kalerkantho


রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও জনদুর্ভোগ

এ কে এম আতিকুর রহমান

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও জনদুর্ভোগ

একটি গণতান্ত্রিক দেশে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকাটাই স্বাভাবিক। আর প্রতিটি দলই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রথমেই দলের আদর্শ ও লক্ষ্য স্থির করে থাকে। তারপর সেই আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা। দেশ ও জনগণের কল্যাণেই যখন দলের প্রতিষ্ঠা আর রাজনীতি, তখন সংগত কারণেই জনগণকে দলের কর্মপরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য অবহিত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। আর এ জন্য আয়োজন করা হয় মিছিল, সভা ও সমাবেশের। জনগণ কোনো অন্যায়, নিপীড়ন, দমন বা বঞ্চনার শিকার হলেও রাজনৈতিক দলগুলো নানা উপায়ে তার প্রতিবাদ জানিয়ে থাকে। এ ছাড়া জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নানা উৎসব উপলক্ষেও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।   

গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলো যে যেই আদর্শেই বিশ্বাসী হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আলোকেই দলের সব নীতি নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক। দলের নীতিমালায় দেশের সংবিধানপরিপন্থী বা এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই দলের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে হবে। আর একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও এসব প্রযোজ্য বলে মনে করি।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সেসবের কতটুকুই বা মেনে চলে? দেশ ও জনগণের সুবিধা-অসুবিধার কথা কতটুকু বিবেচনায় রাখে? কোনো বিশেষ উপলক্ষে, সরকারি কোনো আচরণ ও সিদ্ধান্তের বা দাবিদাওয়ার প্রতিবাদে মিছিল, শোভাযাত্রা, সমাবেশ, ধর্মঘট ইত্যাদির মতো ঘটনা ঘটতেই পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের যেমন নিজের কিছু অধিকার রয়েছে, তেমনি প্রতিটি দল বা সংগঠনেরও তা রয়েছে। কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যের অধিকার যেন খর্ব বা বাধাগ্রস্ত করা না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখা উচিত। সর্বোপরি মিছিল, সমাবেশ বা ধর্মঘটের নামে এমন কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করা যাবে না, যাতে দেশ ও জনগণ শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কোনটা উচিত আর কোনটা নয়, সেটা কে নির্ধারণ করবে? যে যার খেয়ালখুশিমতো চলছে এই বাংলাদেশে। অনেক সময়ই সরকারের বিরোধিতার নামে সাধারণ মানুষের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে থাকে। সেকি ভোগান্তি! এমনকি হরতালের নামে যানবাহনে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটতে দেখেছি। দেশ আর মানুষের কল্যাণেই যদি তাদের রাজনীতি, তাহলে কোন অধিকারে তারা এসব কাজ করে তা জানি না। আসলেই কি তারা জনগণের ভালো-মন্দ আর কল্যাণ নিয়ে ভাবে?  

রাজধানী শহর ঢাকাকেন্দ্রিকই বেশির ভাগ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত। এর কারণও রয়েছে। ঢাকা শহরে সরকারের সচিবালয়, সব রাজনৈতিক দলেরই কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বিদেশি দূতাবাস, বিভিন্ন ধরনের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর কোটি মানুষের ঘরবাড়ি। তারপর আশপাশের শহরগুলো তো রয়েছেই। সেখান থেকেও লোকজন বাসে, ট্রাকে বা ট্রেনে করে ছুটে আসে ঢাকায় এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে। শুনেছি লোকজন ভাড়া করেও নাকি আনা হয়।

ঢাকা শহরে রাস্তাঘাট যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও যানবাহনের তুলনায় খুবই কম। ফলে হরহামেশাই এখানে যানজট লেগে থাকে। আশার কথা, ঢাকা শহরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বর্তমান সরকার খুবই সচেতন ও আন্তরিক। নতুন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, সড়কগুলো প্রশস্ত করা হচ্ছে, ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। যানজট নিরসনে মেট্রো রেল নির্মাণসহ নতুন আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যে এসবই করা হচ্ছে যানজটে সৃষ্ট জনগণের অসুবিধার কথা চিন্তা করে। এর ফলে হয়তো স্বাভাবিক যানজট অনেকটাই কমে আসবে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য কারণে, যা দূর করা একটি জটিল ব্যাপার। যখন এই ঢাকা শহরে কোনো রাজনৈতিক দল মিছিল, সভা বা সমাবেশের আয়োজন করে তখন যানজট তীব্রতর হয়ে ওঠে। অন্য সময়ের ১০ মিনিটের পথ এক ঘণ্টায়ও যাওয়া যায় না। অনেক সময় পুরো সড়কটাই মিছিলে বা শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লোকজনের দখলে চলে যায়। এমনকি রাস্তাও যানবাহন চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই। এর প্রভাব পড়ে পুরো শহরের ট্রাফিকব্যবস্থায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। সে এক দুর্বিষহ অবস্থা, শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে।

সাধারণত দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র ওসমানী মিলনায়তন, জাতীয় জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বা কোনো রাজপথে সভা-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আর সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য হাজার হাজার মানুষ হেঁটে বা বাসে-ট্রাকে করে ছুটে চলে সমাবেশস্থলের দিকে। বিশৃঙ্খলভাবে চলমান এই জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। ফলে ওই সময় সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট আর আশপাশের অফিসগুলোতে যাতায়াতকারীদের যে অপরিসীম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে। ওসব এলাকায় চলাচলকারী যানবাহন এদিক-ওদিক অলিগলি খোঁজে পরিত্রাণের আশায়। ছড়িয়ে পড়ে যে যেদিকে পারে সেদিকেই। অনিবার্য কারণেই সমগ্র এলাকায় শুরু হয়ে যায় তীব্র যানজটের। এভাবে মানুষের দৈনিক কত কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি যে নষ্ট হচ্ছে! এর প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ আর মিছিল বিদ্যমান যানজটকে যেভাবে অসহনীয় করে তোলে তা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে যতই সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হোক না কেন, মানুষের এই দুর্ভোগ কিছুতেই কমবে না।

ঢাকা শহরের যানজটের এই দুর্ভোগ থেকে নাগরিকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যায়—১. যেকোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বা মিছিল করার জন্য সরকার কিছু স্থান নির্দিষ্ট করে রাখতে পারে। এসব স্থান অবশ্যই শহরের কেন্দ্রে হবে না। এগুলো হতে পারে তুরাগ নদের পাশের স্থানে, যেখানে বিশ্ব ইজতেমা হয়, অথবা উত্তরা, ফতুল্লা বা মিরপুরের কোনো স্টেডিয়ামে বা বড় মাঠে। তবে খালি সাপেক্ষে ওসব স্থানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমেই সভা-সমাবেশ, মিছিল করা যাবে। সরকার ওই সব কর্মসূচির কথা এবং কোথাও যান চলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হলে তা জনগণকে আগাম জানিয়ে দেবে; ২. শহরের মধ্যে কোনো স্থানে বা রাস্তায়, বিশেষ করে ব্যস্ততম এলাকায় কোনো ধরনের মিছিল, সভা বা সমাবেশ করার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকেই অনুমোদন দেওয়া যাবে না; ৩. সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মসূচি পালনকে উৎসাহিত করা যায়। এ ছাড়া ছুটির দিনে করলে কাজকর্মের ক্ষতিও কম হবে; ৪. শহরের মধ্যে কোনো অডিটরিয়ামে বা ভবনে কোনো কর্মসূচি করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে মানুষের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা থাকবে। ওই সংখ্যা এমন পর্যায়ে থাকবে, যাতে তাদের যাতায়াতকালে যানজটের সৃষ্টি না হয়। সীমিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক অংশগ্রহণকারী হলে শহরের কেন্দ্রে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি না দিয়ে শহরের বাইরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ওই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া যায়; ৫. যেসব জাতীয় অনুষ্ঠান ঢাকা শহরের মধ্যেই কোনো স্থানে পালন করতে হয়, যেমন—ঈদ, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা নববর্ষ, বিজয় দিবস ইত্যাদি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকার আগে থেকেই জনগণকে সতর্ক করে দেবে, যাতে প্রয়োজন ব্যতিরেকে ওসব এলাকা তারা এড়িয়ে চলে; ৬. অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তাগুলোতে ‘একমুখী’ চলাচলের ব্যবস্থা করা। সম্ভব হলে সরু রাস্তাকে প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে; ৭. ঢাকা শহরে, বিশেষ করে অফিসপাড়া ও মার্কেট এলাকায় পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় গাড়িতে করে আসা মানুষগুলো গাড়ি নিয়ে খুবই বিপাকে পড়ে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে লোকজনকে রাস্তার ওপরই গাড়ি পার্ক করতে হয়। ফলে ওই রাস্তায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। সৃষ্টি হয় যানজটের। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশ ওসব গাড়িকে জরিমানা করে। কিন্তু এটা কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়, বরং এতে জনসাধারণের ভোগান্তি এবং মনে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। সুষ্ঠু পার্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব; ৮. ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এলাকার বেশির ভাগ ফুটপাতই হকারের দখলে থাকায় পথচারীরা আর সেখান দিয়ে চলাচল করতে পারে না। এ ছাড়া কিছু দূতাবাসসংলগ্ন ফুটপাত জনসাধারণের চলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি ওই ফুটপাতের ওপর দূতাবাসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশদের জন্য বক্সও নির্মাণ করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়। ফলে ওসব রাস্তায় গাড়ি চলাচলের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় যানজটের। ফুটপাত হকার বা দখলমুক্ত করা গেলে পথচারীরা ফুটপাত দিয়ে চলাচল করবে এবং ওই সড়কগুলোতে আর অনাকাঙ্ক্ষিত যানজটের সৃষ্টি হবে না; ৯. বড় রাস্তাগুলোতে রিকশা-ভ্যান-ঠেলাগাড়ির চলাচল ইঞ্জিনচালিত গাড়ির চলাচলকে বিঘ্নিত করে। যদিও কয়েকটি বড় সড়কে রিকশা বা ভ্যান চলাচলে বারণ রয়েছে, তবে আরো কিছু বড় সড়কে ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়; ১০. জানা মতে, ঢাকা শহরের কোনো রাস্তায়ই ট্রাফিক লাইট দেখে গাড়ি চলে না, যদিও অনেক অর্থ ব্যয় করে অটোমেটিক সিগন্যালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ট্রাফিক পুলিশই হাত দিয়ে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো রাস্তার একটি ট্রাফিক সিগন্যালে যানজট, অথচ একই রাস্তায় কিছুদূর এগোলেই সম্পূর্ণ ফাঁকা। এ ক্ষেত্রে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশদের মধ্যে ওয়াকিটকি যোগাযোগের মাধ্যমে যানজট নিরসন সম্ভব। তবে সার্বিক ট্রাফিকব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য চিন্তা-ভাবনাও করতে হবে; ১১. ঢাকা শহরের অনেক স্থানেই রাস্তা পারাপারের জন্য ওভারব্রিজ রয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ পথচারী রাস্তা পার হওয়ার সময় ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে চলমান যানবাহনের মধ্য দিয়েই রাস্তা পার হয়। ফলে অনেক সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পথচারীরা যাতে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয় তা বাস্তবায়নের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। কোনো পথচারী এর ব্যত্যয় ঘটালে অর্থ জরিমানা করা যেতে পারে। তবে যেসব স্থানে ওভারব্রিজের প্রয়োজন সেখানে ওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে এবং ১২. সর্বোপরি দেশের সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনকে এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করতে আন্তরিক মনমানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমরা যেমন গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখব, একইভাবে ওই কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে কেউ যেন কোনো ভোগান্তির শিকার না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। আমাদের সবার সচেতনতা এবং সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজধানী শহরের যানজট অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি বাঁচবে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা এবং সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকার গাড়ির জ্বালানি।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত


মন্তব্য