বর্তমান নিবন্ধটি এক নাতি ও তার ‘পাতানো’ নানিকে নিয়ে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে একটি শিশু; আমাদের প্রতিবেশীর ছেলে ফারজিন এই গল্পের ‘নায়ক’। আপাতত তাকে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সব শিশুর প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে, যদিও এমন সরলরৈখিক সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা আছে। বলা বাহুল্য, শিশুর প্রতি চরম ভালোবাসা থেকে বর্তমান গল্পের উত্পত্তি। শিশু নিয়ে অনেক মনীষী অনেক কথা বলেছেন, যেমন—‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুর অন্তরে’, প্রতিটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয় এই বার্তা নিয়ে যে পরম করুণাময় এখনো মানুষের প্রতি রুষ্ট নন; শিশু যিশুর মতো বা ফেরেশতাতুল্য, ‘যে শিশুর কান্না-হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে’ ইত্যাদি। দুই. পৃথিবীর অন্যান্য নিষ্পাপ শিশুর মতো একটা চরিত্র ফারজিন। এরই মধ্যে আমাদের ফেসবুক ফ্রেন্ডসদের কাছে ‘লিটল নেইবার’ হিসেবে তুমুল ‘জনপ্রিয়’। এবং তা-ও এমন মাত্রায় যে কোথাও গেলে প্রথমেই তাকে নিয়ে এক গাদা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—কেমন আছে, সে আপন না পর, সঙ্গে করে আনা হলো না কেন প্রভৃতি। কথিত শিশুটির বয়স বড়জোড় দুই থেকে আড়াই বছর; স্বভাবে খুব চটপটে ও চঞ্চল। চটপটে ও চঞ্চল স্বভাব শিশুর সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। তা ছাড়া আরো কিছু কারণে সে আমাদের মন কেড়ে নিয়েছে। ফুটফুটে চেহারা ও ফুরফুরে মন তো আছেই, তার ওপর কাঁদে খুব কম, হাসিমুখে ঘরময় ঘুরে বেড়ায়; জিনিসপত্র তছনছ করার শিশুসুলভ মরিয়া ভাব তার মধ্যে খুব একটা লক্ষ করা যায় না। সে সবার কোলে যায়, সবার গালে চুমু খায়। বাসায় অপরিচিত মেহমানের সামনে চুপচাপ স্পিকটি নট। অথচ মেহমান বিদায় হওয়ার পর স্বরূপে আবির্ভূত হয় যেন দুই হাজার ২০০ বর্গফুট রাজ্যের রাজা সে। শিনা টান করে জানান দেয়; ‘এতা আমার বাসা’। তিন. শিশুর সাহচর্য সর্বত্র সৌভাগ্যের সূত্র। সে অর্থে আমাদের কাছেও। কথায় আছে, এদের শরীরের গন্ধে নাকি স্বর্গীয় স্বাদ থাকে। শিশুকে কাছে পেয়ে অশীতিপর অসুস্থ দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির চোখের কোণে জল জমে, ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায়। ‘পটলকুমার গানওয়ালা’ সিরিয়ালে দেখি শিশু পটলের গান শুনে হাসপাতালের ওয়ার্ডে সব রোগী যেন প্রাণ ফিরে পায়। এসব ঘটনা ইঙ্গিত করে যে শিশু হচ্ছে এক ধরনের ‘দাওয়াই’। আলোচিত শিশু ফারজিন আমাদের পরিবারে ওই ধরনের ‘দাওয়াই’। সকাল-সন্ধ্যা এমনকি রাত-বিরাতে আগন্তুক আমাদের এই ‘নিয়মিত অতিথি’ অক্সিজেনের মতো। পানি ছাড়া যেমন মাছ ছটফট করে, আজকাল ফারজিনকে এক পলক না দেখলে আমরাও হা-পিত্যেশ করি। ওকে কাছে পেলে গৃহকর্ত্রী অর্থাৎ ওর পাতানো নানিমার পিত্তে পানি পড়ে; বহুমূত্র রোগ-তাড়িত খিটখিটে মেজাজটা একটু হালকা হয় এবং সেই সুবাদে আমরাও রেহাই পাই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সারা দিন নানিমার পাশে থেকে সে শুধু তার নিঃসঙ্গতা দূর করে না, নানিমাকে বহু ধরনের সেবাও দিয়ে থাকে, যেমন—ফ্রিজ থেকে নানিমার জন্য ইনসুলিন বের করা, অন্য ওষুুধপত্র ও পানির জোগাড়যন্ত্র করা ইত্যাদি। মোট কথা, ইদানীং আমাদের বাসায় প্রায় সব বেদনানাশক ওষুধের নাম ফারজিন। আর তাই বোধ হয় চাকরিরত দুই মেয়ে ঈশিতা ও এলিজা মোবাইল ফোনে অথবা ঘরে ঢুকেই প্রথম ফারজিনের খোঁজ করে। তারপর অন্যদের। ঘরে এখন ফারজিন ফার্স্ট, অন্য কিছু সেকেন্ড। শিশুটির কারণে আজি আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে তো বটে, এমনকি আরো বেশি আমাদের সংসারে। চার. ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। সবার হাসি-আনন্দের উৎস হলেও ফারজিন কিন্তু আমার গবেষণার ‘গিনিপিগ’ হয়ে থাকছে। ওর খাওয়াদাওয়ার, এমনকি নাওয়ার, বেশির ভাগ কাজটি আমাদের বাসায় ঘটে বলে মাঝে মাঝে পুরু লেন্সের চশমায় অনেক কিছু লক্ষ করি। ফারজিনের খাওয়া ও ঘুম পাড়ানোর প্রক্রিয়ায় বেশ বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছে এবং অনুমান করি সেটা অন্য শিশুদের বেলায়ও সত্য। শিশুকে খাওয়া ও নাওয়াতে গেলে আগে সনাতন দেহ ও শব্দনির্ভর কৌশল অবলম্বন করা হতো। কোলে নিয়ে ছড়া বলা, কাঁধে নিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটাচলা ইত্যাদি। সময়ের বিবর্তনে দেখা যায় আজকাল আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলে একই কাজ করা হয়। এই বিবর্তন ভালো না মন্দ সে বিতর্ক আপাতত বাহুল্য। ধরা যাক যে শিশুরা চাঁদ খুব পছন্দ করে, আর তাই ফারজিন খাবার খেতে না চাইলে চাঁদ দেখানোর চিরাচরিত টোপ ফেলা হতো এবং তা বেশ কার্যকর ছিল। দেখা গেল, এই কৌশল বেশ কিছুদিন কাজ করার পর আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। এবার আমার মেয়েরা শুরু করল কাঁখে ফারজিন ও হাতে ভাতের থালা নিয়ে ডাইনিং চত্বরে চক্কর দেওয়া এবং দেয়ালে টাঙানো ছবি দেখিয়ে ওকে বশে আনার চেষ্টা। দুই-এক সপ্তাহ ভালো কাটার পর এ পদ্ধতিও ভোঁতা হয়ে পড়ল। এখন শিশুটি কোলে ওঠে, দেয়ালের ছবি দেখে এবং ঘরময় ঘুরতে পছন্দ করে, কিন্তু খাবার মোটেও মুখে নিতে চায় না। কী জ্বালা! অথচ তাকে যে খাওয়াতেই হবে, কেননা চারদিকে চাউর হয়ে গেছে যে বাচ্চাটা আমাদের কথা শোনে এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণে খেয়েদেয়ে ঢের ভালো আছে। তা ছাড়া এ জন্য এরই মধ্যে বেশ বাহবা কুড়িয়েছি, ফেসবুকে লাইক পেয়েছি। কিন্তু এ মুহূর্তে চোখের সামনে দেখছি ক্রিকেটের উইকেট পড়ার মতো ফারজিনের নানিমা ও আন্টিদের উদ্ভাবিত সব কৌশল একটার পর একটা কুপোকাত। যাই হোক, অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে এবার ভালোবাসার শিশুটির হাতে টিভির রিমোট কন্ট্রোল তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা আঁটা হলো এবং শেষ পর্যন্ত টিভি দেখার ফাঁকে ফাঁকে মুখে খাবার গুঁজে দেওয়ার মহাপরিকল্পনাও সফল হলো। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সে সফলতা অনেকটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সাফল্যের মতো হঠাৎ ওঠে, হঠাৎ উবে। কিছুদিনের মধ্যে বাসার সবাইকে হতাশার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে ফারজিনকে খাওয়ানোর সদ্য আবিষ্কৃত আধুনিক প্রযুক্তিটিও মুখ থুবড়ে পড়ল, অর্থাৎ সে কোনো খাবার মুখে নিতে চায় না। শুধু টিভির দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে চায়। শুধু কী তাই? পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করল এই অর্থে যে আগে খাবারের থালা দেখলে সে মুখটা ঘুরিয়ে নিত, এখন কুপিত হয়ে দাঁত খিটিয়ে খামচি মারে! নানিমা মনে করেন এটা ভেরি ডেনজারাস মুড! পাঁচ. শিশুটিকে খাওয়ানোর পদ্ধতির কার্যকারিতা ও তার কম খাওয়ার পরিণতি নিয়ে নানা গুঞ্জন শুনতে পেলাম। নানিমা ও আন্টিদের কপালে ভাঁজ স্পষ্টত লক্ষণীয়। চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য এ রুমে সে রুমে ব্রেইন স্টরমিং সেশনও শুরু হলো। মাঝেমধ্যে সমস্যার সমাধানে কনসালট্যান্ট হিসেবে থাকছে বড় জামাই এবং ওর নিরাপত্তারক্ষী মনিরা। বোঝা গেল সবার মত মোটামুটি এই যে যেভাবেই হোক ফারজিনকে খাওয়াতে হবে এবং শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে এযাবৎ অপরীক্ষিত পদ্ধতিটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সেটা হলো, মোবাইল ফোনে ওর খুব প্রিয় গানটি বাজানো, যার জন্য সে প্রায়ই নানার কাছে বায়না ধরে। ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ।’ সদ্য আবিষ্কৃত পদ্ধতিটা বেশ ভালো। মোবাইলে গান বাজাবেন নানা, নানিমা ডিভানের উঁচু হাতলের ওপর তাকে ধরে বসাবে, ছোট আন্টি নিজ হাতে খাওয়াবে। আর সে শুধু কষ্ট করে হাঁ করবে। নতুন প্রযুক্তির এই প্যাকেজের আওতায় ফারজিন এক ঢিলে তিন পাখি মারতে শুরু করল—গান শোনা, ছবি দেখা ও খাবার খাওয়া। নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখে তো তার প্রিয় নানিমা, আন্টি সবাই মহাখুশি, যাকে বলে খুশির মহাপ্লাবন! কিন্তু কথায় আছে, আশার অন্য পিঠে হতাশা থাকে, সুখের বিপরীতে থাকে দুঃখ। সবাইকে হতাশ করে কিছুদিনের মধ্যেই শিশু ফারজিন জেদ ধরে বসল। মোবাইলে ছবিসহ গান শোনাতে হবে। কিন্তু ভাত খাওয়ানো যাবে না। শুধু তা-ই নয়, ইদানীং সে খামচিতে এতটাই পারদর্শী হয়ে উঠেছে যে ভাতের নলা মুখের সামনে ধরার ঝুঁকি পর্যন্ত কেউ নিতে চায় না। মোট কথা, সবাইকে সম্পৃক্ত করে উদ্ভাবিত নতুন পদ্ধতির যৌথ মহড়া অকালেই মাঠে মারা গেল। ছয়. কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না—ফেইলিওর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস। যে করেই হোক ফারজিনকে খাওয়াতে হবে, কারণ তার নানিমা এরই মধ্যে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন যে ফারজিন আমাদের বাসার খাবার খেতে খুব পছন্দ করে; ওর খাওয়াদাওয়া ও নাওয়া পুরো আমাদের নিয়ন্ত্রণে; সে আমাদের ছাড়া কিছুই বোঝে না। চারদিক থেকে এত প্রশংসা পাওয়ার পর এখন নেগেটিভ বলব কোন মুখে? অতএব ওকে খাওয়ানো স্রেফ প্রেস্টিজ ইস্যু—যে প্রেস্টিজ ইস্যুতে কোনো আপস হয় না। ওকে খাওয়াতেই হবে—কাম হোয়াট মে। সাত. এবার উপায়ান্তর না দেখে শিশুটির মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সর্বশেষ পদ্ধতি ‘আমদানি’ করা হলো তার মা-বাবার কাছ থেকে। সেটা হলো, ভিডিও গেমসসহ মোবাইল সেট সম্পূর্ণ ওর হাতে তুলে দেওয়া হবে। তার ইচ্ছামতো সে ভিডিও গেমস দেখবে, গান শুনবে, ছবি দেখবে এবং ‘দয়া’ হলে মুখে খাবার নেবে। এমন একটা অবৈজ্ঞানিক ও অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে নাকি আজকাল শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। বিশেষত শহুরে সচ্ছল পরিবারে। দেখছি, বিছানায় দুই পা ছড়িয়ে আমাদের সবার প্রিয় শিশু মোবাইলে গভীর মনোযোগ, ঘাড় নিচু করে ভিডিও দেখছে আর নানিমা অথবা আন্টি ঝোপ বুঝে কোপ মারছে। তবে এখানে একটা শর্ত জুড়ে দেওয়া ছিল—খেতে না চাইলে কিংবা শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে দেওয়া সুযোগ কেড়ে নেওয়া হবে। অর্থাৎ নিউটনের সূত্র, প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীতে সমান প্রতিক্রিয়া আছে—ফারজিনের নানিমা শুধু সেই সূত্র বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। আট. সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, মোবাইল হাতে মুখে ভাত, পদ্ধতি করেছে বাজিমাত। নানিমা, এমনকি ফারজিনের মা-বাবাও নাকি এখন খুশিতে টগবগ। নানিমা তো এত খুশি যে সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ছড়া ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে আওড়ান; ফারজিন ফারজিন, দুষ্টুমি দিন দিন? আয় বেবি দেখে যা, দুমুঠো খেয়ে যা! করিস নাকো উত্পাত, খেয়ে যা ভাজি-ভাত! মোবাইল হাতে নানিমা, দেখাবেন সিনেমা। বাসার সবাই এখন, করে হা-হা-হা। লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়