kalerkantho


কনে নয় ‘কন্যা’ চাই

আবদুল বায়েস

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কনে নয় ‘কন্যা’ চাই

যদি বলা হয় যে ক্যান্সার, হৃদরোগ বা অন্যান্য জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে বাল্যবিয়ে (চাইল্ড ম্যারেজ), তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে বলে মনে হয় না। এর কারণ ঘাতক রোগে একজন আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু বা ক্ষতি হয়, অথচ এর বিপরীতে বাল্যবিয়ে একটি মেয়ে ও তার প্রজন্মকে নিঃশেষ করে দেয়। প্রথমেই জানা যাক বাল্যবিয়ে বলতে কী বোঝায়। চাইল্ড ম্যারেজ বা বাল্যবিয়ে বলতে ১৮ বছরের নিচে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিয়ে বা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে একত্রে বসবাস (লিভিং টুগেদার) করাকে বোঝায়। গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো তথ্য হচ্ছে, সারা পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় দেড় কোটি মেয়েকে ১৮ বছরে পৌঁছার আগেই বিয়ে দিয়ে অপমৃত্যুর ফাঁদে ফেলা হয়। তার অর্থ, প্রতি মিনিটে ২৮ জন এবং প্রতি দুই সেকেন্ডে একজন মেয়ে এমন ‘অপমৃত্যু’র শিকার হচ্ছে। যাক সে কথা। ‘গার্লস নট ব্রাইডস’ (কনে নয়, মেয়ে) নামে একটি বিশ্ববিখ্যাত ৬৫০টি সুধীসমাজের সমন্বয়ে গঠিত পার্টনারশিপ সংগঠন বাল্যবিয়ে নিয়ে প্রচুর কাজ করছে। ওখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পৃথিবীর যে ২০টি দেশে বাল্যবিয়ের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় নম্বরে (৫২ শতাংশ); নাইজার প্রথম (৭৬ শতাংশ), আর ক্যামেরুনের অবস্থান সবচেয়ে নিচে (৩৮ শতাংশ)। তবে ১৮ বছরের নিচে মোট যত মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, সেই পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে বিশ্বের সর্বোচ্চ ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, আর ভারতের অবস্থান প্রথম। প্রতিবছর বাংলাদেশে ৩৯ লাখ মেয়ে ১৮ বছরে পৌঁছার আগে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয় এবং ভারতে প্রায় তিন কোটি। অর্থাৎ প্রতিদিন বাংলাদেশে ১১ হাজার কোমলমতি মেয়েকে অতি অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে জীবনের আলো থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ এ বয়সে তারা জানে না বিয়ে মানে কী, কী এর পরিণতি। ছেলে-মেয়েরা বিয়ের পিঁড়িতে বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবে, এ বোধ হয় একটা পুতুল খেলা, যা শিশুবেলার চেয়ে একটু উন্নতমানের।

দুই.

সম্প্রতি এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশি মেয়েদের ৪০ শতাংশের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে, আর ৭৪ শতাংশের ১৮ বছরের আগে। যাদের ১৫ বছরের নিচে বিয়ে হয় তাদের এক-পঞ্চমাংশ ২৪ বছরে পৌঁছার আগেই দুই বা তিন সন্তানের মা হয়। তবে সুসংবাদ এই যে, বাল্যবিয়ের গতি কিছুটা নিম্নমুখী এবং সেটা সম্ভবত কিশোরীদের মধ্যে দেরিতে বিয়ের কারণে। যাই হোক, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের প্রকট প্রকোপ একটা ধাঁধার জন্ম দেয়। প্রথমত, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে বেশ সন্তোষজনক হারে, অথচ বাল্যবিয়ে তেমন হারে কমেনি; অথচ দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ের সংযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে লিঙ্গবৈষম্য দূরীভূত হওয়ার কারণে কিশোরীদের ‘ভয়েস’ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অনেকে মনে করে, বাল্যবিয়ে রোধে শিক্ষা একটি শক্তিশালী প্রতিষেধক। অবশেষে মহিলাদের ক্ষমতায়ন যেখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বাল্যবিয়ের অত্যন্ত বেশি প্রকোপ নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

তিন.

বাল্যবিয়ের প্রকোপ বাংলাদেশে যে অত্যন্ত বেশি, সে বিষয়ে সন্দেহ ও উদ্বেগের অভাব নেই। সুধীসমাজ তো বটেই, এমনকি স্বয়ং সরকারি নীতিনির্ধারকরা প্রতিনিয়ত বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে চলেছেন। খুব সম্ভব সম্প্রতি সেই সূত্র ধরে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন প্রণয়নের একটি তাগিদ সমাজ থেকে সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন যে বালক ও বালিকা উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও বাল্যবিয়ে উৎসারিত উৎকট সমস্যা সবচেয়ে বেশি ঘিরে রাখে মেয়েটিকে, যার গর্ভে অত্যন্ত অল্প বয়সে সন্তান আসে; যে শিক্ষাঙ্গন থেকে ঝরে পড়ে এবং যে আক্রান্ত হয় নানা ধরনের রোগব্যাধিতে। সুতরাং ১৮ বছরের নিচে একটি মেয়েকে কনে হিসেবে নয়, বরং মেয়ে হিসেবে দেখা উচিত।

চার.

কন্যা কখন কনে হয়? শিশু বা বাল্যবিয়ের কারণ বহুবিধ। প্রথমত, এর অন্তরে গ্রোথিত থাকে লিঙ্গবৈষম্য। কোথাও কোথাও প্রচলিত ধারণা এই যে মেয়ে ও মহিলার অবস্থান, যেকোনোভাবেই হোক, ছেলে ও পুরুষের চেয়ে নিচে। হিন্দি ফিল্মের ভাষায় আওরাত ও মরদ—প্রথমজনের বসবাস দ্বিতীয়জনের আধিপত্যে আর প্রথমজন প্রজা তো দ্বিতীয়জন রাজা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক ন্যায়নীতি ও নিরাপত্তাহীনতা বাল্যবিয়ে জ্বালানি জোগায় ও অব্যাহত রাখে মাত্র। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর অনেক দেশে পরিবারগতভাবে বালিকা হচ্ছে বোঝা আর বালক হচ্ছে সম্পদ। বোঝাটাকে তার স্বামীর ঘরে হস্তান্তর করার মোক্ষম পথ হচ্ছে অতি অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধ বাল্যবিয়েকে উৎসাহিত করে। মেয়ে কিভাবে আচরণ করবে, কী পরিধান করবে, কার সঙ্গে দেখা করতে পারবে এবং কাকে বিয়ে করতে পারবে ইত্যাদি সিদ্ধান্ত আসবে ‘পুরুষ’ থেকে। পরিবারের মহিলা সদস্যরা বালিকার বা কন্যার যৌনবিষয়ক সব খোঁজখবর নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে পরিবারপ্রধানকে অবহিত করে। ধরে নেওয়া হয় যে অন্য কারো সঙ্গে এমনকি কথা বলাও বারণ। চতুর্থত, বাল্যবিয়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগসূত্রতা থাকতে পারে প্রথাগতভাবে। এ প্রথা চলে আসছে, সুতরাং চলতে দিতে হবে। মেয়ের মা বা দাদির বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছরে, সুতরাং কন্যার বিয়ে ১৬ বছরে হবে এ এমন ক্ষতি কী? কোনো কোনো সমাজে বালিকার ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর থেকে ভাবা হয় যে সে একজন মহিলা। সুতরাং বিয়ে হচ্ছে মেয়ে থেকে মহিলা তথা মা হওয়ার পথ প্রশস্ত করা। পঞ্চমত, উন্নয়নশীল বিশ্বের দরিদ্র পরিবারের অর্ধেকের বেশি মেয়ের বিয়ে হয় বাল্যকালে। দারিদ্র্য যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন পরিবারের একমাত্র কর্তব্য দাঁড়ায় মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে খরচ হ্রাস করা। এমনি করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার মহৌষধ হচ্ছে বাল্যবিয়ে। মেয়েটি অন্যের বাড়িতে চলে যাওয়ার মানে একজন সদস্য কমে যাওয়া এবং অহেতুক খরচ সাশ্রয়। অনেক ক্ষেত্রে বাল্য বয়সে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে যৌতুক পরিশোধের অন্যতম উপায়; এমনকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব পরিহারের উপায় হিসেবে মেয়েকে বাল্যবিয়ে নামক ‘বলি’ দেওয়া হয়। যে সমাজে মেয়ের ‘যৌতুক’ বিদ্যমান, সেখানে বাল্যবিয়ে লোভনীয় অর্থনৈতিক উপায় হিসেবে আবির্ভূত হয়। সবশেষে অনেক মা-বাবা সন্তানের নিরাপত্তা বিবেচনা করে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়; কখনো বা কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বাল্যবিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পৃথিবীর ১০টি সর্বোচ্চ বাল্যবিয়ের দেশের মধ্যে ৯টি রাষ্ট্র এমনিভাবে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ।

পাঁচ.

‘গার্লস নট ব্রাইডস’ বাল্যবিয়ের পরিণতি নিয়েও দু-একটা কথা বলেছে। প্রথমত, বাল্যবিয়ে মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে এবং এটা মেয়েটির জীবনকে সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড় করায়; এমনতরো বিয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ফেলে দেয়। বাল্যবিয়ের কারণে টেকসই উন্নয়নের অন্তত ছয়টি লক্ষ্য সরাসরি হুমকির মুখে পতিত হয়। দৈহিক ও মানসিকভাবে স্ত্রী অথবা মা হওয়ার প্রস্তুতি না থাকার কারণে অল্প বয়সী কনেরা গর্ভকালীন বা সন্তান প্রসবের সময় সবচেয়ে জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ কম থাকার কারণে তাদের পরিবারগুলো দারিদ্র্য নিয়ে বসবাস করে। আর জাতিগত ক্ষতির দিক থেকে এ ক্ষতি কম নয়, একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবদানের অনুপস্থিতি প্রবৃদ্ধিকে সংকুচিত করে রাখে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বা রূপান্তর সম্ভব হয় না।

যদি ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন এবং মেয়ে ও মহিলাদের মানবিক অধিকার সমুন্নত রাখতে হয়, এই মুহূর্তে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে তত্পর ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং সেটা আসতে হবে পরিষ্কার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও যথাযথ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’র আড়ালে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে রোধে অতি সম্প্রতি যে আইনটির সুপারিশ করা হয়েছে, তা কোনোমতে গ্রহণযোগ্য নয় একমাত্র এই কারণে যে, সেখানে ‘ব্যতিক্রম’ ঘটনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ১৮ বছরের নিচে বয়সের মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ—এটাই হওয়া উচিত প্রথম ও শেষ কথা। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ সদস্য, বিরোধীদলীয় নেতা, একটা বড় রাজনৈতিক দলের নেতা ইত্যাদি অবস্থানে মহিলা, সে দেশে বাল্যবিয়ে আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং তা-ও আবার ‘যদি’ ‘কিন্তু’ বসিয়ে আইনটাকে হালকা করা প্রমাণ করে যে মেয়েদের উন্নয়নে মহিলা প্রধানমন্ত্রী বা অন্যান্য পদে মহিলা থাকাই যথেষ্ট নয়।

প্রাপ্ত গবেষণা বলছে ক. বিয়ে এক বছর পিছিয়ে গেলে মেয়েদের স্কুলে অবস্থান ০.৬৮ বছর বৃদ্ধি পায় আর প্রথম বাচ্চা জন্মের বছর বৃদ্ধি পায় ০.৮৪ বছর। তা ছাড়া দেরিতে বিয়ে হওয়ার অর্থ প্রথাগত কিছু ধারণার পরিবর্তন ঘটানো; খ. প্রায় চার-পঞ্চমাংশ মেয়ের বিয়ে হয় অভিভাবক কিংবা অন্যান্য আত্মীয়ের মধ্যস্থতায়; এদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ ১৫ বছরের নিচে আর ৭৭ শতাংশের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সে; গ. ‘কেন বিয়ে হয়েছে’—এ প্রশ্নের উত্তরে উত্তরদাতাদের মাত্র ৩ শতাংশ দৈহিক নিরাপত্তা নিয়ে মা-বাবার উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, ৭২ শতাংশ বলেছে প্রস্তাব এমন ভালো ছিল যে মানা করা যায় না এবং ১৪ শতাংশ বিবাহিত মা-বাবার অনুমতি ছাড়াই স্বামীর সঙ্গে দেখা করেছে। সুতরাং নিরাপত্তার অজুহাতে বাল্যবিয়ের পক্ষে সাফাই গাওয়ার যুক্তি যথাযথ নয়; ঘ. অপ্রাপ্ত বয়স্ক মায়েদের সন্তান খর্বকায় হওয়ার প্রবণতা বেশ বড় মাপে বৃদ্ধি পায় এবং ঙ. ১৮ বছরের নিচে বিবাহিতদের প্রসূতিকালীন মৃত্যু ঘটে বেশি এবং ১৮ বছরের নিচে বিবাহিতদের দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের আশঙ্কা বেশি। অতএব, শুধু আইন করে কিছু হবে না; বাল্যবিয়ে হ্রাস করতে হলে মেয়েদের লেখাপড়া ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক করতে হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিশু প্রতিরক্ষা পদ্ধতি ও সুষ্ঠুভাবে মেয়েদের জন্ম রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

পাদটীকা :

সারা বিশ্বে যত বাল্যবিয়ে হয় তার বেশির ভাগ (৪০ শতাংশ) ভারতে, যদিও বাল্যবিয়ে সেখানে অবৈধ। এর অন্যথা হলে শাস্তি এক লাখ টাকা জরিমানা ও দুই বছরের জেল। তার পরও মহাধুমধামে চলছে বাল্যবিয়ে। আইন করে কি এই মহাপ্রলয় ঠেকানো যাবে? বাল্যবিয়ে রোধে একদিকে যেমন আইন প্রণয়ন জরুরি, অন্যদিকে তেমনি গুরুত্বপূর্ণ জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য