kalerkantho


রাস্তার খাবার খেয়ে জীবন বিপন্ন করবেন না

মুনীরউদ্দিন আহমদ

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রাস্তার খাবার খেয়ে জীবন বিপন্ন করবেন না

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর স্কুলপড়ুয়া ছেলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে তার স্কুলের সামনে ফুচকা খেয়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে ডায়াগনসিসে ধরা পড়ে সে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত এবং এ মারাত্মক অসুস্থতার কারণ রাস্তায় বিক্রীত দূষিত ফুচকাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক অস্বাস্থ্যকর খাবার। উদয়ন স্কুলের পাশেই আমার বাসা হওয়ার সুবাদে আমি প্রায়ই লক্ষ করি, স্কুলের সামনে কী হারে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা দূষিত আচার, ঝালমুড়ি, পাপড়, ফুচকাসহ হরেক পদের খাবার নামের অখাদ্য দেদার বিক্রি হচ্ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে অসংখ্য শিশু-কিশোর বিনা বাধায় এসব নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে খাচ্ছে। এমনকি মা-বাবারাও শিশুদের এসব খাবার কিনে দেন এবং নিজেরাও খান। তাঁরা একটুও ভাবেন না এর পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে। শুধু উদয়ন স্কুলের কথা বলি কেন! বাংলাদেশের সব স্কুলের সামনে গেলে এই মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে পড়বে। সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষ কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি করার অনুমতি দেয় বা দিচ্ছে, তা আমার বোধগম্য নয়। সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি বন্ধ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। রাস্তায় তৈরি ও পরিবেশিত খাবারকে স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার বলা হয়। এসব খাবার বিদেশেও স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার হিসেবে পরিচিত।

উন্নত দেশের স্ট্রিট ফুড স্বাস্থ্যসম্মত, উপাদেয় ও আকর্ষণীয় হয়। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে রাস্তায় যেসব খাবার তৈরি ও বিক্রি হয় তা বিশুদ্ধ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। খেতে উপাদেয় বা মুখরোচক হলেও এসব স্ট্রিট ফুড অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত এবং পরিবেশিত হয় বলে বিভিন্ন জটিল ও মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। ঢাকার প্রায় সব খাবারের দোকানে খাবার খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত অবস্থায় তৈরি, বিক্রি ও সাজিয়ে রাখা হয়। তাই এসব খাবার পোকা-মাকড়, মাছি দ্বারা দূষিত হয়। সাধারণত সস্তা, তৈলাক্ত ও ঝাল হওয়ার কারণে রাস্তার খাবারের বেশ কদর রয়েছে। এজাতীয় খাবার খেলে মানুষ যেসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, আলসার, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদি।  

এসব রোগের মধ্যে হেপাটাইটিস অত্যন্ত ভয়ংকর হতে পারে। হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ অসতর্কতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব। লিভারের প্রদাহকে হেপাটাইটিস বলা হয়। হেপাটাইটিস বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। সাধারণত হেপাটাইটিস পাঁচ ধরনের—হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’। হেপাটাইটিসের মূল কারণ হেপাটাইটিস ভাইরাস। তবে অন্য কোনো সংক্রামক রোগ, অ্যালকোহল, দূষিত খাবার, কিছু বিশেষ ওষুধ ও বিষাক্ত দ্রব্য হেপাটাইটিস সৃষ্টি করতে পারে। হেপাটাইটিস ভাইরাস পাঁচ রকম এবং এসব ভাইরাসের নামের ওপর ভিত্তি করেই হেপাটাইটিসের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। দু-একটি হেপাটাইটিস ভারাইরাস অত্যন্ত ভয়ংকর হতে পারে এবং এগুলো লিভারের ক্ষত সৃষ্টি করা ছাড়াও সিরোসিস বা ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস সংক্রমণের কারণে লাখো মানুষ লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ সাধারণত দূষিত খাবার খাওয়া এবং পানীয় পান করার কারণে সৃষ্টি হয়। শরীরের দূষিত রক্ত বা তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে সৃষ্টি হয় হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’। এসব রোগ ছড়ায় সাধারণত দূষিত রক্ত বা রক্তজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ বা প্রদানের মাধ্যমে। বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতিতে ব্যবহৃত দূষিত মেডিক্যাল যন্ত্রপাতিও ভয়ংকর হেপাটাইটিসের কারণ হতে পারে। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগী কর্তৃক ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুই, শেভিং রেজর বা অন্যান্য জিনিস ব্যবহার করা ঠিক নয়, যা মানবদেহের রক্ত বা শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে আসতে পারে। দাঁত পরিচর্যায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত করা না হলে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে জন্ডিস (চোখ ও গায়ের চামড়ার হলুদ বর্ণ ধারণ করা), গাঢ় মূত্র, অসম্ভব আলস্য, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া ও পেটের যন্ত্রণা অন্যতম।

হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর মলে বিদ্যমান থাকে। এ ভাইরাস খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে অন্য দেহে প্রবেশ করে মানুষকে আক্রান্ত করে তোলে। কোনো কোনো যৌনমিলনের কারণেও এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। উপসর্গ স্বাভাবিক হলেও অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ‘এ’ ভয়ংকর হয় না, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ভাইরাস ভয়ংকর হতে পারে এবং মানবদেহে প্রবেশ করে জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে। যেসব দেশে স্যানিটেশন পদ্ধতি উন্নতমানের হয় না এবং অস্বাস্থ্যকর ও দূষিত খাবারে মানুষ বেশি অভ্যস্ত, সেসব দেশে হেপাটাইটিস ‘এ’-এর প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাসও দূষিত খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’-এর প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। হেপাটাইটিস ‘এ’ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা পাওয়া যায়। ১২ বছরের বেশি বয়স্ক সবাইকে হেপাটাইটিস ‘এ’ ভ্যাকসিন প্রদান বাধ্যতামূলক করা বাঞ্ছনীয়। এ রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য উন্নত বিশ্বের পর্যটকদের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভ্রমণের সময় টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং অনুন্নত দেশে সালাদসহ দূষিত খাবার ও পানীয় বর্জনের ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক সময় কাঁচা মাছ ও শাকসবজি খাওয়ার কারণেও হেপাটাইটিস ‘এ’ হতে পারে। তাই সব খাবার ভালো করে ধুয়ে রান্না করা উচিত।

বাসার কাজের ছেলে, মেয়ে বা বুয়াদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে প্রত্যেকের নজর দেওয়া দরকার। তাদের জন্য আলাদা সাবানের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। গৃহকর্মীদের প্রতিবার টয়লেট বা পায়খানা ব্যবহার করার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ও পা পরিষ্কার করে ধুয়ে নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন গৃহকর্মীদের তৈরি করা সালাদ,  ফলমূল, খাবার ও দূষিত পানীয় খেয়ে পরিবারের সবাই হেপাটাইটিস ও অন্যান্য ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ পদের রাস্তার খাবার পাওয়া যায়। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে শিঙাড়া, সমুচা, ছোলা ভাজি, বেগুনি, আলুর চপ, ডালপুরি,  ফুচকা, চটপটি, বেলপুরি, পাকুড়া, হালিম, ঝালমুড়ি, জিলাপি, লেবুর শরবত, আখের রসসহ বিভিন্ন ফলের জুস। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক পলাশী বাজারে রাস্তায় তৈরি অস্বাস্থ্যকর লাচ্ছি খেয়ে মরতে বসেছিলেন। কারণ ছিল হেপাটাইটিস। তিন মাস ঘরে বন্দি থেকে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এ ছাড়া বাড়তি খাবার হিসেবে থাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলু সিদ্ধ, স্যুপ, পোড়া পেঁয়াজ ও মরিচ, সালাদ, নুডলস ও হরেক রকম মিষ্টান্ন। রাস্তার খাবারের পুষ্টিগুণ থাকে অতিসামান্য এবং শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব থাকে অতিবেশি। এসব রাস্তার খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, টোকাই, ছিন্নমূল মানুষ, হকার, ছোট ব্যবসায়ী, শিশু, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক, গরিব ও অশিক্ষিত নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের কোনো স্বাস্থ্যসচেতনতা নেই। স্কুলপড়ুয়া ছোট শিশুরাও এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খায় এবং প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় মা-বাবারাও তাঁদের সন্তানদের এসব খাবার কিনে দেন এবং খেতে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর আচার ও অজানা-অচেনা ব্র্যান্ডের আইসক্রিম শিশুদের অতিপ্রিয়। কিন্তু ক্ষতিকর এসব খাবার শিশুদের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ, ঘরের বাইরে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবার খাইয়ে আপনাদের শিশুদের জীবন বিপন্ন করবেন না। শিশুরা অবুঝ বলে হয়তো অস্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করে ও খায়। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা কিভাবে নিশ্চিন্তে-নির্দ্বিধায় এসব খাবার প্রতিনিয়ত খেয়ে চলেছে, তা আমার বুঝতে কষ্ট হয়। অনেক ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, সস্তা ও উপাদেয় বলে তারা এসব রেডিমেড খাবার খায়। সস্তায় নাশতার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার কারণেও তাদের রাস্তার খাবার খেতে হয়। কথা হলো, সস্তা ও উপাদেয় হলে খাবার স্বাস্থ্যহানির কারণ হবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? সস্তায় খাবার খেতে গিয়ে স্বাস্থ্যের তিন অবস্থা হলে তখন বিপদ সামলাবে কে? প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, একটু চিন্তা করো আর একটু স্বাস্থ্যসচেতন হও। তাহলে জীবন সুন্দর হবে, বিপন্মুক্ত হবে।

রাস্তায় খাবার তৈরি হয় মূলত আটা, ময়দা, বেসন,  মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি ও তেল দিয়ে। দিনের পর দিন একই তেল ব্যবহার করা হয় বলে তা পুড়ে যায় এবং ট্রান্স ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। এ তেল  হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক সৃষ্টি করে। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন কাপড়চোপড় পরে ময়লা ও জীবাণুযুক্ত হাতে রাস্তার খাবার তৈরি করা হয় বলে এসব খাবার খাওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার খাবার তৈরিতে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় দূষিত পানি। খাওয়ার পানিও বিশুদ্ধ থাকে না। ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা হয় না বলে পানিতে ই. কোলাই ও প্রটিয়াস বেসিলাস-জাতীয় জীবাণু থাকে। যেসব থালা-বাসন বা পাত্রে খাবার পরিবেশিত হয়, সেগুলোতে প্রায়ই ক্ষতিকর জীবাণু থাকে। এসব জীবাণুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অ্যাপেডারমিডিস ও  সালমোনেলা প্রজাতির জীবাণু। রাস্তায় তৈরি বিভিন্ন ফলের রসে থাকে অসংখ্য জীবাণু। যেসব যন্ত্রপাতি বা আনুষঙ্গিক ব্যবহার্য দিয়ে ফলের রস তৈরি করা হয় এবং যেসব গ্লাস বা পাত্রে তা পরিবেশিত হয়, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ময়লা ও জীবাণুতে ভর্তি থাকে। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে বারবার একই গ্লাস ধোয়া হয়। তবে কোনো কোনো খাবার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি ও বিক্রি হয়। এর সংখ্যা অবশ্য অতিনগণ্য। রাস্তায় তৈরি খাবারে অনেক সময় নিষিদ্ধ উপকরণ ও রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন শহরে তৈরি খাবারের মধ্যে মেটানিল ইয়েলো, কমলা রং ২, রোডামিন বি, অরোমিন অরেঞ্জ জি-জাতীয় নিষিদ্ধ রঙের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। খাবারকে আকর্ষণীয় করার জন্য অনেক বিক্রেতা বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং পর্যন্ত ব্যবহার করে থাকে। রাস্তায় তৈরি কোমল পানীয়তে অনেক সময় আলকাতরার রংও ব্যবহৃত হয়। এসব খাবারে আরো থাকে তামা, লৌহ ও সিসার মতো ভারী ধাতু, যা শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

শীতকাল এলে রাস্তায় তৈরি খাবারের ধরন পাল্টে যায়। শীতকালে উল্লিখিত খাবার ছাড়াও তৈরি ও বিক্রি হয় হরেক রকম উপভোগ্য পিঠা। এ পিঠার মধ্যে সবচেয়ে  উল্লেখযোগ্য হলো ভাপা পিঠা, পোয়া পিঠা ও চিতই পিঠা। চিতই পিঠার সঙ্গে থাকে নানা রকম ঝাল চাটনি, গাঢ় আখের রস বা গুড়। খেতে সুস্বাদু হলেও এসব খাবারও তৈরি হয় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। যারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে তাদের পরিধেয় কাপড়চোপড় ও হাত থাকে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। যে হাতে টাকা আদান-প্রদান করে, সেই একই হাত দিয়ে তারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে। এতে পিঠা জীবাণু দ্বারা দূষিত হয়ে পড়ে। অনেক দরিদ্র মহিলা ফুটপাতে বসে আটার রুটি তৈরি করে সাধারণ তরিতরকারি বা গুড়সহ দিয়ে তা স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে। অনেকে আবার বাসাবাড়ি থেকে রান্না করা ভাত সাধারণ তরিতরকারিসহ বিক্রি করে টুপাইস উপার্জন করে। এসব খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, ছিন্নমূল ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

বাংলাদেশের কাগজের টাকার নোটগুলো সংক্রামক রোগ বিস্তারের আরেক বড় মাধ্যম। এসব ময়লা নোটে থাকে অনেক ধরনের জীবনঘাতী জীবাণু। নিয়ম হচ্ছে, যারা টাকার নোট স্পর্শ করবে বা আদান-প্রদান করবে তারা খাবার স্পর্শ করবে না। কারণ টাকা আদান-প্রদানের পর খাবার স্পর্শ করলে টাকার অসংখ্য জীবাণু খাবার দূষিত করে ফেলে। এই দূষিত খাবার খেলে যে কেউ মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আমি হরহামেশাই দেখি, আমাদের দেশে যারা টাকা আদান-প্রদান করছে তারাই আবার সেই ময়লা হাত দিয়ে খাবার পরিবেশন করছে। বিদেশে এ ধরনের প্র্যাকটিস দেখাই যায় না। আমাদের স্বাস্থ্যসচেতনতার এত অভাব কেন আমি বুঝি না। এসব ছোটখাটো জিনিস কি বইপত্রে লিখে মানুষকে শেখাতে হবে? এত ছোটখাটো কাজে সাধারণ জ্ঞান কেন কাজ করে না তা-ও আমার বুঝতে কষ্ট হয়। কাগজের টাকার মধ্যে গ্রাম পজিটিভ, গ্রাম নেগেটিভ—দুই ধরনের জীবাণুই পাওয়া যায়। রয়েছে হেপাটাইটিস ভাইরাস, যার কারণে যে কারো জীবন বিপন্ন হতে পারে। রিকশাচালক, গণপরিবহনের কন্ডাক্টর, মাছ ও সবজি বিক্রেতাদের দ্বারা টাকা সবচেয়ে বেশি দূষিত হয়। টাকায় বিদ্যমান জীবাণুর মধ্যে রয়েছে ই. কোলাই, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, মাইক্রোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকোলোসিস, ভিব্রিও কলেরি, করিনেব্যাকটেরিয়াম,  মাইক্রোকক্কাস, ক্লেবসিলা, সালমোনেলা, সিওডোমোনাস ও বেসিলাস প্রজাতির ক্ষতিকর  জীবাণু। এসব ক্ষতিকর জীবাণুর কারণে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মের সংক্রমণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাসহ জীবনঘাতী রোগ মেনিনজাইটিস ও সেপ্টেসেমিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

drmuniruddin@gmail.com


মন্তব্য