kalerkantho


স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের খুলনা উপকূল

গৌরাঙ্গ নন্দী

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এ কথা সবারই জানা যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অংশকে পশ্চিম ভাগ, দক্ষিণ-পূর্ব অংশকে পূর্ব ভাগ এবং মাঝখানের অংশকে মধ্য ভাগ বলে। এই পশ্চিম ভাগটি অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলটি; খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার পুরোটা এবং যশোর ও নড়াইল জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। এলাকার মোট আয়তন প্রায় ২০ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে সুন্দরবনের পরিমাণ ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি।

এই এলাকার ভূ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশ (ইকোলজি) স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের। এমনকি উপকূলীয় অন্যান্য এলাকা থেকেও এর পার্থক্য খুবই পরিষ্কার। সুন্দরবন, ঈষৎ লবণাক্ত পানি (Brackish Water), পিট বেসিন ও জোয়ার-ভাটার জলাভূমি, জোয়ার-ভাটা নদীর ওপর নির্ভরশীলতা প্রভৃতি কারণে এ অঞ্চল স্বতন্ত্র। এখানকার গাছপালা, পশু-পাখি ও জলজ প্রাণী কিছুটা ভিন্ন ধরনের। অঞ্চলটি পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।

সুন্দরবন ও উপকূলীয় জলাভূমির (Tidal Wetland) ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হলো জোয়ার-ভাটার প্লাবন ভূমি। নিকট অতীতে এর গোটা অঞ্চলটি ছিল সুন্দরবনের মধ্যে। সুন্দরবনের গাছপালা কেটে এখানেই বসতি স্থাপিত হয়। এই সুন্দরবন পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এর সঙ্গে জোয়ার-ভাটার জলাভূমি ও বসতি এলাকার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ইউনেসকো এ বনাঞ্চলের অংশবিশেষকে (তিনটি পৃথক এলাকা) ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।

এই এলাকার সব বিপত্তির শুরু কৃষি উন্নয়নের জন্য নেদারল্যান্ডসের জ্ঞানে পোল্ডার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পর থেকেই। এখানকার জালের মতো নদীগুলো পোল্ডার ব্যবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীগুলো প্রতিদিনই দুবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। বিপুল সংখ্যক সামুদ্রিক জলজ প্রাণী তাদের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এসব জলাভূমিতে পার করত। এসব জলাভূমি ছিল মাছের ভাণ্ডার। ছিল নানাবিধ উদ্ভিদ, প্রাণী, পাখি, উভচর প্রাণী সমৃদ্ধ।

গাঙ্গেয় বদ্বীপে হাজার হাজার বছর ধরে ব্যক্তি পরম্পরায় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্থানীয় মানুষ বাঁধ-বন্দির প্রচলন করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে এ ধরনের বাঁধকে দশের বাঁধ বা অষ্টমাসি বাঁধ বলা হতো। এই বাঁধের আওতায় জোয়ারের প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং বছরে একটি ফসল চাষাবাদের জন্য বিলের উঁচু অংশ বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলা হতো। সাধারণত ফসলি বাঁধের মেয়াদ থাকত আট মাস।

এ পদ্ধতিতে বিলের গভীর অংশ বিশেষভাবে কেটে স্থায়ী জলাভূমিতে সারা বছর এবং সব বিলে চার-পাঁচ মাস জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত হতো। ফলে বিলে ভূ-গঠন, নদীর নাব্য রক্ষা, প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব বাধাগ্রস্ত হতো না। এই বিশেষ ভৌগোলিক প্রতিবেশব্যবস্থার কথা বিবেচনায় না নিয়েই গত শতকের ষাটের দশকে পোল্ডার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয় এবং পরে একই ধরনের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বর্তমানের জলাবদ্ধতা ও পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেছে।

পোল্ডার ব্যবস্থার আগে এখানে বদ্বীপ গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। এখন ভূ-গঠন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ভূমির নিম্নগমনের (Earth Subsidence) কারণে ভূমি একতরফাভাবে বসে যাচ্ছে। এলাকার জলাভূমিগুলো নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং নদ-নদীগুলোর মধ্যকার আন্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এলাকার প্রাণদায়িনী জোয়ার-ভাটার নদীগুলো বেশি হারে পলি জমে অকালে মরেছে, মরে যাচ্ছে। উপরন্তু নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, নোনা পানির চিংড়ি চাষ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব; সর্বোপরি কার্যক্রমে সমন্বয় না থাকায় জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানুষ এই সমস্যা থেকে বাঁচতে এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় স্থানান্তর (মাইগ্রেশন) করছে।

১৯৯০ সালের দিকে জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সেই সনাতনি অবকাঠামোগত (পোল্ডার) পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিন্তু জনগণ তা মানতে চায়নি। এলাকাবাসী বিল ডাকাতিয়া, বিল ভায়নাসহ এলাকার বিভিন্ন বিলে জোয়ার-ভাটা চালু বা নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে জোয়ারে আসা পলি বিলে অবক্ষেপিত হয়ে বিল-ভূমি উঁচু হয়। মানুষের মুখে হাসি ফোটে। বিল ভায়নার সফলতা পরীক্ষা করতে সরকার সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (সিইজিআইএস) নামের প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়। তাদের সমীক্ষায় জোয়ারের পানি টেনে এনে বিলে জমা করার এই পদ্ধতি উচ্চ প্রশংসিত হয়। তাদের রিপোর্টে বলা হয়, এই পদ্ধতি ব্যবহারে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নদীর নাব্য রক্ষা এবং নিচু বিল উঁচু করা সম্ভব। এই পদ্ধতিকেই বলা হচ্ছে টিআরএম বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ জোয়ারের পানি ব্যবস্থাপনা।

প্রকৃতপক্ষে এটি জোয়ারের পলি ব্যবস্থাপনা। যে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এলাকার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় অনেকটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। আবার একতরফাভাবে ভূমি বসে যাওয়া (Earth Subsidence) পূরণ করা এবং বদ্বীপের অসম্পন্ন ভূমি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি। বলাই বাহুল্য, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবেলার ক্ষেত্রেও এটি একটি কার্যকর ও যথাযথ অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) কৌশল। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ধারণা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণে টিআরএমের কোনো বিকল্প নেই।

টিআরএমের এই ধারণাটি পাউবো কর্তারাও গ্রহণ করেছেন। তাঁরাও একাধিক প্রকল্পে টিআরএম বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প, ভবদহ পানি নিষ্কাশন প্রকল্প প্রভৃতিতে টিআরএম বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পাউবোর উদ্যোগে এর আগে ‘বিল খুকশিয়া’য় টিআরএমের বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। পাউবো কর্তাদের ওপর বিরূপতা থেকে মানুষ টিআরএমবিরোধী হয়ে ওঠে। কারণ বিল খুকশিয়ায় পরিকল্পিত সময়ের চেয়েও টিআরএম কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। অথচ ওই সময়ের জন্য ফসল উৎপাদন করতে না পারা মানুষেরা ক্ষতিপূরণের অর্থ পায়নি। কার্যক্রমটিতে নিবিড় তদারকি না থাকায় তা থেকে যে পরিমাণ পলি অবক্ষেপিত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

বলাই বাহুল্য, টিআরএম বাস্তবায়নে জনমনে অসন্তোষের মূল কারণগুলো হচ্ছে ক্ষতিপূরণ পদ্ধতির জটিল প্রক্রিয়া, পেরিফেরিয়াল (টিআরএমের জন্য চিহ্নিত এলাকার চারদিকের বাঁধ) বাঁধ উঁচু ও মজবুত না হওয়া, বাঁধের বাইরে বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বর্ষার পানি বিকল্প পথে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা এবং সর্বোপরি বিলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করা।

ক্ষতিপূরণ প্রদানসংক্রান্ত সরকারি নীতিমালায় পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে যে প্রকল্প দ্বারা সব ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের আওতায় আসবে। কিন্তু পাউবো এ পর্যন্ত জমির মালিক ছাড়া অন্য কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেয়নি। এতে বঞ্চিত হয়েছে মাছ চাষি, ভাগ চাষি এবং বিলের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী ও দুস্থ জনগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে ক্ষুব্ধতাও তৈরি হয়েছে। উপরন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিতকরণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জনগণকে সংগঠিত করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও পাউবো কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়নি। আবার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরের মতো ভূমি অধিগ্রহণ নীতিমালার আলোকে প্রচলিত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। এতে শুধু জমির মালিক ছাড়া আর কারো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যেহেতু এটি বিশেষ অবস্থা, সে কারণে বিশেষ ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

টিআরএমের জন্য সব জমি স্থায়ীভাবে অধিগ্রহণ করা হয় না বা প্রয়োজনও নেই। এখানে স্থায়ী ও অস্থায়ী দুইভাবে অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন হয়। খাল-নালা কাটার জন্য স্থায়ীভাবে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়; আর যে জমি টিআরএমের কারণে পানি আটকে রাখার দরকার হয়, তা অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রকল্প চলাকালীন সময়ের জন্য অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন হয়। ফলে ক্ষতিপূরণও দুইভাবে দেওয়া উচিত। এক, স্থায়ী অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণের অঙ্কটি আকর্ষণীয় করা এবং দুই, অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং এর ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। এ ছাড়া বিলভূমির ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী ও দুস্থ জনগোষ্ঠী এবং উচ্ছেদ হওয়া জনগোষ্ঠীর জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। বলাই বাহুল্য, স্বতন্ত্র এলাকার জন্য স্বতন্ত্র ভাবনার বিকল্প নেই। আমরা কি তা ভেবে দেখতে পারি?

 

লেখক : সাংবাদিক



মন্তব্য