kalerkantho


রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের বছর

ড. মো. মাহ্বুবর রহমান

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তথা তাঁর পরিকল্পিত আধুনিক, সমৃদ্ধ, উন্নত, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রণীত রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নিষ্কলুষ সততা, নিরলস প্রচেষ্টা, প্রজ্ঞাশীলতা ও আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায় তাঁকে ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিনে আন্তরিক অভিনন্দন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জিত লাল-সবুজের পতাকা শোভিত স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে আজ অত্যাবশ্যক প্রায় সব চাহিদা পূরণকারী একটি মর্যাদাশীল উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী  রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর সঙ্গে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের, জিয়াউর রহমান যাঁদের পুনর্বাসন করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রথা ও মানদণ্ডে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি কার্যকর করে দেশকে অনেকটা কলঙ্কমুক্ত করেছেন। মাথাপিছু আয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে এক হাজার ৬১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, একজন রিকশা শ্রমিক তার উপার্জনে তিন বেলা খেয়ে-পরে ভালোভাবে দিনাতিপাত করছে। গ্রামগঞ্জে যেনতেন কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। কারণ তারা অধিক পারিশ্রমিকের অনেক কাজ পায়। গ্রামেও এখন বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। প্রত্যন্ত অনেক গ্রামগঞ্জে পর্যন্ত ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত এবং সহজলভ্য।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাঁর সরকার একটি উন্নয়নবান্ধব সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়াস নিয়েই কাজ করছে। তবে  কিছু লোক এসব সুযোগ, অর্জন, মর্যাদা ধূলিসাৎ করার কুিসত অপকর্মে লিপ্ত। কারো কারো চোখে ভালো কোনো কিছুই দৃশ্যমান নয়। যখনই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তা নিয়েই তারা মেতে ওঠে। শত শত সাফল্যের ইতিহাস শূন্য হয়ে যায় কোনো একটি বিচারহীন বড় অন্যায়ের কারণে। তবে একটি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কারো মুখেই কোনো অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের কোনো একটি সাফল্যের কথা আমি অন্তত এযাবৎ শুনিনি। কৌশলগত কারণে কোনো একটি বিষয়ে একটি দলকে দুর্বল করতে চাইলে বা অন্যের কাছে অগ্রহণযোগ্য করতে চাইলে তাদের দৃশ্যমান ভালো কাজগুলোর কিছু অন্তত প্রশংসা করা আবশ্যক। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, একটি বড় দল ও তাদের জোটের শরিকরা কৌশল হিসেবেও বর্তমান সরকারের দেশে-বিদেশে শত শত প্রশংসনীয় কাজ সম্পাদিত হয়ে থাকলেও তার একটিও তাদের মুখে আনে না। উদাহরণস্বরূপ পদ্মা সেতু, হাইটেক পার্ক, ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা। রোহিঙ্গা বিষয়টি সরকার যেভাবে মোকাবেলা করছে, যেভাবে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিসহ সারা বিশ্ব এত জোরালোভাবে স্বীকৃতি দিলেও একটি বড় দল তাদের বক্তব্যের শুরুতেই এ সম্পর্কে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে। অন্যান্য সরকারের সময়ে অগুনতি, অফুরন্ত অন্যায়, দুর্নীতি, গুম, হত্যা, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, সাংবাদিকসহ, নারী ও শিশু নির্যাতন হয়েছে (অকাম্য), সাধারণ জনগণ তা প্রত্যক্ষ করেছে। সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের চরম ঘাটতির কারণে মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে, চরম কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য, আজ তারা বা তাদের সাফাই গাইতে গিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবীও বেমালুম ভুলে যান সেসব মহাসত্য অপকর্ম। এ কথা সত্য যে এজাতীয় কিছু ঘটনা যে বর্তমান সরকারের সময়ে ঘটছে না, তা নয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অন্তঃকলহে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকে অত্যন্ত  ফলাও করে বলা হয়। কিন্তু সরকার এ ধরনের অনেক ঘটনার সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অনেককে বিচার করে উপযুক্ত শাস্তিও প্রদান করেছে। সে বিষয়ে প্রশংসা তো দূরের কথা, মুখে পর্যন্ত এসব বুদ্ধিজীবী আনেন না। দেশে এ সরকারের আমলে দৃশ্যমান অসংখ্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সাধিত হয়েছে—রাস্তা, সেতু, মেগা প্রকল্প, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে, সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার (সব কিছুর যথাযথ পরিসংখ্যান রয়েছে বিধায় উল্লেখ করলাম না)। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক বিষয়গুলোকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ সরকার নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের অনুরূপ কর্মসূচি গ্রহণে নির্দেশ দিচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো কার্যকর হচ্ছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সেগুলো কিছু বুদ্ধিজীবী দেখেও না দেখার ভান করছেন। অথচ সেই দলটি ক্ষমতায় এসে উন্নয়ন তো নয়ই, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার শুধু মৌলিক বিষয় নয়, সম্পূর্ণ চেতনা ও কাঠামো ভেঙে চুরমার করেছে, তা অনেকে খুব ভালোভাবে জেনেও বলেন না, বরং অন্য কথা বলেন। আশ্চর্য যে যথেষ্ট প্রভাবশালী এসব ব্যক্তি সর্বত্র বিচরণ করেন। তাঁদের মুখোশ বোঝা মুশকিল।

যে গতিতে দেশ দ্রুত এগোচ্ছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের আগেই দেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে, এ আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস।  বিশ্বাসটি আরো সম্প্রসারিত ও দৃঢ় হবে যদি সরকার নতুন বছরের প্রথম থেকেই অপরাধী, সে যে-ই হোক, তাকে আইনমাফিক যথাযথ শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করে। আইনের শাসন পূর্ণ প্রতিষ্ঠায় যেটুকু ঘাটতি রয়েছে, তা অবশ্যই সম্পূর্ণ দূর করতে হবে। এ কাজে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা-নেত্রী ও সমর্থক সংগঠন প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করবে, যারা রূপকল্প ২০২১-এর পূর্ণ বাস্তবায়নাকাঙ্ক্ষী তারা এটি দৃঢ়ভাবে আশা করে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ ব্যাপারে সর্বত্র যা বলছেন, তা কার্যকর হলে সেটা হবে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সার্থক। কথাটি মহাসত্য যে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সূচকে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, সে গতি অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া নিশ্চিত এবং তা সম্ভব শুধু এই সরকারের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকতা যথার্থভাবেই রক্ষিত হবে যদি বর্তমান সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত প্রকৃত ত্রুটি বা দুর্বলতাগুলো দূর করার সত্যিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দেশপ্রেমিক জনগণ সেটাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঐকান্তিকভাবে কামনা করে। যাঁদের স্থানীয় জনগণ দুর্নীতিবাজ হিসেবে জানে, যিনি বা যাঁরা তাঁর বা তাঁদের  এলাকার জন্য কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না করে স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন করেছেন, তিনি বা তাঁরা কোনো কিছুর বিনিময়েই নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পাবেন না, এটা দেশপ্রেমিক জনগণের ঐকান্তিক কামনা। সার্বিক বিবেচনায় ২০১৮ সাল বাংলাদেশের ২০২১ ও ২০৪১ সালের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ইস্পাত কঠিন মনোবলসম্পন্ন শতভাগ সৎ ও অদম্য সাহসী বঙ্গবন্ধুকন্যা যেসব প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় জানেন সেগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে রূপকল্পের সার্বিক উন্নয়নধারা গতিশীল রাখার জন্যই সাংবিধানিকভাবে তাঁর সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার সার্বিক ব্যবস্থা নেবেন, নববর্ষ ২০১৮-এর প্রথম প্রহরে এটাই দেশবাসীর ঐকান্তিক কামনা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর



মন্তব্য