kalerkantho


‘শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আগ্রহের অভাব আছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আগ্রহের অভাব আছে’

অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের যে শিক্ষানীতি হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে চমৎকার দলিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা সেটা বাস্তবায়নে কি আগ্রহী? আগ্রহের অভাব আছে। শিক্ষায় সংকটটা কোথায় তৈরি হচ্ছে? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটা সংকল্প থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। সে সময় কিউবায় ৬ শতাংশ বিনিয়োগ হতো, এখন সেখানে ৯ শতাংশ। বিদেশে কিউবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ৬ শতাংশ কেন নয়? আমরা এখনো ২.১ শতাংশের বেশি যেতে পারিনি; বরং বঙ্গবন্ধু যেটা বুঝেছিলেন ১৯৭০ সালে, পরে ১৯৭২-৭৩ সালে, তার ধারেকাছেও আমরা এখনো পৌঁছতে পারিনি।’ শুক্রবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের টক শো উপসংহারে ‘শিক্ষায় সংকট, শিক্ষায় সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

প্রণব সাহার সঞ্চালনায় অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুুরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আমাদের নীতির কোনো অভাব নেই। আমাদের চমৎকার পেনাল কোড আছে, যেখানে কোন অপরাধে কোন দণ্ড দেওয়া হবে, তা লেখা আছে, সেটা কি যথাযথ প্রয়োগ করছি? আমাদের ট্রাফিক আইন আছে, তা কি প্রয়োগ করছি? অর্থাৎ আমরা আইন-নীতি প্রণয়ন করি বটে; কিন্তু সেটার প্রয়োগ হয় না। অপরাধের বিচার না হওয়া আমাদের পুরনো চিত্র।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষানীতিতে দুটি জিনিস নেই, তার পরও করে যাচ্ছি। যেমন পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা শিক্ষানীতির কোথাও নেই। তার পরও করেই যাচ্ছি। শিক্ষানীতিতে আছে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা থাকবে। কিন্তু এখন আমরা পঞ্চম শ্রেণিতে এটা দিয়ে চিরস্থায়ী একটা ব্যবস্থা করে রেখেছি। তাহলে কোথায় দাঁড়াচ্ছি আমরা? মানছি না। এই দুটি পাবলিক পরীক্ষার জন্য কোচিং বাণিজ্য গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কারণ এটার জন্য মুখস্থনির্ভর শিক্ষা গ্রামপর্যায়ে চলে গেছে। শিক্ষার্থীরা আগে আনন্দঘন পরিবেশে শ্রেণিকক্ষে পড়ার জন্য উৎসাহী হতো, এখন পরিবারগুলো জিপিএ ৫ পাওয়ার চাপে বাচ্চাদের কোচিংয়ের হাতে তুলে দিচ্ছে। অকারণে দুটি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষানীতির বিপরীতে চলে যাওয়া হচ্ছে।’

মনজুুরুল ইসলাম বলেন, ‘আজ খুশির খবর যে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা ১০ বছর ধরে বিনা পয়সায় শিক্ষাদান করছেন। বিশ্বের কোথাও এমন নজির নেই। সংকটটা কোথায়? কিছুদিন আগে সহকারী শিক্ষকরা আন্দোলন করলেন, তাঁদের বেতন ১১ হাজার টাকা। সচিবালয়ের পিয়নরা এর চেয়ে বেশি পান। আজীবন তাঁরা সহকারী শিক্ষক থাকবেন, কোনো উন্নতি নেই। শ্রীলঙ্কায় শিক্ষককে ওপরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। উৎসাহী করা হয়। বঙ্গবন্ধুর চাওয়া অনুযায়ী যদি শিক্ষায় ৬ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারতাম, তাহলে শিক্ষকদের বেতন তিন গুণ বাড়াতে পারতাম।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ১০ মাসের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার, যা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান হিসেবে পরিচিত। এই সংবিধানে শুধু শিক্ষা দিয়ে অঙ্গীকার করা হয়নি, এই দেশ যে জনগণের, জনগণের রক্ত দিয়ে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতিফলন প্রতিটি অনুচ্ছেদে দেখতে পাই। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা আছে, গণমুখী শিক্ষার কথা বলা আছে এবং সেখানে বলা আছে, একটি আইন প্রণয়ন করে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করতে হবে। অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা আছে। এও বলা আছে যে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারার চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় ও সমাজের চাহিদার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার দর্শন হবে সেটা, যাতে সমাজের চাহিদা পূরণ ও দেশের উন্নতি হয়।’

ড. হারুন বলেন, ‘আজ উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে ৩.৫ মিলিয়ন শিক্ষার্থী সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া করে। প্রায় শতভাগ শিশু উপযুক্ত বয়সে স্কুলে যাচ্ছে। নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হার বেশি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘একটি শিক্ষা কমিশনের জন্য আমাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১০ সালে আমরা একটি জাতীয় শিক্ষানীতি পেয়েছি। এর আগে কোনো জাতীয় শিক্ষানীতি ছিল না। মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু বিষয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেটা আগে আদৌ ছিল না। এখন এ দুটিকে অভিন্ন শিক্ষার মধ্যে কিভাবে নিয়ে আসা যায় তার প্রচেষ্টা নেই তা নয়, সে ক্ষেত্রে পুরো সফল হয়েছি, তা-ও বলব না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় ধরনের সফলতাও আছে। কিছু সমস্যা, যেমন প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘন ঘন পরীক্ষা হয়। তবে বছরের শুরুতে ৩৫ কোটি বই বিনা মূল্যে বিতরণের এমন নজির বিশ্বের কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।’



মন্তব্য