kalerkantho


আসাম পরিস্থিতি যেন সংকট সৃষ্টি না করে

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আসাম পরিস্থিতি যেন সংকট সৃষ্টি না করে

উত্তর ভারতের সীমান্ত রাজ্য আসামের পরিস্থিতি এখন জটিল থেকে জটিলতর। ‘বাঙাল খেদাও’ শব্দটি বহু পুরনো। বিগত শতকের পাঁচের দশকে আসাম থেকে বাঙালিদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন আসাম সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছিল, যার ফলে সেই সময় আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে কয়েক লাখ বাঙালিকে বিতাড়ন করা হয়। গর্জে ওঠেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়। বিরোধীদলীয় নেতা জ্যোতি বসুকে ডেকে তিনি বলেন, ‘তোমরা বিরোধীরা একটা বড় মাপের হরতাল ডাকো। আমি বাধা দেব না। তাতে সমর্থন করব।’ তৎকালীন আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের হুমকিতে থমকে দাঁড়ায় সরকার। কিন্তু পরিস্থিতি একেবারে নিভে যায় না। তারপর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়া ও পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দা মহলের খবর হলো, পাকিস্তানের গুপ্তচর আইএসআই বাংলাদেশ থেকে আসামে অনুপ্রবেশের উদ্যোগ নেয়। পরেশ বড়ুয়ার মতো সন্ত্রাসবাদীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেন খালেদা জিয়া।

১৯৮২ সালের গোড়ায় আসামে যে নির্বাচন হয়, ইন্দিরা গান্ধী সেই নির্বাচনের দায়িত্ব দেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী গনি খান চৌধুরীকে। তাঁর আপ্রাণ চেষ্টায় হিতেশ্ব্বর শইকিয়া আবার ক্ষমতায় ফিরে এসে শান্তি আলোচনা শুরু করেন। হিতেশ্বর বাবু ও তরুণ গগৈ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে চেষ্টা করেছিলেন, তাতে বাধা দেন উত্তর বিহারের এক নেতা। তিনি আসাম গণপরিষদ নামে একটি দলকে তাতিয়ে তোলেন। আসামের নির্বাচিত কংগ্রেস সরকার বাতিল করে রাজীব গান্ধী আবার নির্বাচনের ডাক দেন। এতে হেরে যায় কংগ্রেস। যিনি তখন কংগ্রেসকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সদস্য। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর প্রবল মতবিরোধ হয়। পরে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগও করেন। আসামের সন্ত্রাসবাদীরা তখন গিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। আর মদদ দেয় পাকিস্তানি গোয়েন্দা চক্র আইএসআই। সমর্থন করেন খালেদা জিয়া। সন্ত্রাসবাদীদের ঢাকায় পাঠালেও তারা চলে যায় মিয়ানমার হয়ে চীনে। তাদের অন্যতম নেতা ছিলেন পরেশ বড়ুয়া। বর্তমান ঘটনার নায়ক হলেন সর্বানন্দ সোনোয়াল মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় ব্যক্তি বসন্ত বিসওয়াল। তিনি দিল্লিকে খুশি করার জন্য গত ৩১ ডিসেম্বর বহিরাগতদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছেন, তা শুধু দুর্ভাগ্যজনকই নয়, রোহিঙ্গাদের মতো আসাম থেকে আবার লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে ফেরার উদ্যোগ নেয়, তার পরিণাম যে কী হতে পারে, তা কল্পনারও বাইরে।

বাংলাদেশ সরকারেরও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। যাতে আরেকটি রোহিঙ্গা না হয়। আর এবারের এই পৈশাচিক ঘটনার নায়ক বসন্ত বিসওয়াল সারদা কাণ্ডে অভিযুক্ত। সিবিআই তাঁকে জেরা করার পর তিনি রাতারাতি কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তথাকথিত বহিরাগত হিসেবে আসামে বসবাসকারী মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য দিল্লির বিজেপি ও নাগপুরের আরএসএসকে সন্তুষ্ট করতে তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতারা মনে করেন।

তাঁরা মনে করেন, আসামের যারা স্থায়ী নাগরিক তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা হলে রাহুল গান্ধী রুখে দাঁড়াবেন। এরই মধ্যে তিনি আসাম কংগ্রেসকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কংগ্রেস নেতারা এ-ও বলেন, এ বছরই বাংলাদেশে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগেই আরএসএস বাংলাদেশে একটা গোলমাল পাকাতে চাইছে। যেকোনো উপায়ে তা বন্ধ করতে হবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামের বহু বিতর্কিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জির প্রথম তালিকায় নাম উঠল এক কোটি ৯০ লাখ মানুষের। এই তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন জমা পড়েছিল তিন কোটি ২৯ লাখ। আসামে কারা বৈধ নাগরিক, আর কারা অবৈধভাবে বসবাস করছে, তা যাচাই করার জন্য এই অভিযান শুরু হয়েছে।

নতুন বছরের প্রথম দিন এই তালিকা প্রকাশ হওয়ায় আসামজুড়ে তথ্যকেন্দ্রগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। হাতে কাগজপত্র নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মানুষ যাচাই করে, তাদের নাম উঠেছে কি না। অনলাইনেও অবশ্য খোঁজ নেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু চাহিদার চাপে অনলাইন ব্যবস্থাই কার্যত ভেঙে পড়েছিল। এই তালিকা প্রকাশের ঘটনায় বিশেষ করে উদ্বিগ্ন সংখ্যালঘু মানুষই।

১৯৮৫ সালে আসু ও গণসংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের চুক্তির সময় ঠিক হয়েছিল, ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে আসামের নাগরিকত্ব ঠিক করা হবে। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যারা আসামে এসেছে, তারা বৈধ নাগরিক নয়। তারপর ধীরগতিতেই এই প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও আসুর মধ্যে আবার একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় এই নাগরিক তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরফে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি সংস্থা এ কাজ শুরু করে ২০১৩ সাল থেকে।

নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ও অন্যান্য প্রশ্ন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেই ৪০টিরও বেশি শুনানি হয়েছে। তাঁদেরই নির্দেশে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। ২০১৬ সালে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চিহ্নিতকরণের কাজে গতি এসেছিল। বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিধানসভায় ভোটেও লড়েছিল বিজেপি।

ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল শৈলেশ বলেছেন, যাদের নাম প্রথম তালিকায় ওঠেনি, তাদের আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। অন্য নামগুলোও পরীক্ষার বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। নথিপত্র খতিয়ে দেখা শেষ হলে আবার একটি তালিকা প্রকাশ করা হবে। কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। তবে অনেকটা এখনো বাকি। উল্লেখ্য, দেশে এমন অভিযানের আগে কোনো নজির নেই। সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানি এপ্রিল মাসে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ পেলেই পরবর্তী তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ বছরের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। এই অভিযানে রাজ্যের সমন্বয়কারী প্রকাশ হাজেলা বলেছেন, ২০১৫ সালের মে মাস থেকে আবেদন জমা পড়েছে। ৬৮.২৭ লাখ পরিবারের কাছ থেকে সাড়ে ছয় কোটি নথি নেওয়া হয়েছে। তা মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এ কাজ করতে গিয়ে একই পরিবারের কারো নাম বাদ পড়ে যেতে পারে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও বলেছেন, প্রথম তালিকা দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যারা প্রকৃত নাগরিক, তাদের নাম তালিকায় থাকবেই। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও আতঙ্কের পারদ চড়ছেই। সোমবার লাইনে দাঁড়িয়ে তালিকা দেখার পর অনেকেই বলে, পুরো পরিবারের নামই বাদ রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করে, পরিবারের খণ্ডিত নাম রয়েছে। অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের নেতা সাংসদ বদরুদ্দিন আজমলের নাম প্রথম তালিকায় ওঠেনি। তবে তা নিয়ে এখনই শোরগোল তুলতে চাইছে না তাঁর দল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে রাজ্যজুড়েই নিরাপত্তা কঠোর করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ২০ হাজার অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। যদিও সোমবার অপ্রীতিকর ঘটনার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। একমাত্র শিলচরের হানিফ খান নামে এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর নাম তালিকায় না ওঠায় তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন বলে প্রতিবেশীরা অভিযোগ করেছে। ১৯৫১ সালে ভারতে একটি নাগরিক তালিকা তৈরি হয়েছিল। তারপর এমন অভিযান আর হয়নি।

লেখক : কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক


মন্তব্য