেও জ্ঞানময়ীরূপে সরস্বতী সব জায়গাতেই আছেন। বিশ্বভুবনের প্রকাশ তাঁরই জ্যোতিতে। যোগীর হৃদয়ে সেই আলোকবর্তিকা যখন জ্বলে ওঠে তখন জমাট বাঁধা অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হয়ে যায়। সেই অবস্থায় সাধকের উপলব্ধি ঘটে অন্তর-বাহির সব জায়গাতেই। এই জ্যোতির জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই প্রণব, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী বলেই দেবী সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে দেবী সত্ত্বগুণময়ী। তাঁর জ্ঞানের পরিধি অসীম। অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাকশক্তির প্রতীক দেবী সরস্বতী, তাই তিনি বাগদেবী। তিনিই বক্র ও সুমেধার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপ বলা হয়েছে। দেবী প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। দেবী সরস্বতীর জ্যোতি বিভূতি এবং নদী সরস্বতীর নিষ্কলুষতার সমন্বয়ে দেবী শ্বেতবর্ণা। কল্যাণময়ী নদীর তটে সাম গায়করা বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সাধনে নিমগ্ন হতেন। তাঁদেরই কণ্ঠে উদগীত সামসংগীত শ্রুতি-সুখকর হতো। তারই প্রতীক দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি-বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয়পূর্বক সাধনা করতেন ঋষিরা।

ধ্যানমন্ত্রে সরস্বতী দেবীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মাসনা, মুক্তা হারে ভূষিত, পদ্মলোচনা ও বীণাপুস্তকধারিণী এক দিব্য নারীমূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ক্ষেত্রভেদে সরস্বতী দ্বিভুজা অথবা চতুর্ভুজা ও মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভুজা সরস্বতী পূজিত হন। দেবী অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী।

পুরাণে ও পুরাণোত্তর আধুনিককালে সরস্বতী বাক্য বা শব্দের অধিষ্ঠাত্রী বাগেদবীরূপে প্রসিদ্ধ। পরবর্তীকালে বৈদিক দেবী সরস্বতীর অন্য পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি শুধু বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপেই সুপ্রতিষ্ঠাত হয়েছেন। বৈদিক সরস্বতী বাগাধিষ্ঠাত্রী বা বাগ্দেবীরূপেও বর্ণিত হয়েছেন।

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, তিনি বাকপতিও। ইন্দ্রও বাকপতি। বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সব জ্ঞানের ভাণ্ডার তো ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তাঁদেরই শক্তিতে সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ, ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন ধরাতে। দিনে দিনে সরস্বতী অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হারিয়ে শুধু বিদ্যাদেবী, অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবী হিসেবে ভক্তের মনে স্থান করে নিলেন। তবে সরস্বতীর প্রকৃত তাত্পর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা, জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুৎ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রাহ্মণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতী তীরে উচ্চারিত বৈদিকমন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অন্য জ্ঞানগুলো অনত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে গোলোকে বিষ্ণুর তিন পত্নী—লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যে বিবাদের ফলে গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতীর নদীরূপ পাওয়াই হচ্ছে সরস্বতীর পৃথিবীতে সরস্বতী দেবীরূপে প্রতিষ্ঠত হওয়ার তত্ত্ব।

আদিকাল থেকে ভারতবর্ষে দেবী সরস্বতী বিদ্যার ও ললিতকলার দেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন। কিন্তু ভারতবর্ষের বাইরেও দেবী সরস্বতীর পূজা হয়ে থাকে। যবদ্বীপে পাওয়া পদ্মাসনে বসা সাত তারের বীণা হাতে সরস্বতী দেবীর মূর্তি, তিব্বতে বজ্রধারিণী ময়ূর নিয়ে বজ্র সরস্বতী দেবী ও বীণাপাণি দেবী সরস্বতী, জাপানে বেনতেন নামধারিণী সর্পাসনা দ্বিভুজা বীণাপাণি, অষ্টভুজা হপ্পিবেনতেন সরস্বতী দেবী।

বেদে ও উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যের সৃজনীশক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা ও সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছে হংস বা সূর্য অত্যন্ত সংগত কারণেই। তবে সিংহ ও মেষ সরস্বতী দেবীর আদি বাহন ছিল, যা জানা যায় বৈদিক সাক্ষ্য থেকে। পরবর্তীকালে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ ও কার্তিক কেড়ে নিলেন ময়ূর ও সিংহ ছেড়ে দিয়ে সরস্বতী ব্রহ্মার শক্তি ব্রাহ্মণী হিসেবে বাহনটিকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দিলেন।

বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবীরূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। তিনি হিন্দু সংস্কৃতি ডিঙিয়ে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের পূজার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সরস্বতীর আরাধনার ক্রমবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রূপকল্পনাও বৈচিত্র্য লাভ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেবীর বাহুর সংখ্যা অধিকতর হলেও সাধারণত তিনি চতুর্ভুজা, পদ্মাসনা, শুক্লাবর্ণা, শুভ্রবর্ণা, বীণা-পুস্তক, জপমালা, সুধাকলসর্ধারিণী, চন্দ্রশেখরা, ত্রিলোচনা। কখনো দেবী দ্বিভুজা। তন্ত্রে সরস্বতী বাগীশ্বরী-বর্ণেশ্বরী সারদা।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ



মন্তব্য