kalerkantho


জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার বিকল্প নেই

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার বিকল্প নেই

গণতন্ত্র নিয়ে উঠতে-বসতে আমরা নিজেরা যেমন অনেক কথা শুনি, আবার বলাবলিও করি। এসব শোনা ও বলার মধ্যে কতটা সারবাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে, কতটা অতিরঞ্জনের প্রভাব রয়েছে—সেই বিশ্লেষণের ধার খুব একটা ধারি বলে মনে হয় না। গণতন্ত্র সম্পর্কে একেবারে প্রাথমিক কিছু ধারণা স্কুল পাঠ্য বইয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের বেশি কোনো বই-পুস্তক থেকে পাওয়ার সুযোগ সবার ঘটে না। তবে স্কুল পর্যায়ের পাঠে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা মুখস্থ করে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার বেশি কোনো কাজে আসে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষায় কয়জন শিক্ষার্থীই এ নিয়ে বিশদ পড়াশোনা করে থাকে—তা জানার চেষ্টা করা হলে মনে হয় হতাশার চিত্রই বড় হয়ে ফুটে উঠবে। এ হচ্ছে বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের মধ্যে গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা লাভের বাস্তবতার একদিক। অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা বা ধারণা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, গণতন্ত্র সম্পর্কে যেটুকু শোনা ও বলাবলি, তার পুরোটাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া। দেশের সব কটি রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসী বলে দাবি করলেও তাদের বেশির ভাগ নেতাকর্মীই গণতন্ত্র সম্পর্কে গলাবাজি করার বেশি কোনো যোগ্যতা অর্জন করেছে—এমনটি জোর দিয়ে বলা যাবে না।

গণতন্ত্র সম্পর্কে তারা যেসব কথা বলে, তা শুনে মনে হয় গণতন্ত্র মানে হচ্ছে যার যা খুশি তা বলা বা করার অধিকার। তাহলে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গণতন্ত্রের কোনো আদর্শই মানে না, বোঝে না, কোনো অবদান রাখে না, নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার ফন্দিফিকির করে তার অধিকার থাকলে শেষ বিচারে গণতন্ত্রই আটকে থাকে, অগণতান্ত্রিক শক্তির বিস্তার ঘটে, প্রকৃত গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়—সেই প্রশ্নের কী উত্তর দেওয়া হবে? উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও তাহলে কেন গণতন্ত্রে যাদের আস্থা নেই, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় যারা বাধা বলে বিবেচিত হয়, তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়? ফ্যাসিবাদী, নািসবাদী, উগ্র জঙ্গিবাদী, হঠকারী—যেকোনো শক্তি বা অপশক্তির ব্যাপারে উন্নত গণতান্ত্রিক সব দেশই কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকে।

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র বিনষ্টকারী যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইন বেশ কঠোর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সেভাবেই তৎপর থাকে। বৃহত্তর জনগণ শিক্ষা ও সংস্কৃতিগতভাবে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা লাভ বা পোষণ করে থাকে, যা তাদের রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আদর্শ ও চরিত্রকে রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করে। একইভাবে দেশের রাজনীতিতেও উদারবাদী বনাম রক্ষণশীল—বড় মাপে দুই ধারাকে ধারণ করেই মূলধারার রাজনীতি পরিচালিত হয়ে থাকে। এর বাইরে বাম ও ডানের কিছু কিছু সংগঠন, তাদের সমর্থন লক্ষ করা যায়—যেগুলো সরকার গঠনে উদারবাদী বনাম রক্ষণশীলদের পাশে প্রয়োজনে দাঁড়ায়।

উন্নত দেশগুলো মূলত উদারবাদী বনাম রক্ষণশীল—এই দুই ধারার রাজনীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। উভয় ধারাই গণতন্ত্রের দর্শন ও সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী বলে দাবি করলেও উভয়ের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য সুস্পষ্ট। উদারবাদীরা অপেক্ষাকৃত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গড়তে বা পরিচালিত করতে চায়, কল্যাণবাদী অর্থনীতি ও সমাজনীতির প্রতি তাদের আস্থা অনেক বেশি। ঠিক বিপরীত অবস্থানে থাকে রক্ষণশীল দল ও তাদের সমর্থকরা। জাতীয়তাবাদ ও সম্প্রদায়গত বিরোধকে রক্ষণশীলরা রাজনীতিতে যতটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে, উদারবাদীরা তা করতে চায় না। দেশি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকট, টানাপড়েন, রাজনৈতিক উত্তেজনা, দেশের অভ্যন্তরে বেকারত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সংকট উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কমবেশি প্রভাব বিস্তার করে থাকে। নির্বাচনে বিষয়গুলো কখনো কখনো সরকার পরিবর্তনের ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। উদারবাদী দলগুলো ক্ষমতায় থেকে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয় তখন ভোটারদের একটি অংশ রক্ষণশীলদের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। রক্ষণশীলরা ক্ষমতায় গিয়ে যখন ওলটপালট কিছু করার চেষ্টা করে তখন আবার জনমত উদারবাদীদের দিকে হেলে পড়ে। তবে একটি বিষয় উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নিশ্চিত হয়ে গেছে, তা হচ্ছে উদারবাদী বা রক্ষণশীল যে দলই ক্ষমতায় আসীন হোক না কেন, তারা কেউই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মৌল চরিত্রকে বদলে ফেলার ও বিরোধী দলকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে না, করলে জনমত তাদের বিপক্ষে এতটাই চলে যাবে, যা সামাল দেওয়া ওই দল বা সমর্থকদের থাকে না। বিশেষত সমর্থকরা অন্ধভাবে দলের সব কিছু সব সময় মেনে নেয় না, প্রয়োজনে নতুন নামে সমর্থকদের দল গঠিত হয়, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষায় এগিয়ে আসে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা এভাবেই হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলে। এ ক্ষেত্রে জনগণ গণতান্ত্রিক, রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধিতে প্রায় সমান সমান।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এভাবেই গত দুই-আড়াই শ বছরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, বিশ শতকে এটি একটি মানে উন্নীত হয়েছে, নানা দেশি-বিদেশি ঝড়-ঝঞ্ঝার পরও একুশ শতকে উন্নত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বেশির ভাগই গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রাজনীতিকে অনুশীলনের মাধ্যমে যে যার মতো কাজ করে চলছে। ব্রিটেনের সঙ্গে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপীয় কোনো দেশ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ কোনো দেশেরই হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার এসব রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতন্ত্রের উদারবাদী ও রক্ষণশীল ধারার সঙ্গে লড়াই ও সহাবস্থান করেই এগিয়ে যাচ্ছে। সেসব রাষ্ট্রের জনগণ নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অনুযায়ী তাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে পছন্দ-অপছন্দ করে থাকে, নির্বাচনে জয়ী বা পরাজিত করে থাকে, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত করার জন্য বাছাই করে থাকে, সুযোগ দিয়ে থাকে, ব্যর্থ হলে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচিত করে থাকে। গণতন্ত্রের এমন নিশ্চয়তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রধানত ইউরোপীয় বেশির ভাগ দেশ, দুই আমেরিকার দেশগুলো, এশিয়ায় হাতে গোনা কয়েকটি দেশ, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকা মহাদেশে একমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকা। এখনো আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে নানামুখী সমস্যা বিরাজ করছে।

আরব ও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কিছুটা এগিয়ে আছে, তবে মুসলিম অধ্যুষিত বেশির ভাগ রাষ্ট্রব্যবস্থা রাজতান্ত্রিকতা এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে জর্জরিত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংকট আফ্রিকা মহাদেশের মতো এশিয়ায়ও প্রকট। গোত্র, সামরিক শক্তি, আদর্শহীন লুম্পেন, বুর্জোয়া শক্তি, জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়গত পশ্চাৎপদতা, বিরোধ, বিভাজন ও দ্বন্দ্ব বিশাল এ অঞ্চলগুলোর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রমেই রাজনীতিতে শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করে চলছে। ফলে এসব দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আদর্শের চর্চা তেমন একটা স্থান করে নিতে পারছে না। ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনে জাতিগত আবেগের স্ফুরণ কিছুটা ঘটলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি সবল করার ধারা রক্ষা করা যায়নি। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোও এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যত বেশি সক্রিয় ছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতা ততটা দেয়নি। বরং কোনো কোনো বড় রাষ্ট্রক্ষমতা জাতীয়তাবাদী এসব ত্যাগী নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা, হত্যা করা, ক্ষমতায় নিজেদের বশংবদদের বসানোর হীন ষড়যন্ত্র করেছে। ফলে বেশির ভাগ মুক্তিপ্রাপ্ত দেশ ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগত সংঘাত, সামরিক শক্তির শাসনে আটকে গেছে, গণতান্ত্রিক ধারা শুরু থেকেই বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক চরিত্র দানে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধান এবং সূচিত রাজনীতি চলার দীর্ঘ পথ মাড়িয়েই কেবল একটি রূপ লাভ করতে পারত। এর জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন ধৈর্য, মননশীলতা ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন ছিল, বহিঃশক্তির কাছ থেকেও কোনো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। কিন্তু দুই দিক থেকে সব কিছু ঘটেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। এর ফলে ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটানো হয়, যাতে বাংলাদেশকে রাজনীতির মূলধারা থেকে দ্রুত সরিয়ে নিতে ষড়যন্ত্রকারীগোষ্ঠী সক্ষম হয়। ১৯৭৫-এ ১৯৫৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হলো, কৃত্রিমভাবে জন্ম দেওয়া হলো নতুন রাজনৈতিক একটি দলের—যেখানে জড়ো হলো ডান-বামের প্রতিক্রিয়াশীল নানা গোষ্ঠী, যারা গণতন্ত্রের ‘গ’-তেও বিশ্বাস করার কোনো ঐতিহ্য অতীতে বা পরবর্তী সময়ে সৃষ্টি করেনি। তবে তারা যে বিষয়টি খুব সফলভাবে করতে পেরেছিল তা হচ্ছে—সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মান্ধতার বিস্তার ঘটিয়ে উঠতি রাজনীতির মাথা ভেঙে দিতে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে, অপপ্রচার, ভারতবিরোধিতা, ধর্মকে রাজনীতিতে অপব্যবহার করার সব আয়োজন সম্পন্ন করতে। বৃহত্তর জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, চর্চা, প্রতিযোগিতা এবং বিকাশের পথ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়গুলো শুরুতে রুদ্ধ করে দেওয়া হলো। ফলে বেশির ভাগ মানুষই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতাদর্শগত লড়াই, দ্বন্দ্ব এবং স্মরণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে তেমন একটা স্বচ্ছ ধারণা রাখার সুযোগ পায়নি। আর উগ্র, হঠকারী, সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, লুটেরা ও লুম্পেনগোষ্ঠী স্থানটি দখল করে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। এসবের মূল্যায়ন করাও অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

গণতন্ত্র সম্পর্কে এসব অপশক্তি কিছু বিমূর্ত ধারণা ও বিতর্কের বেশি কোনো আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক জনসচেতনতার ধারে-কাছেও যাওয়ার সুযোগ রাখেনি। অথচ গণতন্ত্র একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক রাজনৈতিক ধারণা, যা একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রকে পাল্টে দিতে পারে, মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান উন্নত করার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে। রাষ্ট্র-রাজনীতির এমন অভিজ্ঞতা এবং সুনির্দিষ্ট কর্মযজ্ঞ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়া যায় না। সে ধরনের বিধি-বিধান ও সংস্কৃতি দ্বারা পরিচালিত দল ও রাজনীতি ছাড়া শুধু নির্বাচন দিয়ে সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা শেষ বিচারে পশ্চাত্মুখী রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে ঘেরাটোপে আটকে যাওয়া ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারে না। বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে এক কদম এগিয়েছিল ১৯৭২ সালে; কিন্তু ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে পেছাতে পেছাতে তা এখন দশ-বিশ কদম দূরে চলে গেছে, সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে অগ্রসরমুখী করা, নিদেনপক্ষে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি মোটেও এগোবে না, যদি আমরা বৃহত্তর জনগণকে গণতন্ত্রের বিশ্বজোড়া সার্বিক চিত্রটি সম্পর্কে সচেতন করার দায়িত্ব পালন না করি, প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোও তা পালন করার উদ্যোগ গ্রহণ না করে।

সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র ডান-বাম মতাদর্শের বেড়াজালে যেভাবে আটকে আছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, তা থেকে বের না হতে পারলে পাঁচ বছর পর পর দেশে নির্বাচন হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দুরূহ কাজটি তাতে মোটেও অগ্রসর হবে না, বরং পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এই কাজটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক, গণমাধ্যম, সামাজিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী পালন না করার কারণে গণতন্ত্রের নামধারী অগণতান্ত্রিক, গণতন্ত্রবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নানা অপশক্তি বাংলাদেশে ধর্ম, ভারতবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা, অপপ্রচার ইত্যাদিকে সম্বল করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানি ও ইতালি উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা ছড়িয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন দেশে দেশে ছড়িয়েছে। জার্মানি, ইতালি, জাপানই শুধু ভয়াবহ সেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি, সভ্যতাও প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল। উগ্র রাজনীতির শেষ পরিণতি এমনই করুণ ও বিষাদময় হয়েছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ অনেক দেশই জঙ্গি মতাদর্শিক ও রাজনীতির মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের শিকার, বাংলাদেশ তা থেকে খুব বেশি দূরে নেই। এখান থেকে মুক্ত হতে হলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কেননা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ও বিকাশ মোটেও গোপন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে এবং বিপক্ষে দ্বন্দ্ব-বাস্তবতায় হাঁটছে, সামান্য অসচেতনতায়ই মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে এখানে। গণতন্ত্রের প্রতি সচেতনতাই এমন পরিস্থিতিতে জয় নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com

 


মন্তব্য