kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

আল্লাহর দরবারে ইউসুফ (আ.)-এর বিশেষ দোয়া

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আল্লাহর দরবারে ইউসুফ (আ.)-এর বিশেষ দোয়া

১০১. [ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেন] হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক।

তুমি আমাকে মুসলমান (আত্মসমর্পণকারী) হিসেবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সত্কর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করো। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০১)

তাফসির : আগের আয়াতগুলো থেকে জানা গেছে, ইউসুফ (আ.) মিসরের রাজা হয়েছেন। রাজকীয় জাঁকজমকে তিনি নিজের পরিবারকেও বরণ করে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রাচুর্য, বিলাসিতা ও রাজকীয় জৌলুস দেখা যায়। কিন্তু এসব কিছু ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহর স্মরণ ও শোকরিয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। রাজকীয় চাকচিক্যের মধ্যে থেকেও তিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। এ বিষয়টি আলোচ্য আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে এ মর্মে দোয়া করেছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি চাই না কোনো ক্ষমতা, চাই না স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য, চাই না কোনো ধন-দৌলত। আমি চাই এসবের চেয়ে স্থায়ী কোনো কিছু।

এগুলোর চেয়ে মূল্যবান কিছু আমি চাই। আমি চাই, আমাকে মুসলমান হিসেবে মৃত্যু দেওয়া হোক। আমি চাই, আমাকে নেককার বান্দা হিসেবে কবুল করে নেওয়া হোক।

পবিত্র কোরআনে প্রাচীন মিসরের দুজন শাসকের বর্ণনা পাওয়া যায়। একজন হলো, ফেরাউন আর অন্যজন হলেন হজরত ইউসুফ (আ.)। ফেরাউন ছিল ঔদ্ধত্য ও অত্যাচারী। জনগণকে সে দাস হিসেবে বিবেচনা করত। সে মনে করত ক্ষমতার উত্স সে নিজেই। অন্যদিকে হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন সম্পূর্ণ তার বিপরীত। ক্ষমতাকে তিনি আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার যা কিছু সম্বল তার সবটুকুই তোমার। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার যতটুকু অধিকারী হতে পেরেছি, তা তোমারই অনুগ্রহে সম্ভব হয়েছে। শুধু ইহকালেই নয়, পরকালেও আমি তোমার ওপর নির্ভরশীল। হে আল্লাহ! আমি যেন তোমার অনুগত থেকেই মৃত্যুবরণ করি। আমাকে তুমি তোমার একান্ত অনুগত ও সত্কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও। ’

হজরত ইউসুফ (আ.) এভাবে স্ববিনয়ে আল্লাহর কছে দোয়া করতেন। তিনি প্রকৃতই একজন আত্মসমর্পণকারী ছিলেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার পরও তিনি এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহের কথা ভোলেননি।

ক্ষমতা ও সম্পদ মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নেয়। এই দুই ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে অনেক উত্থান-পতন আসে। তাই সব সময় আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তিনিই যেকোনো বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারেন।

ইউসুফ (আ.) দোয়া করেছিলেন, যেন ‘মুসলমান’ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু নসিব হয়। পাশাপাশি তিনি ‘সালেহ’ অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ সৎ বান্দা হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছেন। এই প্রার্থনা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার অংশ।

সব নবী-রাসুলই ‘সালেহ’ ছিলেন। তাঁরা সব ধরনের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।

এখানে ইউসুফ (আ.) ‘মুসলমান’ হিসেবে মৃত্যু কামনা করার তাত্পর্য হলো, নবী-রাসুল, এমনকি অলি-আউলিয়ার বৈশিষ্ট্যই হলো, তাঁরা দুনিয়া ও আখিরাতে যত উঁচু মর্যাদাই লাভ করেন না কেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তাঁরা অহংকার করতেন না। সব ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া অথবা হ্রাস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করতেন। প্রাপ্ত নেয়ামত আরো বাড়ানোর জন্য তাঁরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যাতে মৃত্যু পর্যন্ত তা অটুট থাকে। ইউসুফ (আ.)-এর দোয়ায় মুসলমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ এবং নেককার হিসেবে গণ্য হওয়া এই মহান বৈশিষ্ট্যেরই অংশ।

ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়ার মধ্যে যুগে যুগে সব আল্লাহ ভীরু মজলুমের হৃদয় উত্সারিত প্রার্থনা ফুটে উঠেছে। আল্লাহর প্রতি সমর্পিত চিত্ত ব্যক্তির জন্য ইউসুফ (আ.)-এর জীবনী নিঃসন্দেহে অনন্য প্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য