kalerkantho


ন্যায়বিচারের সন্ধানে যেতে হবে বহুদূর

মো. জাকির হোসেন

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



ন্যায়বিচারের সন্ধানে যেতে হবে বহুদূর

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস আজ। প্রশ্ন আসতে পারে, প্রতিটি দিনই তো ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম চলছে, তাহলে বিশেষ করে ১৭ জুলাই কেন? ১৭ জুলাইকে বেছে নেওয়ার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রের অক্ষমতা ও অনিচ্ছার কারণে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। এ আদালতের কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি দিতে ও অপরাধ—তা যেখানে আর যে দেশেই হোক, মানুষ যেন বিচারপ্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারে সে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার দিনটিতে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতালির রোমে গৃহীত যে রোম সংবিধির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়, বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে সে সংবিধির পক্ষ হিসেবে এ আদালতেরও পক্ষ। ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার মানুষের সহজাত ও সর্বজনীন মৌলিক মানবাধিকার। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে সংবিধান, সাধারণ আইন আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘ প্রণীত ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা এবং ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিসহ বেশ কিছু সনদে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। ন্যায়বিচারের মূলকথা হলো, প্রত্যেক ব্যক্তির আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত, প্রকাশ্য ও পক্ষপাতহীন বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো হলো, এক. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; দুই. নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার; তিন. দ্রুত বিচার লাভ; চার. প্রকাশ্য বিচার লাভ; পাঁচ. যে আইন দ্বারা বিচার করা হবে সে আইনের ন্যায়বিচার প্রদানের সক্ষমতা এবং ছয়. বিচারকের মেধা ও দক্ষতা।

সাবেক ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে আইন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাঁচ হাজার বছরেরও অধিক পুরনো লিখিত ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এ দীর্ঘ ইতিহাসে, এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ২০০৭ সালের আগে পর্যন্ত বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন—কোনোটাই ছিল না। হিন্দু শাসনামলে রাজা, আর মুসলিম শাসনামলে সম্রাটরা ছিলেন সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিচারক। বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা রাজা ও সম্রাটদের হাতে ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি উপনিবেশ স্থাপন করার পর অতীতের মতো নির্বাহী বিভাগের হাতে বিচারিক ক্ষমতা, বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা ছিল। ১৬৮৪ সালে বোম্বে অ্যাডমিরাল্টি কোর্টের বিচারক ড. সেন্ট জন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দাবি করলে নির্বাহী বিভাগ তাঁকে অ্যাডমিরাল্টি কোর্ট থেকে পদচ্যুত করে। ফলে বোম্বেতে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৭২৬ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজের মেয়র আদালত স্বাধীনতা দাবি করলে আদালত ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ দূর করতে ব্রিটিশ রাজা ১৭৫৩ সালে একটি চার্টার জারি করেন। চার্টারের বিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়। ১৮৬১ সালে ভারতে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণা কিছুটা পাখা মেলতে শুরু করলেও তা উচ্চ আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সম্প্রতি আদালত, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের ত্রিভুজ বিরোধ তুঙ্গে। বক্তৃতা-বিবৃতি, পাল্টা চিঠি চালাচালি এবং আদালতে মামলা শুনানিকালে এ বিরোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বারবার। গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বিরোধ ক্ষোভ, রাগ, ক্রোধের পর্যায়ে চলে এসেছে। এর সঙ্গে আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো যুক্ত হয়েছে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়। আমি অ্যামিকাস কিউরিদের যুক্তির সারসংক্ষেপ দেখেছি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে ৯ জনের যুক্তি—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ বিষয়ে এক ও অভিন্ন। এর চেয়ে দুর্বল যুক্তি আর হতে পারে না। তাঁদের যুক্তি কিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ১৯৭২ সালে সংবিধানের মূলস্তম্ভ ছিল কি না? সংসদের হাতে অপসারণক্ষমতা যদি অসাংবিধানিক হয়, তাহলে এমন একটা অসাংবিধানিক বিষয় সংবিধানে জুড়ে দিয়ে সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতরা কেন জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন? ২০১৭ সালে এসে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদের কাছে অপসারণক্ষমতা যদি অসাংবিধানিক হয়, তাহলে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের জন্য অ্যামিকাস কিউরিরা পরামর্শ দিয়েছেন কি? সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে আদালত মৌলিক অধিকারবিরোধী ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন? আদালত তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। এর পরও নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, এ বিরোধ কোনোক্রমেই বাড়তে দেবেন না। আপিল বিভাগের বিচারক সংকট নিরসনে জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষার নীতি গ্রহণ ও বিচার বিভাগের ওপর বাজেট খড়্গ স্থাপন—কোনোটাই সঠিক হবে না। শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণ। নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের বিবেচনার জন্য আমি তিনটি বিষয় পেশ করছি—এক. ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) একদা এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভালোভাবে দেখেশুনে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন। অতঃপর ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে স্বীয় গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে লাগল। ওমর (রা.) কালবিলম্ব না করে সরাসরি বিক্রেতার কাছে ফিরে এলেন এবং তাঁকে বললেন, ‘তুমি তোমার ঘোড়া ফিরিয়ে নাও, এটা ত্রুটিযুক্ত। ’ বিক্রেতা বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আমি ঘোড়াটি ফেরত নেব না। কেননা আপনি তা সুস্থ ও সবল অবস্থায়ই আমার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন। ’ ওমর (রা.) বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে তোমার ও আমার মাঝে একজন বিচারক নির্ধারণ করো। ’ বিক্রেতা বললেন, ‘ঠিক আছে, কাজি শুরাইহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। ’ তাঁরা উভয়ই শুরাইহের উদ্দেশে রওনা হলেন এবং তাঁর কাছে পৌঁছে তাঁকে প্রকৃত ঘটনা বিবৃত করলেন। কাজি শুরাইহ ঘোড়ার মালিকের অভিযোগ শ্রবণ করে ওমর (রা.)-কে বললেন, ‘আপনি কি ঘোড়াটি সবল ও সুস্থ অবস্থায় কিনেছিলেন?’ ওমর (রা.) বললেন, ‘জি, হ্যাঁ। ’ বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক কাজি শুরাইহ ঘোষণা করলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি যা ক্রয় করেছেন তা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হোন অথবা যে অবস্থায় ঘোড়াটি গ্রহণ করেছিলেন, সে অবস্থায় ফেরত প্রদান করুন। ’ হকচকিত খলিফা মুগ্ধ দৃষ্টিতে কাজি শুরাইহের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ! এটাই তো ন্যায়বিচার। হে বিচারপতি! আপনি কুফায় গমন করুন। আমি আপনাকে কুফার প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দান করলাম। ’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ : ৯/২৫) দুই. ১৭৭৪ সালে কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্য তিনজন বিচারপতি রাজা নন্দকুমারের ওপর বিচারিক এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও ব্রিটেনের বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তৈরি জালিয়াতিবিরোধী আইন ব্রিটেন থেকে ভারতে আমদানি করে নন্দকুমারের ওপর প্রয়োগ করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সে থেকে নন্দকুমারের এ রায় দেশে-বিদেশে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তিন. ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হলেও মনের মাধুরী মিশিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্গঠনের জন্য আইন তৈরির চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের হাতেই রয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিরপেক্ষ আদালতের নিশ্চয়তা দেয় না। নিরপেক্ষতার সঙ্গে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি অনেক বিষয় জড়িত। আমাদের আদালতের নিরপেক্ষতা নানা সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবসহ ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা যায়, ছয়জন জ্যেষ্ঠ জেলা জজসহ ১৬ জন বিচারককে চাকরিচ্যুত এবং আরো প্রায় ৪৬ জন বিচারকের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্ত হওয়ার পর সম্ভাব্য চাকরিচ্যুতি এড়াতে আরো ছয়জন স্বেচ্ছায় অবসরে গেছেন। একাধিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কিছুসংখ্যক বিচারক ঘুষ দাবি করছেন এবং রায় দেওয়ার আগে কেউ কেউ মুঠোফোনে আসামির সঙ্গে কথা বলছেন। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির চূড়ান্ত ফলাফল পক্ষপাতমূলক আচরণ।

ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দ্রুত বিচার লাভ। এটি আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে। দ্রুত বিচার লাভের মাপকাঠিতে ন্যায়বিচার পরিমাপ করা হলে ন্যায়বিচার আমাদের ত্রিসীমানায় আছে কি না সন্দেহ। বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা শুধু ন্যায়বিচার নয়, অন্যান্য মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও অন্যতম কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেকেই অন্যায়-অপরাধের শিকার হয়েও শুধু দীর্ঘসূত্রতার ভয়ে বিচার চাওয়ায় নিরুৎসাহ হচ্ছে। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগসহ সব ধরনের আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৮। ইউএনডিপির পূর্বাভাস বলছে, ২০২০ সালের মধ্যে মামলার জট ৫০ লাখে দাঁড়াবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের বিচারকের অপ্রতুলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে যেখানে ৮৬ হাজার বিচারক রয়েছেন, সেখানে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে অনুমোদিত বিচারকের পদই আছে মাত্র এক হাজার ৬৫৫টি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ হাজার নাগরিকের বিপরীতে একজন এবং ভারতে ৬৭ হাজার নাগরিকের বিপরীতে একজন করে বিচারক কর্মরত। আর বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখ নাগরিকের বিপরীতে কর্মরত বিচারকের সংখ্যা মাত্র এক। বিচারকের স্বল্পতাই মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও মামলাজটের একমাত্র কারণ নয়। অধস্তন আদালতের বিষয়ে উচ্চ আদালত কর্তৃক গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, “বিচারকরা একতরফা মামলাগুলো নির্দিষ্ট দিনে শুনানি না করে কোনো কারণ ছাড়াই অথবা ‘কোর্ট অন্য কাজে ব্যস্ত’—এরূপ আদেশ লিখে দিনের পর দিন ফেলে রাখেন; যদিও ডায়েরি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কোর্টে আসলে ওই দিন উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। এমনও দেখা গেছে যে বাদী একতরফা শুনানির তারিখে দিনের পর দিন, এমনকি বছর ধরে সাক্ষীসহ উপস্থিত হন; কিন্তু কোর্টের ওই মামলার শুনানি হয় না। কখনো বা একতরফা মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলেও আদেশের জন্য তা মাসের পর মাস, এমনকি বছর ধরে পড়ে থাকে। ” উচ্চ আদালতের ২০১১ সালের এক পরিপত্রও সাক্ষ্য দিচ্ছে, ‘জেলা আদালতে আকস্মিক শুনানি মুলতবি একটি মস্ত ব্যাধি। প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধান নিম্ন আদালতের বিচারকরা বেশ বড় মাপেই লঙ্ঘন করে চলেছেন। এতে বলা হয়, আদালত তাঁর নিজ উদ্যোগে বা পক্ষগুলোর আবেদনক্রমে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে শুনানি মুলতবি করছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও বেশির ভাগ সময় ক্রমাগতভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ না করে শুনানি মুলতবি করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে একই সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতে একাধিক তারিখ ধার্য করা হয়। যে বিচারক সাক্ষ্য নেন, তিনি রায় দিতে পারেন না। এর ফলে বিচারপ্রার্থী জনগণ দুর্ভোগের শিকার হয়। ’ আমার পরিচিত একজনের নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে, ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে বাড়ি ফিরে পেতে উচ্চ আদালত পর্যন্ত নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ ৯ বছর লেগেছে। এতে তাঁর কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বাদই দিলাম। আদালতের কার্যবিধির অপব্যবহার করে কিভাবে মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যায় সে গল্প আমাকে শুনিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের বেশির ভাগ নির্ধারিত দিনে শুনানি না হওয়া বা শুনানি মুলতবির জন্য লেগেছে বলে তিনি জানান। উল্লেখ্য, কার্যবিধি আইনের অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না হলে এবং আইনজীবী ও পুলিশ থেকে সহযোগিতা না করা হলে শুধু বিচারকরা চাইলেই এ অবস্থা বদলাতে পারবেন না।

কর্নেল তাহেরের বিচারসহ কিছু ক্যাঙ্গারু আদালতের বিচার বাদ দিলে আমাদের আদালতগুলো প্রকাশ্য ও স্বচ্ছতার সঙ্গেই বিচারকাজ সম্পাদন করেন। যে আইনের দ্বারা বিচার করা হবে, সে আইনের ন্যায্যতা না থাকলে আদালতের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা সত্ত্বেও তা দিয়ে ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, একটি অন্যায্য আইনের উপস্থিতিই সন্ত্রাস। আমাদের কিছু আইন অন্যায্য, আর কিছু আইনের মধ্যে ন্যায়বিচারের ধারণাই পুরোপুরি অনুপস্থিত। আমি তিনটি উদাহরণ দিচ্ছি—এক. একজন মহিলার স্বামী খুন হলেন। স্বামীর সব সম্পত্তি বিক্রি করে বিচারের ব্যয় নির্বাহ করে সাত-আট বছর পর স্ত্রী তাঁর স্বামী হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ডের রায় পেলেন এবং রায় কার্যকরও হলো। সব সম্পত্তি মামলার পেছনে খরচ হয়ে যাওয়ায় তাঁর ও সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা তথা জীবনধারণের জন্য কোনো সংস্থান নেই। এ অবস্থায় ওই স্ত্রী মানসিক সান্ত্বনা ছাড়া আর কী ন্যায়বিচার পেলেন? আসামির সম্পদ বিক্রি করে ওই নারীকে কিছু অর্থ দেওয়ার বিধান থাকলে, নিদেনপক্ষে আসামির কাছ থেকে মামলার খরচের অর্থ উদ্ধারের বিধান থাকলে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে ভিখারি হতে হতো না। আগে গান শুনতাম, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, আর এখন লিখতে হবে, ‘ন্যায়বিচার মোরে নিঃস্ব করেছে’। দুই. অতিদরিদ্র ঘরের একজন মেয়েকে মধ্যবয়সী এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার প্রতি অবহেলা-অনাদর শুরু হলো। অবহেলা সহ্যসীমা অতিক্রম করায় মেয়েটি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিল। মামলা দায়েরের পর বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে নানা অজুহাতে কয়েক বছর চলে যাবে। এ সময় মেয়েটি মামলার খরচ, তার ও সন্তানের জীবনধারণের ব্যয় কিভাবে নির্বাহ করবে? এরূপ ক্ষেত্রে যা হয়, মেয়েটিকে পরামর্শ দেওয়া হবে স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা দিতে, যাতে স্বামী আপস করতে বাধ্য হয়। স্বামী মোহরানা ও ভরণ-পোষণের কিছু টাকা দিয়ে আপসে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাবে। এটি কি ওই নারীর জন্য ন্যায়বিচার? আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যা দিয়ে অনেক সময় ন্যায়বিচার করা যায় না। ন্যায়বিচারের জন্য বিচারকের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারসহ বেশ কিছু জটিল ও চ্যালেঞ্জিং মামলার বিচার করে আমাদের আদালত ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও সামগ্রিকভাবে ন্যায়বিচারের গন্তব্যে পৌঁছতে আমাদের যেতে হবে আরো বহুদূর। এসব চ্যালেঞ্জিং মামলার পেছনে নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ সাহস না জোগালে বিচারকরা কখনোই এ মামলার বিচারে উৎসাহী ও সাহসী হতেন না। এ কথা অনস্বীকার্য যে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতা ছাড়া আর যা-ই হোক, ন্যায়বিচারের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না কোনোভাবেই।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com

 


মন্তব্য