kalerkantho


‘অদম্য স্বাধীনতা’ নির্মাণের গল্প

মো. মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘অদম্য স্বাধীনতা’ নির্মাণের গল্প

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর মূলত রেলকেন্দ্রিক একটি উপজেলা শহর। ১৮৭০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের আওতায় স্টিম লোকোমেটিভ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সৈয়দপুরে একটি লোকোশেড স্থাপন করে।

  শেডটি  পরে যাত্রী ও মালবাহী গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধাপে সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রী ও মালবাহী গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের একমাত্র কারখানা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

২০১০ সালের ২৭ আগস্ট আমি সৈয়দপুর কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এ দায়িত্ব পালন করি ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময় সৈয়দপুর ও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে ঘিরে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাসংগ্রাম সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আমি জানতে পারি, যা আমার বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

১৯৭১ সালে সৈয়দপুর রেল কারখানা তথা সৈয়দপুর শহরের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৭০ শতাংশ ছিল বিহারি-অবাঙালি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি অংশ ছিল নিষ্ঠুর প্রকৃতির ও প্রচণ্ড বাঙালিবিদ্বেষী। আনুমানিক ৩০ শতাংশ বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারী এ কারখানায় কর্মরত ছিল, যারা রেলওয়ে বাসাবাড়িতে বসবাস করত। সংখ্যায় কম হওয়ায় বাঙালি শ্রমিকরা ছিল অনেকটা নিজভূমে পরবাসী।

 

১৯৭১ সালে যখন সারা দেশে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে তখন সৈয়দপুরের আশপাশের স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনসাধারণের সঙ্গে সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ। ফলে প্রায় সময় কারখানা বা কারখানার বাইরে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-মিটিং হতো। অনেকে তাদের বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। এতে অবাঙালি-বিহারিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর সৈয়দপুর কারখানার বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। অনেকেই কারখানায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়। বিহারি শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সৈয়দপুরে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শহীদ ডা. জিকরুল হক, ডা. শামসুল হকসহ বেশ কিছু ত্যাগী নেতা। বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন যখন আরো গতি লাভ করছিল তখন অবাঙালি শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বাধীনতাসংগ্রাম চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে বাঙালি নিধনের এক হিংস্র পরিকল্পনা আঁটে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একদিকে বিহারি শ্রমিক-কর্মচারীরা সেনানিবাসের পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় বাঙালি শ্রমিকদের কারখানায় যেতে বাধ্য করতে থাকে, অন্যদিকে উৎপাদনের ফাঁকে ফাঁকে  কারখানার ভেতরেই বল্লম, তলোয়ার, ছুরি, বর্শাসহ বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্র গোপনে তৈরি করে বিভিন্ন কক্ষে লুকিয়ে রাখতে থাকে।

মার্চে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখলের এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বৃহত্তর রংপুর এলাকার অনেক বাঙালি পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে প্রাণ হারায়। এর মধ্যে সৈয়দপুর ও এর আশপাশের লোকজনও ছিল। এ ঘটনার পর কারখানার পরিবেশ আরো থমথমে হতে থাকে। কারখানার বাইরে-ভেতরে বিহারিরা সংগঠিত হতে থাকে। মার্চের ২৭ তারিখে কারখানার গেটের সামনে স্টোর অ্যাকাউন্ট্যান্ট এম এ আজিজকে বিহারিরা নির্মমভাবে হত্যা করে তাঁর লাশ জ্বলন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে। অবাঙালিদের হাতে সৈয়দপুর শহরে তখন বিক্ষিপ্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রতিদিন কারখানা খোলা, উৎপাদন চলছে, কোচ ওয়াগন মেরামত হচ্ছে ধীরগতিতে। হঠাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন কারখানা চলাকালেই ফটক বন্ধ করে দেয় বিহারি শ্রমিক-কর্মচারীরা। ধারালো অস্ত্র হাতে অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্মরত নিরীহ বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর। কারখানার অভ্যন্তরে, অফিসে, স্টেশনে, হাসপাতালে, রাস্তার ওপরে যাকে যেখানে যেভাবে পেয়েছে দল বেঁধে তাড়া করে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করেছে। অনেক শ্রমিককে জ্বলন্ত বয়লার, ফার্নেসে জীবন্ত ছুড়ে মেরেছে। ফটক বন্ধ ছিল বিধায় পালানোর চেষ্টা করেও পালাতে পারেননি আতঙ্কিত বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা। সেদিন ঠিক কতজন নিরীহ বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। কারখানার অভ্যন্তরে মুক্তিকামী বাঙালি শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নির্মমভাবে হত্যার পর হিংস্র হানাদারের দল আক্রমণ করে তাঁদের বাসাবাড়ি। নারী, পুরুষ, শিশু—কেউ রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে। এর পর থেকেই সৈয়দপুর শহর হয়ে যায় হত্যা, লুটতরাজ, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগের শহর। বন্ধ হয়ে যায় সৈয়দপুর কারখানা। যারা বেঁচে ছিল তারা প্রাণ ভয়ে পরিবারসহ পালাতে থাকে শহর ছেড়ে।

সৈয়দপুরে আমি যখন বিভিন্ন লোকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি তখন লক্ষ করি, কিছু লোক এ বিষয়গুলোকে গল্প বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, আর যারা স্বজন হারিয়েছে তারা হয়ে যায় আবেগাপ্লুত, বাকরুদ্ধ। ২০০২ সালে তৎকালীন বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মতিন চৌধুরীর উদ্যোগে কারখানার অদূরে রেলওয়ে শহীদ স্মৃতি পার্কে কারখানার শহীদ শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের তালিকাসংবলিত একটি নামফলক স্থাপন করা হয়। এর আগে তৎকালীন বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম ও শ্রমিক নেতা শামসুল হকসহ অন্য শ্রমিক নেতাদের উদ্যোগে বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক এম এ মতিন তালুকদার ও এস এম এ রাজ্জাকের  পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৮৫-৮৮ সালের মধ্যে সৈয়দপুরস্থ শহীদ স্মৃতি পার্কে একটি দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার তৈরি করা হয়।

কারখানায় আমার কর্মকালে কারখানা আধুনিকায়নের কাজ  চলছিল। প্রচুর পুরনো ইট, রডসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম বের হচ্ছিল। এ সময়ই আমি সিদ্ধান্ত নিই মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে এ কারখানার শহীদ শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মহান আত্মত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষণকল্পে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের। বিষয়টি নিয়ে অধস্তন কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। সবাই নির্মাণের পক্ষে সাড়া দেন ও সাহস জোগান। উৎসাহ পাই সৈয়দপুরের শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক অনেক ব্যক্তির কাছ থেকেও। আধুনিকায়ন প্রকল্প থেকে বের হওয়া পুরনো ইট, রড, অকেজো লোহার পাত ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাশ্রম ও কর্মকর্তাদের আর্থিক সহায়তায় কারখানার মূল দুই গেটের মাঝামাঝি স্থানে এ স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। স্মৃতিসৌধটি নির্মাণের ক্ষেত্রে আমি চিন্তা করি, যেহেতু এটি একটি যান্ত্রিক কারখানা, এখানে রেলওয়ে কোচ ও ওয়াগন মেরামত ও যন্ত্রপাতি উৎপাদন করা হয়, সুতরাং স্মৃতিসৌধটি ধাতব পাত দিয়ে তৈরি হতে পারে; যার অবয়বে কারখানার মূল কর্মকাণ্ড ও স্বাধীনতার চেতনার সংমিশ্রণ ঘটতে পারে। স্মৃতিসৌধের মূল ভাবনা ও চেতনা আমারই অফিস কর্মচারীদের মধ্যে যাঁরা সৃজনশীল অঙ্কনের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের মধ্যে সঞ্চালন করি এবং এর ভিত্তিতে নকশা প্রণয়নের আহ্বান জানাই। বেশ কিছু নকশা জমা পড়ে। এর মধ্যে রেজাউল ইসলাম সাজুর (উচ্চমান সহকারী) নকশাটি আমার মনঃপূত হলে তা চেতনার সঙ্গে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে কিছু পরিমার্জন ও প্রমিত করা হয়। এরপর কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় নকশাটি উপস্থাপন করলে সবাই তা সাগ্রহে অনুমোদন দেন। এরপর শুরু হয় স্মৃতিসৌধ ‘অদম্য স্বাধীনতা’ নির্মাণের দীর্ঘ ও কঠিন কাজ।

নির্মাণ পর্বের একদম শুরুর দিকে মাননীয় রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক এমপি কারখানা পরিদর্শনে আসেন। স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুরোধ করলে তিনি ব্যাপক উৎসাহে ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ফলে ‘অদম্য স্বাধীনতা’ বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই সুগম হয়। ‘অদম্য স্বাধীনতা’র ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। সেই থেকে সৈয়দপুর কারখানায় নিয়মিত প্রতিবছর মহান বিজয় দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে অদম্য স্বাধীনতায় পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে। আমার বড় সন্তুষ্টি হচ্ছে ‘অদম্য স্বাধীনতা’ নির্মাণের পর যাঁরা কারখানা পরিদর্শনে আসেন তাঁরা কারখানায় ঢুকেই ‘অদম্য স্বাধীনতা’র কাছে যান, বেদিতে ওঠেন, স্মৃতিফলকে লিখিত আত্মত্যাগের কাহিনি পড়েন, ছবিও তোলেন। সৈয়দপুরে আমার শেষ কর্মদিবসের পূর্বাহ্নে আমি এই স্মৃতিসৌধের বাকি কাজ সমাধা করে অপরাহ্নে আমার বিমোচক কর্মকর্তার হাতে কারখানার দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিদায় নিই। এই কঠিন কাজ করতে পারার জন্য আমি সৈয়দপুর কারখানার সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা ও শহীদ পরিবারের  সদস্যদের কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞ।

 

লেখক : প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (পূর্ব),

বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম


মন্তব্য