kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো। ধারাবাহিক

দুর্বলতা ও সবলতার বৃত্তে মানুষের জীবন

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুর্বলতা ও সবলতার বৃত্তে মানুষের জীবন

৭০. আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে বয়োবৃদ্ধে উপনীত (জরাগ্রস্ত) করা হবে। ফলে তারা যা কিছু জানত, সে সম্পর্কে সজ্ঞান থাকবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সুরা : নাহল, আয়াত : ৭০)

তাফসির : আগের কয়েকটি আয়াতে সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন প্রাণী ও পতঙ্গ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতে মানুষের সৃষ্টি ও তার বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তাদের জন্য মৃত্যু অবধারিত করে রেখেছেন। এই পৃথিবীকে চিরস্থায়ী বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়নি। পৃথিবীতে যাদের আয়ু দীর্ঘায়িত হয়, তারা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়। এমনকি বয়সের ভারে তাদের স্মৃতিশক্তিও লোপ পায়। সুতরাং ক্ষুদ্র এই জীবনে সবার উচিত পরকালের জন্য পাথেয় সঞ্চয় করা।

মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তর আছে। দুর্বলতা থেকেই মানুষের জীবন শুরু। পরিণতিতেও সে দুর্বলতার দিকে ফিরে যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তিনিই, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়। দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি। শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৫৪)

মানবজীবনের এই দুই দুর্বল সময়ের মধ্যখানে যৌবনকাল। এ সময়ের ইবাদত আল্লাহর অনেক প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যেদিন (কিয়ামত দিবসে) আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন তিনি সাত শ্রেণির লোককে তাঁর ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের অন্যতম হলো এমন যুবক, যার যৌবনকাল কেটেছে আল্লাহর ইবাদতে। (বুখারি, হাদিস : ৫০৪)

জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা হলো বার্ধক্য। বেঁচে থাকলে প্রত্যেকেই বৃদ্ধ হয়, এটাই আল্লাহর বিধান। বৃদ্ধ হলে একজন মানুষের আর কর্মক্ষমতা থাকে না। এই অক্ষমতার কারণেই অবহেলার শিকার হয় প্রবীণরা। কারো কারো ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

বৃদ্ধরা নিজের সন্তানের যত্ন পেতে চায়। তাই ইসলাম বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে মা-বাবার সঙ্গে ‘উফ’ শব্দ উচ্চারণেও নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ মা-বাবা বৃদ্ধ সময়ে সন্তানের সঙ্গে কোনো অসদাচরণ করলে অথবা সন্তানের কোনো ক্ষতি করলেও সন্তান যেন মা-বাবার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করে। কিংবা মা-বাবার সঙ্গে যেন এমন কথা, কাজ বা আচরণ দেখানো না হয়, যার ফলে তাঁরা ‘উফ’ বলতে বাধ্য হন। আসলে ‘উফ’ হলো প্রতীকী শব্দ। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের কষ্ট দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

সন্তানের অসহায়ত্বের সময় যেভাবে মা-বাবা তাদের স্নেহভরে লালন-পালন করেছিলেন, তেমনি মা-বাবার বৃদ্ধাবস্থায়ও সন্তানরা তাঁদের সব চাহিদা পূরণ করবে, এমনটিই ইসলামের বিধান। মহানবী (সা.)-এর কাছে এক লোক এসে প্রশ্ন করলেন, আমার কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো আচরণ পাওয়ার অধিকার কার? নবীজি (সা.) বলেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবার প্রশ্ন করলে তিনি একই উত্তর দেন। তিনবার এমন উত্তর দেওয়ার পর লোকটি আবার একই প্রশ্ন করেন। নবীজি বলেন, তোমার পিতার। (বুখারি, হাদিস : ২২২৭)

একবার প্রিয় নবী (সা.)-এর কাছে এক বৃদ্ধ এলেন। উপবিষ্টরা তাঁকে জায়গা করে দিতে একটু দেরি করেন। দেরি করাটা প্রিয় নবীর পছন্দ হয়নি। নবীজি (সা.) সাহাবিদের কঠোর ভাষায় বলেন, ‘যে শিশুদের ভালোবাসে না এবং প্রবীণদের সম্মান করে না, সে আমার উম্মত নয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)

 

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ



মন্তব্য