kalerkantho


শিক্ষার উন্নয়নে আরো বেশি জোর দিতে হবে

কবীর চৌধুরী তন্ময়

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খুব ছোটকাল থেকেই মা-খালার মুখে শুনতাম, লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। ভালো স্কুলে ভর্তি হতে হবে। ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। আর তাই প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের সাধ্যমতো সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন। অভিভাবকদের এত এত চেষ্টা আজ বিফলে যাচ্ছে শুধু শিক্ষা পদ্ধতি ও ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার কারণে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেন আজ মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়েছে।

কিছুদিন আগে পাঠ্যপুস্তকে এইজনের লেখা থাকবে না, আবার ওইজনের কবিতা থাকবে—এই বিতর্ক নিয়ে গোটা দেশের মানুষের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল। আমাদের মাঠপর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকতামুক্তকরণের দাবি নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত করতে হয়েছে। নানা সমালোচনার মধ্যে কিছুটা উদ্যোগ নিলেও এখনো পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকতার অদৃশ্য ছোবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।

আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা পদ্ধতি ও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস আদৌ রোধ করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ব্যঙ্গ করে বলেছে, বই খুলে পরীক্ষা গ্রহণ করে নিলেই তো হয়! শুধু শুধু শিক্ষার্থী কষ্ট করে কী শিখেছে তার ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দেওয়ার কী প্রয়োজন?

প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু হয়েছে। এই যে নাটোর সদর উপজেলার আগদিঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির গণিত পরীক্ষা বাতিল, এর আগে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস! আবার এটি জানাজানি হওয়ার পর বরগুনার বেতাগী উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত—এ ধরনের সংবাদ জাতির জন্য সত্যিই লজ্জার ও ভয়াবহ অবস্থার। আর এটি ছাড়িয়ে আজ চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা যাচ্ছে না কেন? যারা এই ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তারা কি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী? নাকি মন্ত্রণালয়ের লোকবল এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আইন-আদালত বা জেল-জরিমানা কোনো কিছু মানা-অমানা বা ভয়ভীতির তোয়াক্কা করছে না প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সম্পৃক্ত মহল।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধকরণে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবতা আমাদের সবার অজানা নয়। আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন প্রথম শ্রেণি থেকেই ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করে, তখন ভবিষ্যৎ সত্যিই কঠিন হুমকির মুখে; এটা জাতির দুশ্চিন্তার বিষয়। আর বারবার কারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে এবং সরকারপ্রধানকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে একের পর এক পরীক্ষা-চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস করার মতো রাষ্ট্রীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সরকারের প্রায়োরিটিভিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের শিক্ষাসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক দলের অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ সরকারি প্রেস (বিজি প্রেস), ট্রেজারি ও পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোচিং সেন্টার, একশ্রেণির প্রতারক শিক্ষক ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকতে পারে বলে দুদকের তদন্তকারীদের ধারণা। এবং দুদকের ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে—যেখানে প্রশ্ন ফাঁস, নোট-গাইড, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে দুর্নীতি রুখতে ৩৯ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। টিআইবির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়।

সাম্প্রদায়িক আর মৌলবাদ অপশক্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কিভাবে গিলে ফেলেছে, তার কিছুটা নমুনা দেখা গেছে গত ১৮ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি করা একটি কেক কাটার মতো ঘটনার মাধ্যমে। বিজয় দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। পুরো অনুষ্ঠান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট ঢাকার সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। নির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে করতে চা চক্রে হাজির হন মন্ত্রী। ঠিক এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে হাজির করা হয় জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি করা বিশাল আকারের একটি কেক। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেকটি আনা হয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রীকে এটি কাটার অনুরোধ করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির কর্মকর্তারা। কিন্তু কেকটি দেখেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন শিক্ষামন্ত্রী।

শত-সহস্র অপচেষ্টা করেও স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসর মহল দেশটাকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় ও নেতৃত্বে, তাই সুকৌশলে দেশের পতাকা দ্বিখণ্ডিত করার মাধ্যমে তারা তাদের মনের খায়েশ পূরণ করার চেষ্টা করেছিল।

এখানে শিক্ষামন্ত্রী অসহায় নন। সরকার ও দেশের জনগণ তাঁর পাশে আছে। শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় তাহলে সবার আগে শিক্ষামন্ত্রীর মেরুদণ্ড শক্ত করতে হবে। তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে না। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কালো ছায়া থেকে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকসহ পুরো মন্ত্রণালয়কে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করতে হবে। আর যারা সুকৌশলে দেশের পতাকা দ্বিখণ্ডিত করার মাধ্যমে দেশটাকে মনে মনে দ্বিখণ্ডিত করার চেষ্টা করেছিল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্বর পাকিস্তানিদের পরাজয় নিশ্চিত—এটি জানার পর স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, তাই পরিকল্পিতভাবে রাজাকার, আল শামস, আলবদর বাহিনী দেশের বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন বিশ্বজয়ের কাছাকাছি; তখন আবার শুরু হয়েছে মেধা বিকাশের ক্ষেত্রকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র। চলছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ সুকৌশলে পতাকা কাটার মাধ্যমে দেশকে দ্বিখণ্ডিত করার মনোবাসনা।

যত দ্রুত সম্ভব সরকারের উচিত হবে প্রায়োরিটি ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি নজর দেওয়া। ব্যক্তি ধরে ধরে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারীরা ষড়যন্ত্র করবে, লুটপাটকারীরা নিজেদের পকেট ভারী করবে, দলীয় ও সরকারের নাম বিক্রয়কারীরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে। বেলা শেষে শেখ হাসিনা হবেন বিতর্কিত। আর তাঁর অর্জন হবে ভেতর থেকে ঘুণে খাওয়া নড়বড়ে। ধ্বংস হবে জাতি ও তার মেরুদণ্ড!

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

kabir_tanmoy@yahoo.com



মন্তব্য