kalerkantho


ট্রাম্পের বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে অশ্বেতাঙ্গরা মুক্তি পাবে কি

গাজীউল হাসান খান

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ট্রাম্পের বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে অশ্বেতাঙ্গরা মুক্তি পাবে কি

যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সূচিত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তাঁর সমর্থকদের এক বিরাট অংশের মধ্যে ক্রমে ক্রমে এখন বর্ণবাদী কার্যক্রমে রূপান্তরিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, বিশেষ করে বর্ণবাদের অবসানকল্পে যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী দাসপ্রথা বিলোপের জন্য যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ (১৮৬২-১৮৬৫) সংঘটিত হয়েছিল তার সফল পরিণতি ঘটলেও এখন আবার অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত লড়াই যেন ক্রমেই দানা বেঁধে উঠছে।

শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্রের চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের কয়েকটি বিশেষ গোষ্ঠী যেমন নয়া নািস, কু ক্লাক্স ক্লান (KKK) এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা নতুন করে সংগঠিত হয়ে আবার মাঠে নামছে। তাদের আন্দোলন বা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু এখন আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা ইহুদি কিংবা মুসলিম ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন ও হিসপানিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়বস্তুর যথেষ্ট মিল রয়েছে। সে কারণেই তারা নাকি ট্রাম্পকে দেশব্যাপী সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের সময় দল বেঁধে মাঠে নেমেছে। আর এখন সময় ও সুযোগ পেলেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ভার্জিনিয়ার শার্লটভিলের একটি পার্কের সামনে থেকে ক্রীতদাস প্রথা উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জেনারেল রবার্ট ই লির মূর্তি সরানোর ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সেখানে দল বেঁধে সমাবেশ ঘটিয়েছিল তারা। লাঠিসোঁটা ছাড়াও তাদের অনেকের হাতেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র এবং মাথায় ছিল হেলমেট। সেদিন তারা একটি সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অপশক্তির সে উসকানিমূলক সমাবেশ ও আপত্তির বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বামধারা সংগঠনের প্রগতিশীল কর্মীরাও সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। তবে একপর্যায়ে বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের প্রতিপক্ষের ওপর। শুধু তা-ই নয়, তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে দেয় তাদের ওপর দিয়ে। এতে হিদার হেয়ার নামে ৩২ বছর বয়স্ক একজন নারী ঘটনাস্থলে মারা গেছে এবং গুরুতরভাবে আহত হয়েছে আরো ১৯ জন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে যে তাতে নয়া নািস, উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী এবং বর্ণবিদ্বেষী হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ ঘটনায় পড়ে যখন তিনি একটি বিবৃতি দিলেন তখন দায়ী করলেন উভয় পক্ষের কর্মীদের। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ এবং গণমাধ্যমের প্রবল চাপের মুখে তিনি নয়া নািস বর্ণবিদ্বেষী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদীদের নাম উল্লেখ করে নিন্দা জানালেও শেষ পর্যন্ত আরেকটি অনুষ্ঠানে সে ঘটনার জন্য উভয় পক্ষকে সমানভাবে দায়ী করেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নয়া নািসবাদী, বর্ণবিদ্বেষী ও উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী এবং সামাজিক-সাংস্কৃৃতিক দলের কর্মীদের মধ্যে কোনো প্রভেদ রইল না। সেখানে কোনো মৌলিক পার্থক্য দেখেননি ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের বিশ্লেষকদের কারো কারো ধারণা, এমন একটি লোক যদি বেশিদিন দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন, তবে শেষ পর্যন্ত আরেকটি গৃহযুদ্ধ অসম্ভব না-ও হতে পারে। জার্মানির নািসবাদী নেতা হিটলারের মতো শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ববাদের স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও যেন একরকম অন্ধ করে তুলেছে, যা এ সময়ের রাজনীতিতে অচল। ট্রাম্প মুসলমানদের অপছন্দ করেন অথচ আমেরিকাকে এক নম্বর বানাতে নির্ভর করেছেন তাদের অর্থ বিনিয়োগের ওপর। তাঁর সমর্থকরা এখন প্রকাশ্যে স্লোগান দিচ্ছে ইহুদিদের বিরুদ্ধে অথচ তাঁর নিজের মেয়ে ইভানকার স্বামী ইহুদি এবং ইভানকাও ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছেন। সে হিসেবে ট্রাম্পের নাতি-নাতনিরাও ইহুদি। তদুপরি ট্রাম্পের দুই পুত্রবধূও এসেছেন ইহুদি পরিবার থেকে। তা ছাড়া হিসপানিক লাতিন ও বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের কর্মজীবী মানুষের প্রতি ট্রাম্পের উপেক্ষা তাঁর পতনকেই ত্বরান্বিত করবে বলে অনেকের ধারণা। রাজনৈতিকভাবে ফায়দা আদায়ের জন্য ট্রাম্প যে কৌশল অবলম্বন করেছেন তা আমেরিকার গণতন্ত্র, সমাজ ও সংস্কৃতিকে অতিদ্রুত বিষিয়ে তুলতে বাধ্য। তাতে একটি পরিষ্কার বিভাজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিককার একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আলেকজান্ডার হ্যামিলটন বলেছিলেন, ‘আমেরিকা চালায় তার জনগণ’ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এতই বলিষ্ঠ যে তার প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে দেশের জনগণ। দেশ পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত। কিন্তু সে অবস্থা আর এখন নেই। বিভিন্ন পুঁজিবাদী স্বার্থ ও জাল-জালিয়াতি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও প্রশাসনের ভিত্তিকে এখন যেন নড়বড়ে করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কারচুপি কিংবা সে প্রক্রিয়ায় বিদেশি সাইবার হামলা অতীতে কেউ কখনো কল্পনাই করতে পারেনি। সেখানে এখন ক্ষমতা  লাভের প্রশ্নে গোপন রাজনৈতিক আঁতাত, করপোরেট স্বার্থ এবং গণতন্ত্রের আদর্শবিরোধী রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা অত্যন্ত দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (তৃতীয় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনৈতিক, চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী লেখক ও কূটনীতিক। যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য সূচনাতেই বেশ কিছু মৌলিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন জেফারসন। তিনি সংবিধানে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি বিল অব সিটিজেনস রাইটস (ফেডারেল বিল অব রাইটস) অন্তর্ভুক্ত করেন। তা ছাড়া দেশের সংবিধান প্রণয়নের আগেই তিনি ১৭৭৬ সালে একহাতে অর্থাৎ প্রায় একাকীই রচনা করেছিলেন ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ (দ্য ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স)। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য তিনি দুটি বিশেষ সংস্কার এনেছিলেন। এর একটি হচ্ছে বাধ্যতামূলক গণশিক্ষা (পাবলিক এলিমেন্টারি এডুকেশন) এবং অন্যটি হচ্ছে ধর্মচর্চা বা পালনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বাধীনতা। জেফারসন রাষ্ট্র থেকে চার্চ বা ধর্মকে পৃথক করার পক্ষপাতী ছিলেন গোড়া থেকেই। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেছিলেন দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য একটি প্রস্তাব, যা শেষ পর্যন্ত এক ভোটে হেরে যায়। তিনি বলেছিলেন, দাসপ্রথা নামক অভিশাপটির অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বর্ণবৈষম্য বা বিদ্বেষ থাকতে পারবে না। তাহলে গণতন্ত্র ব্যাহত হবে। তা ছাড়া এ রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর, যিনি আমাদের জীবন দিয়েছেন, তিনিই আমাদের মুক্তি (স্বাধীনতা) নিশ্চিত করেছেন। তাঁর সংগ্রহে তখন পবিত্র কোরআনের একটি কপি ছিল এবং তিনি মোটামুটি ছয়টি ভাষা জানতেন।

টমাস জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের প্রথম সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এবং পরে দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামসের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়ার কারণে। জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে একটানা আট বছর দেশ পরিচালনা করেন। কিন্তু তৃতীয়বার আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেননি। তাঁর মতে তেমন একটি ব্যবস্থা হবে গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জেমস মেডিসন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব নিলেও সে সংবিধানের বেশির ভাগ উপাদান ছিল টমাস জেফারসনের গভীর চিন্তা ও দর্শন থেকে উৎসারিত। সংবিধান প্রণয়নকালে তিনি প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করলেও ডাকযোগে তাঁর বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত মেডিসনকে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকার ব্যাপারে জেফারসন ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী। কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অগ্রগতি এবং উত্তরোত্তর তাকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। বহু বর্ণ, ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও নাগরিক অধিকারকে রক্ষা করার জন্য তিনি বারবার বলেছেন, স্বাধীনতা নামক বৃক্ষটি দেশপ্রেমিকদের ত্যাগ ও রক্তদানের মাধ্যমেই পরিপুষ্টি লাভ করবে। সেখানে ধর্ম, বর্ণ কিংবা আর অন্য কিছুকে কোনো বিরোধ সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থ-রাজনৈতিক অগ্রগতি ও শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বর্ণ ও ধর্মের বিরোধকে তিনি অত্যন্ত মারাত্মক বলে উল্লেখ করেছেন। টমাস জেফারসনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ছয় দশক পর রিপাবলিকান দল থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর (জেফারসনের) অসমাপ্ত একটি কাজ বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য পদক্ষেপ নেন। আর সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা। অথচ জেফারসন কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের দলের লোক ছিলেন না। জেফারসন ছিলেন ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান দলের প্রতিষ্ঠাতা, যা পরে ডেমোক্রেটিক দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বর্ণ, ধর্ম ও সম্প্রদায়গত বৈষম্য, বিশেষ করে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে যুক্তরাষ্ট্রকে এক জাতি ও এক শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত করার জন্য আব্রাহাম লিংকন যে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের ১১টি রাজ্য, যারা সামন্তবাদী ও অন্যান্য শ্রেণিস্বার্থগত বিরোধের কারণে দাসপ্রথাকে বিলুপ্ত করতে রাজি হয়নি। তারা প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের জাতীয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে অবস্থায় উত্তরের দাসপ্রথা বিলুপ্তির পক্ষের বাকি ২০টি রাজ্য ও তাদের মধ্যে ১৮৬১ সালে এক আপসহীন গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যা ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। দাসপ্রথা বিলুপ্তির পক্ষে উত্তরের ‘দ্য ইউনিয়ন স্টেটস’ নামে পরিচিত বিভাজনের পক্ষে একজন সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন জেনারেল ইউসেসেস গ্রান্ট (পরে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন)। আর অন্যদিকে অর্থাৎ দক্ষিণের ‘দ্য কনফেডারেট স্টেটস’-এর একজন সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন দাসপ্রথা বিলুপ্তিবিরোধী জেনারেল রবার্ট ই লি। শেষ পর্যন্ত চার বছর স্থায়ী সে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে দাসপ্রথা বিলুপ্তিবিরোধীদের পরাজয় ও ভার্জিনিয়ায় তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

ওপরে বর্ণিত দাসপ্রথার সমর্থক জেনারেল রবার্ট এডওয়ার্ড লির মূর্তি অপসারণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই সম্প্রতি ভার্জিনিয়ার শার্লটভিলে শুরু হয়েছিল নয়া নািসবাদী, বর্ণবিদ্বেষী ও তথাকথিত উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের দাঙ্গা। সাংবিধানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এখন কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে দাসপ্রথা, বর্ণবৈষম্য কিংবা বিদ্বেষ, বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক বিরোধ কিংবা উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কোনো অবকাশ বা স্থান নেই। তবু ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক বিজয় বা লক্ষ্য হাসিলের জন্য উল্লিখিত অপশক্তিকে পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। অথচ রাজনীতির কী নির্মম পরিহাস, যে রিপাবলিকান (রক্ষণশীল) দলীয় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একদিন কৃষ্ণাঙ্গদের দাসপ্রথাসহ সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরই দলের সর্বশেষ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে আমেরিকাকে বিশ্বের এক নম্বর শক্তিশালী দেশে পরিণত করতে চান। তিনি মুসলিম সম্প্রদায় থেকে শুরু করে কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক ও লাতিন সম্প্রদায়কে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান। তাঁর কার্যকলাপ জার্মানির নািসবাদী নেতা অ্যাডল্ফ হিটলারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যমের বিশিষ্ট ভাষ্যকারদের মতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কিংবা প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাহীন এ অর্ধশিক্ষিত ও অসংস্কৃতিমনা লোকটি (ট্রাম্প) এখন সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাচ্ছেন। শার্লটভিলের দাঙ্গায় তিনি নয়া নািসবাদী, বর্ণবিদ্বেষী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী শ্বেতাঙ্গদের গণতান্ত্রিক সমাজে অপশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে নিন্দা জানাননি আন্তরিকভাবে। এখানেও তিনি বর্ণবাদী কিংবা অপশক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে আসা নাগরিকদের শেষ পর্যন্ত সমানভাবেই দায়ী করেছেন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এক চরম বিতর্কিত নির্বাচনে তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াকে কেন্দ্র করে এখন চলছে এক বিস্তারিত তদন্ত। সে তদন্তে চক্রান্তের জটিল থলি থেকে এক অদৃশ্যপূর্ব কালো বিড়াল বেরিয়ে আসতেও পারে। সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রমনা সাধারণ মানুষের ধারণা। একমাত্র তাহলেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র মুক্তি পাবে এবং সম্প্রদায়গত বৈষম্যের অবসান ঘটতে পারে বলে তারা মনে করে।

লেখক : সাবেক কূটনীতিক এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য