kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার ► চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন

‘মুক্তির সংগ্রাম’ এখনো শেষ হয়নি

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘মুক্তির সংগ্রাম’ এখনো শেষ হয়নি

শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উদ্ভাসিত একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি চিত্রশিল্পী। একাত্তরের গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর চিত্রকলাও মুক্তিযুদ্ধ তথা সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইঙ্গিতময় অভিব্যক্তির জন্য সুপরিচিত। আধুনিক ঘরানার প্যারিসপ্রবাসী এই শিল্পী ১৯৯২ সালে মাস্টার পেইন্টার্স অব কনটেম্পোরারি আর্টসের ৫০ জনের একজন হিসেবে বার্সেলোনায় অলিম্পিয়াড অব আর্টস পদকে ভূষিত হন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা নাইট উপাধি পেয়েছেন। প্রথম বিদেশি চিত্রশিল্পী হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে ‘আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স’ মর্যাদায় দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান এবং চিত্রকর্ম প্রদর্শন করেন। এ চিত্রশিল্পীর ‘শান্তি’ নামের একটি শিল্পকর্মও ঢাকায় প্রদর্শিত হওয়ার পথে। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের বর্তমান পরিকল্পনা, বাংলাদেশে চিত্রকলা চর্চার সম্ভাবনা, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা—এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী হাফিজ

 

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের শিল্পকলার চর্চা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

শাহাবুদ্দিন : যত দেশ আছে, কে না জানে, ইউরোপের ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন—এসব দেশের বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পী তাঁদের নিজস্ব ধারায় পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিলেন। নাইনটিন থেকে টোয়েন্টি সেঞ্চুরিতে আমেরিকার দিকে এ ধারা কিছুটা যায়। আর আমাদের ভারতবর্ষে, বাংলাদেশে চিত্রকলার জন্ম বলতে গেলে ১৯৫২ বা ১৯৫০ সালের দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কারণেই তো! ইউরোপের তুলনায় বলা যায়, ঐতিহাসিকভাবে চিন্তা করলে আধুনিক চিত্রকলার ক্ষেত্রে আমাদেরটা শিশু। আমরা তো ভারতের মধ্যেই ছিলাম। ভারতের বা এই উপমহাদেশের চিত্রকলার কেন্দ্রটা কিন্তু বেঙ্গলে বাঙালিদের হাতেই ছিল। তার প্রভাব বর্তমান বাংলাদেশেও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান থাকার সময় কিছু হয়নি। জয়নুল আবেদিন কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন, অন্য যাঁরা চিত্রকলার আন্দোলনে ছিলেন তাঁরাও কলকাতায় পড়াশোনা করেন। কলকাতা আমাদের কেন্দ্র ছিল। ওখানে থাকাতে যে প্রভাবটা তৈরি হয়েছে, সে প্রভাবটা একাত্তরে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে আসে। স্বাধীনতার আগে শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বাধা ছিল তাতে আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম, ক্ষুধার্ত ছিলাম। স্বাধীনতার পর বিষয়টি উন্মুক্ত হয়ে যায়। চিত্রকলার জন্য রেনেসাঁ তৈরি হয়। রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, চিন্তার ক্ষেত্রে এই উন্মুক্ত পরিবেশ আগে ছিল না। অনেকের দক্ষতা ছিল না। চিত্রকলা কেনার লোক ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল অল্প শিক্ষাতেই ফুটে উঠছে চিত্রকলা। একটা মাত্রা আসে। এই মুহূর্তে দেশে চিত্রকলার যে মাত্রা রয়েছে, তা পৃথিবীর অনেক দেশে নেই। চিত্রকলা বলতেই নেই। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ায় অনেক আগে থেকে চিত্রকলার চর্চা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ নতুন শুরু করেও ধাপ ধাপ করে উঠে গেল। চিত্রকলায় বলেন আর সাহিত্যই বলেন, একটা গোষ্ঠী এটাকে উঠিয়ে নিয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর দৌড়াদৌড়ির মধ্যে যারা একটা বাড়ি খেয়েছে, তারা ঘুমন্ত ছিল না, তার পরও একটা হুংকারের মধ্যে জেগে উঠেছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখন বাঙালিরাই ছবি কিনছে। মার্কেটিং এখানেই হচ্ছে। এটা আগে কখনো হয়নি। প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন কিন্তু বাইরের ওপর ভরসা করে হয় না। এখানে যাঁরা এখন ভালো ছবি আঁকেন তাঁরা মোটামুটি একটা জায়গায় আছেন। ছবি বিক্রি করেই তাঁদের চলছে। এটা পাকিস্তান আমলে অকল্পনীয় ছিল। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটা ফল। তার পরও বলছি, ইউরোপে শিল্পকলার রেনেসাঁ ফোরটিন সেঞ্চুরিতে। তার কত বছর পর প্যারিস এখন এ ক্ষেত্রে মক্কা। আমাদের এখানে তো সে তুলনায় সবে শুরু হওয়ার মতো, শিশু অবস্থা। তার পরও বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশে শিল্পকলা শিক্ষার এত স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি কী করে হলো? এটা হয়েছে এই কারণে যে এটাকে দাবিয়ে রাখার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে; কিন্তু পারেনি। ফল উল্টো হয়েছে। এর বিকাশ হচ্ছে।

ইরান, ইরাক, ইজিপ্টে চিত্রকলার কিছুটা উন্নয়ন ছিল। এ ক্ষেত্রে ওদের ইতিহাস আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে গেছে ওরা। কী কারণে, এখন তা বলছি না। আমাদেরও অনেক ঝামেলা গেছে। যদি পঁচাত্তর না হতো, তাহলে আমার মনে হয়, বাংলাদেশ শিল্পকলায় এখন পৃথিবীতে শীর্ষস্থানে থাকত। এ কথায় হাসি পেতে পারে; কিন্তু বাস্তব।

 

কালের কণ্ঠ : মুক্তিযুদ্ধে যে প্রত্যাশা ছিল তার কতটুকু পূরণ হয়েছে বলে আপনার ধারণা?

শাহাবুদ্দিন : সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছি, স্বাধীনতাযুদ্ধ তো একবারই আসে। এখন অনেক চেষ্টা করলেও সে সুযোগ পাওয়া যাবে না। তখন যে এত মানুষ শহীদ হলো, রক্ত দিল, সেই রক্তের কারণেই কিন্তু আমরা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার। এটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এটার জন্য আবার—বঙ্গবন্ধু যেটা উচ্চারণ করেছিলেন ‘মুক্তির সংগ্রাম’, এই মুক্তি খুব কঠিন জিনিস। স্বাধীন হতে পারো; কিন্তু মুক্তি অর্জন একটা বৃহৎ বিষয়। মুক্তির জন্য আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে। কারণ চারদিক থেকে ঝঞ্ঝাট, নিউ কাইন্ড অব কলোনিয়াইজডের অপচেষ্টা হচ্ছে। এটা বেদনাদায়ক। ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের মূল প্রত্যাশা ছিল। শুধু আমি নই, হাজার হাজার বাঙালি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সবাই এক হয়ে গিয়েছিল। এটা না হলে শিল্পী শাহাবুদ্দিন যুদ্ধে যেত না। এটা হারাতে বসেছে। তবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বড়জোর ২৫ বছর, এই অবস্থার অবসান হবে। কারণ ম্যাচিউরিটির একটা সময় লাগে।

 

কালের কণ্ঠ : ঢাকার দেয়ালে সম্প্রতি এক ধরনের গ্রাফিতি আলোচনায় রয়েছে। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’ লেখা এই গ্রাফিতি কি আপনার নজরে এসেছে?

শাহাবুদ্দিন : আসলে সব কিছুুরই প্রয়োজন আছে। অনেক দেশ এ পদ্ধতি জানেই না। এভাবেই হতে হবে। আমি বারবার বলছি, একটি গোষ্ঠী, পরিবার কিন্তু কাজ করে যাচ্ছে। ওই গোষ্ঠী বা পরিবার যদি মজবুত থাকে, তাহলে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। এ ধরনের চিত্রকলা মানে কেউ চিন্তাভাবনা করছে। সবাই এটা করে না। সবাই সাধারণভাবে থাকতে চায়। সহজভাবে ভাবতে চায়, সহজভাবে আয় করতে চায়। কয়েকজন ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। বসে থাকে না। এভাবেই হতে হবে। এর মাধ্যমে ভালো-খারাপ জাজমেন্টটা তৈরি হয়। চিত্রকলার যেকোনো মাধ্যম হোক, যাঁরা বড় চিত্রকর, তাঁদের কাজে হিউম্যানিটির বিষয়টি ধরা পড়ে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনাকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘কালার অব ফ্রিডম’ সম্পর্কে কিছু বলুন।

শাহাবুদ্দিন : আমি খুব সহজভাবে বলছি, একদিক থেকে আমি নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি। আমি যখন দেখি আমার প্রিয় সত্যজিৎ রায়, তাঁর কলাকুশলী, ক্যামেরাম্যান, তাঁর আশপাশের লোকজন সেই একই। প্রতিটি ফিল্মে একই লোক। এর মানে কী? ফ্যামিলিটা একই। কাজগুলো সবাই দ্রুত বুঝে ফেলছে। এই যে অজয়দা, যিনি এই ডকুমেন্টারি ফিল্মটা করেছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার কাজটা তিনি বুঝে ফেলেছেন। আমার কর্মটা কী? ছবি আঁকা। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে যে আর্ট ক্যাম্প হয়, সেখানে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। ওখানে যাওয়ার পর, ছোট ক্যানভাসের বদলে বড় ক্যানভাসে আঁকার উদ্যোগ নিই। ব্যথা-বেদনা সব ঠেলে ফেলে ভালোবাসার বিষয়টা বড় করে ফুটিয়ে তুলতে চাই। ফিগারটা তো একটা প্রিটেস্ট। ওই সময় থেকে তিনি পেছনে পেছনে ঘুরছেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে একটা পরিবার তৈরি হয়ে গেল। অনেকবার তিনি প্যারিসে গেছেন। বিষয়টা এত সহজ নয়। রাজা-বাদশাহর ছেলে হলে ওকে। বারবার যাওয়া তাদের জন্য সহজ। অজয়দার সঙ্গে ভালোবাসার একটা বিষয় তৈরি হয়েছে। মনের যে ব্যথা-বেদনা, আকাঙ্ক্ষা, শূন্যতা তা পূরণ হচ্ছে। আমার যত ডকুমেন্ট আছে, যত কাহিনি আছে, ছবি আঁকা বলেন—সব অজয়দার কাছে আছে। তিনি মনেপ্রাণে খেটেখুটে ফিল্মটা করেছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি মুক্তিযুদ্ধকে এত ভালোবাসেন, তাঁর ভেতরে এ নিয়ে একটা হাহাকার কাজ করে। এই বিষয়টা তাঁকে এই ফিল্মটা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে মনে হয়। তারপর ইন্টেলেকচুয়ালিটির বিষয়ও রয়েছে। এই ফিল্মটা প্রথমে প্যারিসে প্রদর্শনের কথা ভাবা হয়েছিল। পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে আগে বাংলাদেশে ও ভারতে হোক।

কালের কণ্ঠ : গত ফেব্রুয়ারিতে আপনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে অতিথি হিসেবে ছিলেন। সেখানে আপনার চিত্রকলার প্রদর্শনীও হয়েছে।

শাহাবুদ্দিন : ১৯৬৮ সালে আমি প্রথম কলকাতায় যাই। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর তখন বর্ডার সিল। আমার গুরুরা তো কলকাতাতেই ছিলেন। আমার বাবার মুখে সেখানকার কত কাহিনি শুনেছি। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেখানে একই হলে ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তখন আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। কলকাতায় যাওয়াটা তখন আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। তখন দালাল ধরে বর্ডার পার হতে গিয়ে ধরা পড়ে জেলও খেটেছি। তারপর তো মুক্তিযুদ্ধের সময় যাওয়া হলো। একসময় মনে হয়েছে, ফ্রান্সে এত লোক, বাংলাদেশে এত কোটি লোক আমাকে চেনে, আমার আর কী দরকার? ইন্ডিয়াতেও একসময় পরিচিত হব। ইন্ডিয়াতে যাব, তার প্রস্তুতি দরকার, নিজেকে মজবুত করা দরকার, যাতে ওরা আমাকে গ্রহণ করে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদের ঘটনা, সলিডারিটি টু স্টপ, কলকাতায় যাওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু যখন ইয়াং ছিলেন তখন তিনি মহাত্মা গান্ধীর মুভমেন্ট, অহিংস আন্দোলন দেখেছেন, নেহরুকে দেখেছেন, প্রভাবিত হয়েছেন; যার ফলে তিনি অসহযোগ আন্দোলন করেছেন। বঙ্গবন্ধু কিন্তু মুখে একবারও অস্ত্রের কথা বলেননি। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বলেছেন ‘তোমাদের যা কিছু আছে’। অস্ত্র দিয়ে আঘাত করো তা বলেননি। বললাম না, একটা পরিবার থাকতে হবে? সেই পরিবারের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। এ ধরনের পরিবার যার নেই একসময় তার মধ্যে হতাশা আসবেই। আমরা আমাদের আপন লোকজনকে জানি না। খামাখা মাওটাও, লেনিনমেনিন তাঁদের নিয়ে চিন্তা করি। এটা আমাকে খুব ক্ষুব্ধ করে।

 

কালের কণ্ঠ : ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে অতিথি হওয়ার বিষয়টি জানতে চাচ্ছি।

শাহাবুদ্দিন : ভারতে এরই মধ্যে আমাদের একটি পরিবার তৈরি হয়েছে। ওটা ধীরে ধীরে ফোকাস করছে। তিনি (ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়) আমার ছবি দেখেছেন। এখানে আমার এক বন্ধু রয়েছেন মেহেরপুরের সাবেক এমপি প্রফেসর মান্নান ভাই। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই পরিচয়। মন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই। তিনি সম্পর্কটা মেইনটেন করতেন। তারপর তো প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন। যাঁরা বড় হন তাঁরা সম্পর্ক ভুলে যান না। একদিন তিনি প্রফেসর মান্নানকে বললেন, ‘আমার মনে হয় না শাহাবুদ্দিনের ছবি আর আমি দেখতে পাব!’ তখন আমি ঢাকায়। প্রফেসর মান্নান তাঁকে বললেন, ‘শাহাবুদ্দিন ভাই তো ঢাকাতেই আছেন, কলকাতায় একজিবিশন করতে যাচ্ছেন।’ তখন তিনি বলেন, দিল্লি হলে সুবিধা হয়। এসব কথায় আসলে তিনি আমার বিষয়ে তাঁর আগ্রহটা প্রকাশ করেন। মান্নান ভাই কলকাতার প্রগ্রামটা দিল্লিতে করতে বললেন। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? সব আয়োজন সম্পন্ন। প্রয়োজনে কলকাতারটার ডেট চেঞ্জ করা যায়, যদি তিনি কলকাতায় আসেন। তিনি ডেট দিলেন। এদিকে কলকাতায় যাঁদের গ্যালারি তাঁদের মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ার কথা! ঠিক হলো রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত ডেটেই একজিবিশন হবে। প্রথমে আপাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বলি। আপা সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তো প্রধানমন্ত্রী। নানা প্রটোকলের বিষয় আছে। শেখ রেহানাকে জিজ্ঞেস করি যেতে পারবেন কি না। ২০১৫ সালের আগস্টে ওই একজিবিশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার কয়েক দিন আগেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায় মারা যান। সব ওলটপালট হয়ে গেল। ছয় মাস পর ওই প্রগ্রাম হলো। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় উদ্বোধন করলেন। এটা একজন শিল্পীর জন্য বড় পাওয়া। আজ পর্যন্ত বেঁচে থাকা শিল্পীর এ ধরনের প্রাপ্তি সচরাচর ঘটে না। ইউরোপে ও আমাদের দেশে তো বটেই। এরপর দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে অতিথি হওয়ার ও সেখানে একজিবিশন করার আমন্ত্রণ পাই। এটাও একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

শাহাবুদ্দিন : এত বছর হলো কিন্তু শিল্পী শাহাবুদ্দিনের কোনো বই নেই। বই করা তো বাংলাদেশ বা ভারতে এক সপ্তাহের ব্যাপার। কিন্তু সে ধরনের বই আমি চাচ্ছি না। আপনি যদি লন্ডন, নিউ ইয়র্ক বা প্যারিসে যান এবং সেখানকার লাইব্রেরিতে ফিদা হুসেনের (ভারতের জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী) কোনো বই পাবেন না। ইন্ডিয়ায় পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না। কারণটা কী? কারণটা হচ্ছে ডিস্ট্রিবিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ডিস্ট্রিবিউটাররা ‘হু ইজ হি’ জেনে, তাদের ব্যবসা হবে কি না বিবেচনায় নিয়ে কাজ করে। এখানকার বইমেলার জন্য প্রকাশকরা তো এ ধরনের বই ছাপাবে না। আমার যে বইয়ের জন্য কাজ চলছে তা ফ্রেঞ্চ, ইংলিশ ও স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত হবে। এতে আমার ১৭৫টির মতো পেইন্টিংয়ের ছবি থাকবে। লেখার মধ্যে বাংলাদেশের দুজনের—মইনুদ্দিন খালেদ ও বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের লেখা থাকছে। বাকিরা ফরাসি। পরের বইটা হবে বাংলায়।

বর্তমান পরিকল্পনার মধ্যে আরো আছে, ‘শান্তি’ নামের সেই প্রদর্শনীটা, যেটা ভারতে করলাম, ওটা কলকাতায়, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে হয়ে গেছে। আগামী মার্চে ঢাকায় করা হবে। এ জন্যই এবার এসেছি।

 

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শাহাবুদ্দিন : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।

 


মন্তব্য