kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

সৃষ্টিজগতে আল্লাহর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সৃষ্টিজগতে আল্লাহর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ

২. আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে স্তম্ভ ছাড়া আকাশমণ্ডলী স্থাপন করেছেন, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন।

তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মাধীন করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে। তিনি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিষয়ে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পারো। [সুরা : রাদ, আয়াত : ২ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, আরশে পাকে সমাসীন হয়ে মহান আল্লাহ এই পৃথিবীর সব কাজ পরিচালনা করেন। বিশ্বকে সৃষ্টি করার পর তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাননি, বরং নিজের সৃষ্ট বিশ্বজাহানের শাসন কর্তৃত্বের আসনে তিনি সমাসীন হয়েছেন। এ সৃষ্টিজগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল এতটুকুই নয় যে তিনি একসময় একে সৃজন করেছেন, বরং বিশ্বচরাচর সর্বক্ষণ তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই আয়াতের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীতে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য ও সার্বভৌমত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

বর্তমান পৃথিবীতে ‘সার্বভৌমত্ব’ সম্পর্কে যে ধারণা প্রচলিত, ইসলামের সার্বভৌমত্বের ধারণা তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামের দৃষ্টিতে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।

তাঁর এ ক্ষমতায় কোনো অংশীদার বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনিই মৌলিক আইনের উৎস এবং সব ক্ষমতার আধার। যেহেতু আল্লাহ তাআলা এ সৃষ্টিজগতের প্রভু, মালিক, প্রতিপালক ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী, তাই তাঁর বান্দাদের জীবনযাত্রার নিয়ম-কানুন নির্ধারণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাও তাঁর। মানবজীবনের বর্তমান দুর্যোগ-দুর্দশার একমাত্র কারণ হলো, মানুষ নির্বোধের মতো সার্বভৌম আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘স্বাধীন’ হওয়ার চেষ্টা করছে।

ইসলামে সার্বভৌমত্বের ধারণা অত্যন্ত স্পষ্ট। এ ধারণার মূলকথা হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো দেশের অধিবাসীরাই দেশের প্রকৃত মালিক নয়, বরং মহান আল্লাহই হচ্ছেন পৃথিবীর প্রকৃত মালিক। আকাশ ও পৃথিবী তিনি নিজ ক্ষমতাবলে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির ওপর তাঁর একচ্ছত্র মালিকানা, কর্তৃত্ব ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অবিভাজ্য ও অংশীদারহীন। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তুমি কি জানো না, আসমান ও জমিনের সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহরই?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০৭)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর ইলাহ বা উপাস্য। ’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৮৪)

আরেক আয়াতে এসেছে, ‘মহিমান্বিত সেই সত্তা, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর করায়ত্ত। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। ’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১)

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, স্থূল দৃষ্টিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি ‘আল্লাহ তাআলা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী’—কথাটি শোনার পর ধারণা করতে পারে, ইসলাম মতে রাষ্ট্রে মানবীয় আইন প্রণয়ন করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এখানে আইনদাতা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আর মুসলিমদের কাজ হচ্ছে কেবল আল্লাহর প্রদত্ত আইনের আনুগত্য করে যাওয়া। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, ইসলাম মানুষের আইন প্রণয়নকে চূড়ান্তভাবেই নিষিদ্ধ করে দেয়নি, বরং তাকে আল্লাহর আইনের প্রাধান্যের দ্বারা সীমাবদ্ধ করে দেয়। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনশীল প্রয়োজনাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে সামঞ্জস্যশীল আইন প্রণয়নের অধিকার ইসলাম মানুষকে দান করেছে। স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামের মূলনীতি চারটি—কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। এর মধ্যে ইজমা ও কিয়াস হলো যুক্তি ও গবেষণানির্ভর। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে কোরআন ও হাদিস অবতীর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়; কিন্তু নিত্যনতুন যুগজিজ্ঞাসার জবাবে ইজমা ও কিয়াস তথা চিন্তা ও গবেষণার দরজা কিয়ামত পর্যন্ত খোলা।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য