kalerkantho


দেশ আমাদের, নির্বাচন আমাদের—বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকা কোথায়

এ কে এম আতিকুর রহমান

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেশ আমাদের, নির্বাচন আমাদের—বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকা কোথায়

অতি সম্প্রতি একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পড়া নিয়ে একটি লেখা পড়লাম। বিষয়টি নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা, আশঙ্কা বা উৎকণ্ঠা নতুন কিছু নয়। নানা কারণেই এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা আমাদের মাথায় এসে ভর করে। 

একটু লক্ষ করলেই আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে সেই ২০১৪ সাল থেকেই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের, বিশেষ করে কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের তত্পরতা ও দৌড়ঝাঁপ। সামনে নির্বাচন, তাই তাঁদের সেই ইচ্ছাটা আবার যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না তা কে বলতে পারে। পাঁচ বছর সময়কাল পেরোলেই সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে একটি জাতীয় নির্বাচন হবে, ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে, নতুন সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হবেন, দেশ ও দেশের জনগণ একটি নতুন সরকার পাবে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা না ভোটার, না প্রার্থী। তাহলে বাংলাদেশের নির্বাচনে তাঁদের কি কিছু করার আছে? হয়তো বড়জোর পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিতে পারেন। তাও আবার আমাদের নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে। আমার কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের এত দৌড়ঝাঁপের আগ্রহ কোথা থেকে সৃষ্টি হয়? এ কাহিনির পেছনে কি অন্য কোনো কাহিনি লুকায়িত আছে?

গ্রামে একটি কথা প্রচলিত আছে—গরিবের সুন্দরী বউ গ্রামের সবারই ভাবি। একসময় হয়তো বাংলাদেশকে নিয়ে এ ধরনের অনুভূতি কোনো কোনো দেশের লোকজনের ছিল। এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আর সে রকম কিছু ভাবার অবকাশ নেই—এ বিষয়টি বুঝতে বিদেশি কূটনীতিকদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তবে আমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ তাঁদের চোখে ঠুলি পরিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়, আমার বিশ্বাস সে উদ্দেশ্যটি তাঁদের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আর সাধারণ বুদ্ধিতে অবশ্যই ধরা পড়বে। তাই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাঁদের অনধিকার চর্চার প্রশ্নই আসে না। 

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে কোনো কিছু করা একজন কূটনীতিকের জন্য অত্যন্ত গর্হিত কাজ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিন্দুমাত্র নাকগলানি কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। সুদীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা কখনো চিন্তাও করিনি। যেসব দেশের কূটনীতিকরা কর্মরত দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো অযাচিত ভূমিকা রাখতে গেছেন, তাঁরাই সমস্যায় পড়েছেন, অনেক সময় ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ হিসেবে কর্মস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে একজন কূটনীতিকের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ানো অনুচিত ও অনভিপ্রেত।

নির্বাচনে আমরা সব দলের অংশগ্রহণ চাই। একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন চাই। তবে কোনো দল যদি তাদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক বা অন্য কোনো কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চায় তবে তো কেউ তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করতে পারে না। আর অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক দাবি-দাওয়ার অজুহাতে সরকারকে বিদেশিদের কাছে বিব্রত করতে চায়, তা একেবারেই অনুচিত হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি আর দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক ঊর্ধ্বে। দেশকে অন্যের কাছে অসম্মানিত করা যে নিজেকেই অসম্মানিত করা—সে কথাটি আমাদের সবারই উপলব্ধিতে রাখতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের জন্য অসম্মান ছাড়া আর কিছুই দেবে না।

পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই জাতীয় নির্বাচন হয়ে থাকে সংবিধান অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মতো এমন অবস্থানে থেকে পৃথিবীর কোনো দেশ কি সে দেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের এভাবে টানাটানি করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে? নিশ্চয়ই নয়। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন জাতি বা মানুষ কখনোই এমন কাজ করতে পারে না। নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মিটিয়ে নেয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের এ দৈন্যদশা যে কেন, তা বুঝতে একটু কষ্ট হলেও একেবারেই যে পারি না তা নয়। এর থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় আমাদের জানা নেই? 

স্বাধীনতার এত বছর পর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এত অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা আর অসহনশীলতা কিভাবে শেকড় গাঁথল? পেছনের হারিয়ে যাওয়া সেই দুঃসময়ের কথা ভুলে দেশ তো এখন গণতন্ত্রের পথে চলছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গনের এ দশা কে জিইয়ে রাখছে? সরকারি দল, বিরোধী দল, নাকি অন্য কোনো শক্তি? নাকি আমাদের রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা বা স্বার্থসিদ্ধির অসৎ উদ্দেশ্য? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি কোনোভাবেই পরিবর্তনের দিকে এগোবে না?

আমরা জানি ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে যে দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখনকার বিরোধী দল বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাদের উদ্দেশ্য আর বিধেয় যা-ই ছিল না কেন, এ কথাটি সত্য যে বিএনপি অংশ নেয়নি। রাজনীতিতে হিসাব-নিকাশ থাকবেই। নেতৃত্বের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা অত্যন্ত অপরিহার্য, অন্তত দলীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে। এদিক-ওদিক হয়ে গেলে শুধু দলই ভোগান্তিতে পড়ে না, সমর্থক জনগণও অনিশ্চিতের পথে পড়ে। বলতে গেলে সঠিক সিদ্ধান্ত না হলে দলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটি কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। নিজের পায়ের শক্তিতে বিশ্বাস না রেখে অন্যকে ভর করে হাঁটতে চাই। হাঁটা যায়, তবে সব সময় অবশ্যই নয়। এ ছাড়া সে হাঁটাবে তার ইচ্ছামতো পথে। আবার মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে সে যে চলেই যাবে না তা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। ক্ষমতার জন্য মায়াকান্না? কাদের কাছে? বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে? জনগণের কাছে যান। তারাই ক্ষমতার উৎস, দেশের মালিক, ভোট দেওয়ার অধিকারী। একমাত্র তারাই কোনো দলকে সরকার গঠনে অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সাহায্য করতে পারে। বিদেশি কেউ নয়। দেশ আর দেশের মানুষের কথা ভাবুন। তাতে ক্ষতি হবে না, বরং লাভই হবে।   

একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক দল বা সংগঠন রয়েছে। কোনো দল সরকারে থাকে, কোনো দল থাকে বিরোধী দলের ভূমিকায়। সংসদীয় গণতন্ত্রে এ দুই পক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে দেশ ও জনগণের কাছে। একটি শক্তিশালী বিরোধী দলই সরকারের জনস্বার্থবিরোধী নীতিমালা বা কর্মকাণ্ডকে গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রতিহত করতে পারে। কারণ একটাই—দেশ ও জনগণের কল্যাণ ভাবনা। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল যখন দেশ ও জনগণের স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয় তাহলে সেই দলকে জনগণ অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে। সময়ের স্রোতে একদিন এ প্রকৃতির দল রাজনীতির অঙ্গন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইতিহাসে এমন নজিরের অভাব নেই।

একজন রাজনীতিবিদ হবেন দেশপ্রেমিক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু এবং উন্নত মনের ও চরিত্রের। দেশের ছোট-বড় অনেক ইস্যুতেই দলের সঙ্গে দলের মতপার্থক্য থাকতে পারে। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেদের মধ্যে থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদেরই এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। যাঁরা দেশ পরিচালনার মতো ক্ষমতা রাখেন, তাঁদের পক্ষে নিজেদের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করা কোনো কঠিন কাজই নয়। তাহলে কেন সেটি হচ্ছে না? এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের খামখেয়ালি, উন্নাসিকতা, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য দায়ী? উদার মনোভাব, সহিষ্ণুতা এবং আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের কাছে জাতীয় কোনো সমস্যার সমাধানই অসম্ভব নয়।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই দেশে কর্মরত বিদেশি দূতাবাসপ্রধানদের জন্য মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে একটি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিল। স্বাভাবিক কারণেই ব্রিফিং দিচ্ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয় যে অত্যন্ত সীমিত আকারে আসিয়ান সদস্য দেশের (চার-পাঁচটি দেশ) পর্যবেক্ষকদের ওই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হবে। কোনো দেশের কূটনীতিককেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। এ জন্য কোনো বিদেশি কূটনীতিক মালয়েশিয়া সরকারের কোনো সমালোচনা করেননি। সর্বোপরি, মালয়েশিয়ার কোনো বিরোধী দল এ ব্যাপারে কোনো বিদেশি কূটনীতিকের শরণাপন্ন হয়েছে বা কোনো কূটনীতিক কোনো বিরোধী দলকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন বলেও শুনিনি। সাংবিধানিক প্রথা মতে যথাসময়ে নির্বাচন হয়ে গেছে। আমরা কূটনীতিকরা নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের সরকারকে বিস্তারিত অবহিত করেছিলাম মাত্র।

এখানে একটি কথা স্পষ্ট, বাংলাদেশেও মালয়েশিয়ার মতো পাঁচ বছর মেয়াদি সরকার হয়ে থাকে। ভেঙে না দিলে ওই নির্দিষ্ট সময়টাকে ধরেই পরবর্তী নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়। আর এ কাজটি সরকার করে না, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন করে থাকে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের আগামী অর্থাৎ একাদশ জাতীয় নির্বাচন ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব একান্তই নির্বাচন কমিশনের। অবশ্য সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ এ ক্ষেত্রে কমিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য ও সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে।

এটা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা আসন্ন এই নির্বাচন কেমন হবে, কবে হবে, ফলাফল কী হতে পারে ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁদের সরকারকে জানাবেন। এ জন্য তাঁদের নির্বাচন কমিশনসহ অনেকের সঙ্গেই আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে এবং সেই চেষ্টা তাঁরা করেও যাবেন। এ বিষয়টি মাথায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে সুবিধাজনক সময়ে দলের এজেন্ডা নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য ব্রিফিংয়ের আয়োজন করতে পারে। কূটনীতিকদের জন্য আমাদের নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর নির্বাচনসংক্রান্ত ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলে ভালো হয়।

বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিকরা বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী ও প্রসারিত করার ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা রাখবেন, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ককে গতিশীল করবেন, সে প্রত্যাশাই করি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা অবশ্যই সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে শুধু জাতীয় নির্বাচনই নয়, অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিষয়ে উদ্ভূত মতপার্থক্য দূর করবেন, বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করবেন না—এ অনুরোধ রইল।  

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



মন্তব্য