kalerkantho


পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



একসময় ‘ধর্মঘট’ ছিল স্রেফ মত প্রকাশের একটা মাধ্যম। প্রতিবাদের সর্বোচ্চ অহিংস ভাষা।

আধুনিককালে তা দাবি আদায়ের সহজতম অস্ত্র। চুন থেকে পান খসলেই এখন ধর্মঘট। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল সম্ভবত পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের এক হুংকারে ৩৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকল দেশের চাকা। বাঘ-মহিষকে এক ঘাটে জল খাইয়ে তবেই চালু করল গাড়ির চাকা। তাদের এক ‘গোসসায়’ই দেশ কোমায় থাকল দুই দিন। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী-আমলা-নেতাদের কী দৌড়ঝাঁপ! দফায় দফায় মিটিং-সিটিং, বক্তৃতা-বিবৃতি। অনেক কষ্টে তাদের মানভজন। তারপর রাহুমুক্তি। তবে সেই মুক্তি ‘সাময়িক’ না ‘চূড়ান্ত’, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। কোন তরিকায় বা প্রেসক্রিপশনে এই মুক্তি, তাও স্বচ্ছ নয়।

তবে ইতিহাস তাদের পক্ষে। তাদের খামখেয়ালির কাছে সরকারগুলোর যেন ‘চাহিবামাত্র দিতে বাধ্য থাকিব’ দশা। তাদের দেশ অচলের হুমকির কাছে প্রতিটি সরকার যেন ‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’। না হলে বেপরোয়া যান চালিয়ে মানুষ হত্যার যে সাজা ১৯৮৩ সালেও ছিল ১৪ বছর, তিন বছরের মাথায় দুই দফায় কমে তিন বছরে ঠেকে কী করে?

‘দায়গ্রস্ততা’র আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের কথা। চালক-হেলপারদের পাঁচ মামলা দণ্ডবিধির ৩০২ থেকে ৩০৪ ধারায় স্থানান্তরসহ আট দাবি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা। দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি টেবিলে রেখে শুরু হলো দরকষাকষি বৈঠক। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, সড়ক দুর্ঘটনার মামলাগুলো এখন থেকে আর দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় (মৃত্যুদণ্ডযোগ্য) নেওয়া হবে না। নেওয়া হবে ৩০৪-খ ধারায় (তিন বছর কারাদণ্ডযোগ্য)।

মোটরযান আইন মতে, পাঁচ বছর পর ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে চালকদের আবার পরীক্ষা দিতে হয়। শ্রমিক নেতাদের আবদারে তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে শুধু চোখ পরীক্ষা করেই লাইসেন্স নবায়ন করা হবে! এরই মধ্যে দুর্ঘটনার যেসব মামলা ৩০২ ধারায় নেওয়া হয়েছে, বৈঠকে তাও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সব সিদ্ধান্তের পর শ্রমিক নেতারা ২৩ সেপ্টেম্বর আহৃত দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট সাময়িকভাবে স্থগিত (পূর্ণ স্থগিত নয়!) করেন। তার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ওই পাঁচ মামলাকে তিন বছর কারাদণ্ডযোগ্য মামলায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে পিটিয়ে হত্যা, বাস-ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা মামলাও ছিল। তাতে সেখানে চালক-হেলপারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত হয়েছিল (প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর ২০১৩)।

এই হচ্ছে বেপরোয়া যানচালক-মালিকদের বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের অবস্থান! কার্যত পরিবহন শ্রমিকদের কাছে আমরা যে কতটা জিম্মি, কতটা অসহায়, সাম্প্রতিক পরিবহন ধর্মঘটই তার প্রমাণ। শুধু অন্তহীন জনভোগান্তি নয়, এই ধর্মঘট একসঙ্গে অনেকগুলো অশনিবার্তা দিয়ে গেল। যেমন—১. সড়ক দুর্ঘটনায় এ দেশে আইনগত প্রতিকার নেই বললেই চলে। তারেক-মিশুকদের মামলায় ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই’ প্রথম বড় প্রতিকার। রায়ের পর পরই বিভাগীয় পর্যায়ে ধর্মঘট। তারপর ট্রাকচাপায় মহিলা হত্যায় আরেক চালকের মৃত্যুদণ্ড। তাতে সঙ্গে সঙ্গে দেশ অচল। তার মানে কী দাঁড়াল, চালকের আসনে বসে তারা যত বড় খুনি হোক না কেন, তাদের সাজা দেওয়া যাবে না!

২. সদ্যসমাপ্ত ধর্মঘটের আরেক বার্তা হলো, পরিবহন শ্রমিকরা দায়মুক্ত বেপরোয়া যান চালানো ও মানুষ খুনের লাইসেন্স চাচ্ছেন। এই লাইসেন্স পেলে তাঁরা যাত্রী-পণ্য বহন করবেন, অন্যথা নয়। এ ক্ষেত্রে চালকের হাতে নিহত ব্যক্তি যত বড় গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, তাতে যত ক্ষয়ক্ষতিই হোক না কেন, ধরে নিতে হবে এটাই আমাদের অনিবার্য নিয়তি।  

৩. চালকরা সতর্ক হবেন না, এই আন্দোলন উল্টো সরকারকেই কড়াভাবে সতর্ক করে দিল। চালকদের ভাবটা যেন এমন, ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা...’। ধরলে ১৬ কোটি মানুষ আর তার সরকারকেই ধরিয়ে দেবে!

৪. তারেক-মিশুকের দুর্ঘটনার যে মামলায় বাসচালক জমিরের যাবজ্জীবন সাজা হয়, ওই দুর্ঘটনায় তারেক-মিশুকদের মাইক্রোবাসের চালকও নিহত হন। এই সাজার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অর্থ, পরিবহন শ্রমিকরা নিজেদের শ্রমিক খুনের বিচারও চায় না। তাতে প্রশ্ন জাগে, এ স্ববিরোধী ‘মালিকের আজ্ঞাবহ’ আন্দোলন কেন?

৬. এবারের ধর্মঘটে পরিবহন শ্রমিকরা ছিল খুবই মারমুখী। পেটের দায়ে যেসব চালক রাস্তায় নেমেছেন, প্রত্যেকে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। জরুরি পণ্য সরবরাহে নিয়োজিত ১০ জন ট্রাকচালককে ট্রাক থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে ট্রাকের তপ্ত ইঞ্জিনের নিচে শুইয়ে রাখার ঘটনাও তাঁরা ঘটিয়েছেন। অ্যাম্বুল্যান্সের চালকরাও রেহাই পাননি। তাতে সংশয় জাগে, এ শ্রমিক-নিপীড়িত আন্দোলনটি আদৌ শ্রমিক আন্দোলন, নাকি অন্য কিছু?

৭. আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এমন পরিবহন ধর্মঘট এই প্রথম। তা ছাড়া চালকদের এমন মারমুখী রূপও বিরল। তাঁদের এতটা স্পর্ধায় খুঁটির জোরটা আসলে কোথায়? পাখির মতো মানুষ খুনের ছাড়পত্র পেলেই চালকরা গাড়ি চালাবেন? এমনকি নৌমন্ত্রী ধর্মঘটটিকে ‘ধর্মঘট’ পর্যন্ত বলতে নারাজ। বলেছেন, ‘স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি’, কী সেলুকাস! তো আমাদের মুক্তি কোথায়? 

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ রাষ্ট্রগুলোর একটি। সেখানে সাম্প্রতিক পরিবহন ধর্মঘট যে নেতিবাচক বার্তা দিয়ে গেল, তা সরকারের জন্য ভয়ংকর অশনিসংকেত। জননিরাপত্তা ও সরকারের ভাবমূর্তির প্রশ্নে তাই গোটা পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার। সড়ক নিরাপত্তায় নতুন ও কঠোর আইন প্রণয়ন দরকার। দরকার অবিলম্বে সরষের ভূতগুলো তাড়ানো। বেপরোয়া চালক-মালিকরা অনেক লাই পেয়েছেন। আর নয়, এবার লাগাম টানা দরকার। তাঁদের পায়ে শাস্তির বেড়ি পরানো দরকার। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা যে প্রকাশ্য ও সহিংস ঔদ্ধত্য দেখালেন, তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। তাতেই শুধু দশ ও দেশের মুক্তি।

 

লেখক :  আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib@yahoo.com


মন্তব্য