kalerkantho


সরব সবুজে নীরব কর্মী

হানিফ সংকেত

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



সরব সবুজে নীরব কর্মী

ছোটবেলা থেকেই আমরা পড়ে এসেছি, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’, গানে শুনেছি, ‘মানুষ মানুষের জন্য—জীবন জীবনের জন্য’; কিন্তু সব ভুলে আর্থ-সামাজিক কারণে সেই মানুষেরই এক বিরাট অংশ আজ হয়ে পড়েছে স্বার্থপর। তবে অনেকেই আছে, যারা শুধু আত্মস্বার্থে অন্ধ না থেকে স্বার্থের বন্ধ দরজাটা খুলে দেয় মানুষের জন্য, নিজেকে উৎসর্গ করে মানবসেবায়; যাকে আমরা বলতে পারি জনস্বার্থ।

আর সবার সুখের জন্য যে স্বপ্ন দেখে তার অন্তরে তৈরি হয় এক দায়বোধ। সেই দায়বোধ থেকেই নীরবে-নিভৃতে মানুষের জন্য কাজ করে অনেকেই।

আমরা যারা শহরে বাস করি তারা হয়তো ধারণাই করতে পারি না, আমাদের গ্রামের মানুষদের সমাজ সচেতনতার বিষয়টি এখনো কত গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রচারবিলাসী নয়, কর্মবিলাসী। কথা নয়, তাদের কাছে কাজটাই মুখ্য। পাবনার বাদশা মোল্লা তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন। বাদশার বয়স ৩৫ বছর। বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। পেশায় তিনি একজন তাঁত শ্রমিক।

গ্রামবাসী জানায়, ছোটবেলা থেকেই বাদশা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এলাকার সবার কাছে তিনি ‘সাইকেল বাদশা’ নামে পরিচিত। বাদশা তাঁর নিজের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের পতিত জমি এবং বিভিন্ন মানুষের বাড়ির আঙিনায় যে খালি জায়গা রয়েছে, সেখানে সবাইকে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। নিজ হাতে বিতরণ করেন বীজ আর সেই বীজ থেকে বিভিন্ন শাকসবজিতে ভরে উঠছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির আঙিনা। প্রায় প্রতিদিন সকালে পুরনো একটি সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন ‘সাইকেল বাদশা’। সাইকেলের সামনে লেখা রয়েছে, ‘আপনার আঙিনা ফেলে রাখবেন না—বেশি বেশি গাছ লাগান। ’ সাইকেলের সামনে বিশেষভাবে নির্মিত কিছু হ্যান্ডেলে এবং তাঁর নিজের গলায় বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজে ভরা বোতল ঝোলান বাদশা। এরপর তিনি সাইকেলে চরে গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজ বিতরণ করেন। এসব বীজের মধ্যে রয়েছে লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়স, শসা, শিমসহ নানা ধরনের সবজি। শুধু বীজ বিতরণই নয়, কিভাবে সেই বীজ বপন করতে হবে, নিয়মিত যত্ন নিতে হবে, কী সার দিতে হবে তা-ও শিখিয়ে দেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বাড়িতে যান সবজির বাগান দেখতে। তাঁর দেওয়া বীজ থেকে উত্পাদিত ফসলে ভরে ওঠা বিভিন্ন বাড়ির আঙিনা দেখে মন ভরে যায় বাদশার। কৃষক বন্ধু যশোরের প্রয়াত আইয়ুব আলীর মতো বাদশাও বিশ্বাস করেন—আমাদের বাতাস, পানি, মাটি, পরিবেশ পৃথিবীর যেকোনো কৃষিভিত্তিক মাটির চেয়ে বেশি উপযোগী। সুতরাং আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে এ দেশ হবে সোনার চেয়ে খাঁটি মাটির সোনার বাংলাদেশ।

এসবের পাশাপাশি বাদশা বাল্যবিবাহ, মাদক সেবন ও যৌতুকবিরোধী স্লোগান লিখে লিফলেটও বিতরণ করেন। শুধু তা-ই নয়, গ্রামের মানুষের নানা প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসেন বাদশা। কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বাজার থেকে কারো কোনো জরুরি প্রয়োজনে কেনাকাটা করে দেওয়া, ওষুধ কিনে দেওয়া, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষদের সেবা করা—এমনই নানা কাজে খুঁজে পাওয়া যায় বাদশাকে। এ কারণে খুব দ্রুত তিনি সবার প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। বিটিভিতে প্রচারিত ‘ইত্যাদি’র গত অনুষ্ঠানে (পাবনা পর্ব) আমরা বাদশার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম।

জানতে চেয়েছিলাম বাদশার কাছে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়েও কেন এসব করছেন? সোজাসাপটা উত্তর বাদশার—ভালো লাগে, তাই করি। ভালো কাজ করতে অর্থ কোনো সমস্যা নয়, আর আমি যা করছি তাতে তেমন কোনো অর্থ লাগে না।

যতটুকুই লাগুক কিভাবে তা জোগাড় করেন জানতে চাইলে বাদশা বললেন, গ্রামের কৃষকরাই তাঁর জন্য বীজ রেখে দেয়। তাঁর দেওয়া বীজ থেকে যে ফসল হয়, সেই ফসল থেকে পাওয়া বীজগুলো তারা বাদশার জন্য রেখে দেয়।

জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার ভবিষ্যৎ ইচ্ছা কী? সহজ-সরল ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া। যত দিন বাঁচব আমি যেন মানুষের জন্য কাজ করতে পারি।

বাদশা কোনো মহাজ্ঞানী বা কোনো বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞও নন, এমনকি কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের অতি প্রচারিত পরিচিত মুখও নন। কিন্তু তিনি যা বললেন সেটা তাঁর অন্তরের কথা। আমরা তাঁর এই অনুকরণীয় কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর এই সুন্দর উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করার জন্য এক লাখ টাকার একটি চেক দিয়েছিলাম। বাদশা তাঁর এই অর্থ সব কৃষি অন্তপ্রাণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করে বলেছেন, তিনি মানুষের কল্যাণে সব সময়ই তাঁর কাজ চালিয়ে যাবেন। আসলে বাদশার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে গ্রিন সেভারসের উদ্যমী তরুণ আহসান রনির কথা। ছাদে বাগান করার ধারণাটি যিনি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে সবাইকে সবুজের প্রতি, সর্বোপরি গাছের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর এই কার্যক্রমের নাম ‘ছাদ বাগান’ কার্যক্রম। রনিই প্রথম নাগরিক জীবনে নগর কৃষির ধারণাটিকে পরিচিত করেন।

এই সংগঠনের সবুজ কর্মীরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। সবচেয়ে বড় কথা, কাজপাগল এই যুবকরা প্রচার কাঙাল নন। রনি যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া একজন কৃষকের সন্তান। তেমনি প্রত্যেক কর্মীই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী। আবার অনেকেই আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। ‘আমাদের গরজে—আপনার খরচে’ এই স্লোগান দিয়ে তাঁরা শহরের বাড়িতে বাড়িতে পরিত্যক্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে অল্প খরচে ফুল-ফল ও সবজি বাগান করে দেন এবং পরিচর্যা করার পরামর্শ দেন। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাতে বাসার  ভেতরে ও ছাদে প্রায় সব ধরনের গাছের বাগান করা যায় সে ব্যাপারে সচেতন করতে, বাড়ি নির্মাণের সময় ডেভেলপার কম্পানিগুলোকে ছাদ নির্মাণে আধুনিক স্থাপত্য কৌশল প্রয়োগ করে বাগান করার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করতে গ্রিন সেভারস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

শুধু ছাদ বাগানই নয়, শিশুদের অবুঝ মনে সবুজের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলার জন্য অনেক স্কুলে তারা স্থাপন করেছে অক্সিজেন ব্যাংক; যেখানে শিক্ষার্থীরা টিফিনের পয়সা জমিয়ে পরবর্তী সময়ে বাগান করার কাজে তা ব্যবহার করে। গ্রিন সেভারসের আরো একটি চমত্কার উদ্যোগ হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ ক্লিনিক; যার মাধ্যমে তারা নগরবাসীর দোরগোড়ায় মাটি, গাছ ও গাছের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়।

২০১২ সাল থেকে ঢাকা শহরে গাছের নামে পরিচিত স্থানগুলোয় অর্থাৎ কলাবাগান, খেজুরবাগান, কাঁঠালবাগান, সেগুনবাগিচা, নিমতলী, জামতলী ইত্যাদি এলাকায় ওই প্রজাতির বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও একটি সবুজ ঢাকা গড়ার কার্যক্রমে গ্রিন সেভারসকে একাত্ম করেছে।

গ্রিন সেভারস সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আহসান রনি বলেন, ‘আমাদের স্বাতন্ত্র্য হচ্ছে আমরা সবাই কৃষকের সন্তান। আমাদের রুট গ্রামে, আমরা আমাদের বাবার পেশা বা কাজকে সম্মান করতে জানি। আর এ প্রেরণা থেকেই আমরা আধুনিক কৃষি শিখেছি এবং সর্বত্র তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের এই ছাদ কৃষির ধারণা এখন অনেকেই গ্রহণ করেছে এবং এ কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন অনেক ছাদে বাগান হচ্ছে। ’

পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। নগর কৃষিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১৫ সালে অর্জন করেন ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। তবে এ নিয়ে অনেকের মতো রনির কোনো প্রচার-প্রচারণা কিংবা বিশিষ্টজনদের (!) মন্তব্য দিয়ে টিভিতে কোনো সম্প্রচার ছিল না।

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হওয়া এমন মানুষেরাই আমাদের অহংকার। আর তারাই মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, প্রচারে কর্ম নয়—কর্মেই প্রচার। আর প্রচার সার কর্ম অসাধুর ধর্ম। তাতে জাঁকজমক থাকে, অনেক চমক থাকে, ফুর্তির ঠমক থাকে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কথা বমনের গমক থাকে; কিন্তু কর্মতৃপ্তি থাকে না।

আর সে জন্যই রনি আর বাদশার মতো কৃষি অন্তপ্রাণ মানুষদের আমরা বলতে পারি সত্যিকার জনপ্রতিনিধি। বলা যায়, সরব সবুজে নীরব কর্মী। স্বার্থ নয়, ক্ষমতা নয়, প্রচার কাঙাল হয়ে টিভি প্রদর্শনীতেও নয়, ফেসবুকের মাধ্যমে আত্মপ্রচারের ঢোল পিটিয়ে নয়, যোগসাজশের তথাকথিত ফ্যান দিয়ে প্রশংসার বাণী বানিয়ে, নানা ধরনের সুপারিশের আয়োজন করে নয়, অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্যের জন্য নয়, লোক-দেখানো প্রতারণার জন্য নয়, এমনকি ভোটপ্রত্যাশী সাময়িক দরদি হয়েও নয়, সত্যিকারের মানুষ-দরদি মানুষই খাঁটি মানুষ। আমাদের প্রয়োজনেই এসব মানুষকে মূল্যায়ন করা উচিত, পুরস্কৃত করা উচিত। আমাদের দেশে কিছু চেনা মুখকেই সব সময় পুরস্কার পেতে দেখি। বলা বাহুল্য, এসব পুরস্কারের বেশির ভাগই পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। বিষয়টি অনেকটা এ রকম—আমি তোমাকে পুরস্কার দেব, বিনিময়ে তুমিও আমার জন্য কিছু করবে। এদের যোগ্যতা না থাকলেও ক্ষমতা আছে। এসব পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠান বাদশা বা রনির মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের খোঁজ রাখে না। কারণ তাঁরা প্রচারমাধ্যমে নয়, কাজ করেন গ্রামেগঞ্জে, মাঠেঘাটে। তাই তাঁদের কষ্ট করে খুঁজে আনতে হয়। যেমন ‘ইত্যাদি’র প্রয়োজনে আমরা তাঁদের খুঁজে নিয়েছি। আর সেই প্রয়োজনটা হচ্ছে, তাঁদের কাজ দেখে যেন অন্যরা অনুপ্রাণিত হয়। আজকাল অনেককেই বলতে শুনি, এই পুরস্কার আমার দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে রনি বা বাদশাদের এসব পুরস্কার পেয়ে দায়িত্ব বাড়েনি, তাঁরা এমনিতেই দায়িত্ববান। তাই বলব, তেলে মাথায় তেল না দিয়ে এসব প্রতিভার মূল্যায়ন করুন। তাতে আপনাদের পুরস্কার সম্মানিত হবে। বাদশা আর রনির মতো মানুষদের কর্মোদ্যমী অগ্রযাত্রার সহযোগী হোক সবাই—এটাই কামনা।

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ

ও সমাজ উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য